সোনাভরির বাঁকে

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মোস্তাফিজুল হক

গারো পাহাড়ের কোলঘেঁষে নেমে আসা নদী সোনাভরি। কুলকুল স্রোতধারা নিয়ে বয়ে চলেছে। নদীর তীরঘেঁষে মায়াবী এক গ্রাম। যেন সৃষ্টির অপূর্ব লীলাভূমি। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন কোনো এক জাদুকরের মায়ামন্ত্র ধ্বনিতে গাঁয়ের প্রকৃতি সেজে উঠেছে। আর এ কারণেই হয়তোবা গ্রামের নাম জাদুরচর। সেই গাঁয়ের পরিশ্রমী কৃষক মধু মিয়া। যেমন তার নাম তেমন তার মুখের হাসি। ছেলেমেয়েসহ চার সদস্যের পরিবার। সোনাভরির তীরঘেঁষে ছয় বিঘা জমির এক বিঘাতে গাছপালায় আচ্ছাদিত ছিমছাম বাড়ি। চার বিঘা ধানিজমিতে যে পরিমাণ ধান ফলে তাতে আবাদের খরচ ওঠে সারা বছর ধরে ভাতের জোগান হয়ে যায়। সোনাভরির জলে হেমন্তের ফসলের মাঠ যেন এক টুকরো সোনারপাতে পরিণত হয়। মাঝেমধ্যে বন্যার কারণে ফসলহানি না হলে কিছু বাড়তি ফসল বিক্রি করে কিছু টাকার সংস্থান হলেও বন্যার ঘাটতি পোষাতে তা আর স্থায়ী সঞ্চয়ে রূপ নিতে পারে না। এর পরও মধু মিয়ার সংসারে সুখের অভাব নেই। ফসল বিক্রি করে সঞ্চয় করতে না পারলেও সারা বছর খেয়ে-পরে ভালোই চলে যায়। বাছুরসহ দুটো দুধেল মহিষ, খোয়ার ভর্তি হাঁস-মুরগি, বেশকিছু ফলের গাছসমেত গেরস্ত বাড়িটা দেখেই যে কারোর মন সুখে নেচে উঠে। ছেলেটা ক্লাস এবার এসএসসি দেবে আর মেয়েটা ক্লাস এইটে। দুধ, ডিম আর ফলমূল বেচে জামাকাপড, চিকিৎসার খরচ আর উৎসব ব্যয় মেটাতে খুব একটা অসুবিধা হয় না।

মধু মিয়ার স্ত্রী জামিলা বেগমের ইচ্ছা ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবে। জামিলা নিজে ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও সেভেনে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়। তাই তার লেখাপড়া করতে না পারার দুঃখটা মাঝে মাঝে ভাবিয়ে তোলে। মধু মিয়া এসএসসি পাস করে আর এগোতে পারেনি। তাই সেও চায় তার সন্তানদের বহু দূর পর্যন্ত পড়াশোনা করাবে। সংসারে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা না থাকলেও ওরা প্রবল আশাবাদী। আশা করবেই না কেন? রুপালি আর সিয়াম যে লেখাপড়ায় অনেক ভালো। ওরা যেমন নিয়মিত স্কুলে যায়, ঠিক তেমনি স্কুলে সবার কাছে অত্যন্ত পছন্দের। জামিলা সংসারি আর আদর্শ নারী। মধু মিয়াও বেশ পরিশ্রমী। সুতরাং তাদের সুখের সংসারে মানসিক চাপ থাকার কথা নয়। তবু ইদানীং প্রায়শই মধু মিয়াকে খুবই চিন্তিত দেখায়।

আষাঢ় মাস। তিন দিন মোটামুটি বৃষ্টির পর আবার চার দিন ধরে একটানা ভারী বর্ষণ চলছে। সোনাভরি নদী অতিরিক্ত জলের প্রবাহে রুদ্রমূর্তির মতো নেচে চলেছে। আর এতেই মধু মিয়ার যত ভয়। উঁচু থেকে নেমে আসা নদী সোনাভরি। বর্ষণ থেমে গেলে ভয়াবহ অবস্থা দেখা দেবে। তখন দুরন্ত নদী পাড় ভাঙার উৎসবে মেতে উঠবে। অথচ নদীটার এতটা রুদ্রমূর্তি ছিল না। একসময় নদীটা প্রস্থে মাত্র আধা কিলোমিটার ছিল। এখন তা বেড়ে প্রায় দুই কিলোমিটার। উঁচু থেকে পাহাড়ি বালিধোয়া পানির প্রবাহ নদীর তলদেশকে ভরাট করেছে। ভরা বর্ষায় নদীটা আগের মতো পানি ধারণ করতে পারে না। ফলে বন্যার প্রকোপ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আগ্রাসী মানুষের অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের ফলে নদীভাঙনও বেড়ে গেছে। গত বছর এ রকম ভাঙনের শিকার হয়ে সচ্ছল উসমান এখন পেটের তাড়নায় ঢাকায় রিকশা চালায়। অথচ উসমান ছিল গাঁয়ের সম্মানী ব্যক্তি!

মানুষের মন হলো আয়না; সে আয়নায় দেখা মুখ হলো তার ভাবনা। মধু মিয়া দুই দিন ধরে খুব চিন্তিত। সোনাভরি নদীর বাঁক থেকে তার জমির দূরত্ব এখন মাত্র ১০০ মিটার! নদীর যেখানে বাঁক, সেখানে ভাঙন তীব্রতর হয়। বৃষ্টি থেমে গেছে। নদীর পানিতে টান ধরেছে। রাতে মধু মিয়ার কেন জানি ঘুম হয় না। ঘুম হবে কী করে? গত বছর উত্তরপাড়ার শাহজাহান মিয়া সোনাভরির করালগ্রাসে নিঃস্ব হয়েছে। সে বছর নদীর বাঁক থেকে তার জমিও যে একই দূরত্বে ছিল।

বিকালে সিয়াম নদীর পাড়ঘেঁষে স্কুল থেকে ফিরছে। হঠাৎ সে লক্ষ করল নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনটা যে তাও আবার ওদের ধানিজমি দিয়েই শুরু হয়েছে! সিয়াম বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নেয়। বাবা খেয়েছে কি না জানতে চায়। একসময় সে বাবাকে বলে, ‘বাবা এবার আমাদের জমিতে...।’ এরপর সে আর বাকিটুকু বলতে পারে না।

কী বলতে গিয়া থাইমা গেলা সিয়াম?

না বাবা, কিছু না।

মধু মিয়া আর জানতে চায় না। সে বুঝে ফেলেছে যে, সোনাভরি এবার তাকে নিঃস্ব করবে। গত বছর সব ধানিজমি হারিয়ে মধু মিয়া এখন দিনমজুরি করে। ইচ্ছা করলে ঢাকায় চলে পারত। যেহেতু বাড়িটা অক্ষতই আছে, সেহেতু মাটির টান ছাড়তে পারেনি। তাছাড়া সে ঢাকায় চলে গেলে পরিবারের নিরাপত্তা কমে যেতে পারে। রুপালি আর সিয়ামের পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতসব ভেবেই গ্রামে থেকে যাওয়া। এখন প্রতিদিন পেটপুরে তিনবার খাওয়া সম্ভব হয় না। কোনো কোনো দিন একবেলা পুরোপুরি খেলেও আরেক বেলা আধা পেটে থাকতে হয়।

সিয়াম মোল্লাবাড়ির দুটো ছোট বাচ্চাকে পড়ায়। মাস শেষে যে ৪০০ টাকা পায়, তা দিয়ে নিজের আর রুপালির খাতা-কলমের টাকা হয়ে যায়। হেমন্তের ধান কাটা শেষ। দিনমজুরের চাহিদাও কমে এসেছে। এদিকে সিয়াম উচ্চমাধ্যমিক দেবে। রুপালিও এসএসসি দেবে। গাঁয়ে থেকে এত দিন কোনোমতে লেখাপড়াটা চালিয়ে গেলেও পরে কী হবে, সে চিন্তা মধু মিয়াকে অনেকটাই রোগাটে বানিয়ে ফেলেছে। নদীর ভাঙনে বিলীন হওয়া সিয়ামদের জমিতে এবার আবার চর জেগে উঠছে। কিন্তু এ জমির মালিক যে এখন সরকার! তাছাড়া এই চরের জমিতে কী হবে? এক দিন সকালে খেতে বসে মধু মিয়া তার ছেলেকে বলল, ‘বাবা সিয়াম, নদী আমাগো যে জমি ভাইঙ্গা নিছিল, সেই জমিতে চর পড়ছে। চরই ফালাবি, তয় মাঝখান থাইক্যা আমাগো নিঃস্ব করল!’ এবার জবাবে সিয়াম বলল, ‘বাবা, ধৈর্যহারা হয়ো না। আমরা আবার স্বাবলম্বী হব।’

‘কিন্তু আমাদের তো জমি নাই!’

‘বাবা, আমরা জেলা প্রশাসন থেকে চরের জমি বন্দোবস্ত নেব।’

‘কিন্তু টাকা কই পামু, বাবা?’

‘বাবা, আমরা ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করা সরকারের রুটিনওয়ার্ক। সুতরাং এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।’

‘কিন্তু ধুধু বালুর চরে কী হবে? ওতে কি ধান হবে?’ বাবা, আমরা যদি শুধু ধান চাষ না করে নানা রকমের শস্য ও সবজির চাষ করতাম, তা হলে হয়তো আজ আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকত।’ ‘কিন্তু বিকল্প কী চাষ করা যাইব?’

‘কেন? বাদাম, তিল, তিসি, ভুট্টা, শিম, লাউ, গাজর, পটোল চাষ করা যায়। বাদাম সুনির্দিষ্ট সময়ে চাষ করতে হয় না। বাকি শীতকালীন ফসল সঠিক পরিকল্পনা করে চাষ করতে পারলে উৎপাদন খরচের দ্বিগুণ লাভ হয়।’

চরের লিজ নেওয়া জমিতে বাদাম, ভুট্টা আর সবজি আবাদ করে দুই বছরে সব খরচ মিটিয়েও মধু মিয়ার ব্যাংকে দুই লক্ষ টাকা জমেছে। ছেলেটাও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সবজি চাষে মধু মিয়ার স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। শাহজাহান মিয়াও রিকশা চালানো ছেড়ে দিয়ে এখন মধু মিয়ার গবাদিপশুর খামার দেখাশোনা করে। মধু মিয়ার এই পরিবর্তন বিচক্ষণ ছেলে সিয়ামের সুপরামর্শ আর সহযোগিতার ফলেই সম্ভব হয়েছে। জামিলা বেগম তার এমন একটা বুদ্ধিমান ছেলেকে পেটে ধরতে মনেমনে আনন্দিত হয়। রুপালি ওর ভাইয়ার বুদ্ধি আর শ্রমনিষ্ঠা দেখে মনে মনে ভবিষ্যতের একজন বড় চিকিৎসক হয়ে ওঠার সাহস সঞ্চয় করে। কারণ সে তার ভাইয়ার মতো করেই ভাবে, মানুষের ভাগ্য তার সাধনা আর শ্রমের বিনিময়েই গড়ে ওঠে।

 

"