ডেঙ্গু

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

রাহাফের বাবা দিনার সাহেব ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে বেশ চিন্তিত। পরিবারের যে কেউ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সে বাড়ির আশপাশটা নিজ হাতে পরিষ্কার করেন। তিনি জানেন যে, ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত জুন, জুলাই মাসে বিশেষ করে বৃষ্টির সময় বা বর্ষাকালে বেশি হয়। দিনার সাহেবের মেয়ে রাহাফ সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে দেখে তার বাবা বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় ও ড্রেন পরিষ্কার করছেন। কোনো জায়গায় যেন পানি জমে না থাকে। তার উদ্দেশ্য কোনো মশা যেন আবদ্ধ পানিতে ডিম পাড়তে বা বংশবিস্তার করতে না পারে। কাজ সেরে বাবা যখন ঘরে প্রবেশ করলেন তখন রাহাফ বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবা, তুমি দু-এক দিন পরপর বাড়ির চারদিকে ঝাড়– দাও কেন? লোকে তোমাকে ঝাড়ুদার বলবে না? তুমি আর এভাবে ঝাড়ু দেবে না। আমার খুব শরম করে।’ মেয়ের কথা শুনে বাবা হাসতে হাসতে বলে, ‘নিজের কাজ নিজে করতে হয়। এতে লজ্জার কিছু নেই। অন্যের ওপর নির্ভর করলে সময়মতো অনেক কাজই ঠিকভাবে হবে না। টেলিভিশনের খবরে দেখছ না, হাজার হাজার মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে? ডেঙ্গুর বিষয়ে আমাদের সবাইকে সবসময় সাবধান থাকতে হবে!’ রাহাফ বাবার কাছে জানতে চায়, ‘ডেঙ্গু কেন হয়? ডেঙ্গু হলে কী হবে?’ ‘আজ তোমাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলব। একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।’ বাবা এই কথা বলে ওয়াশরুমে গেলেন ফ্রেশ হতে।

হাতমুখ ধুয়ে দিনার সাহেব রাহাফকে নিয়ে খেতে বসেন। খাওয়া শেষ করে খানিকটা বিশ্রাম নেন। তারপর তিনি মেয়েকে কাছে ডাকেন। রাহাফের মাও এগিয়ে আসেন। দিনার সাহেব বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বর এক প্রকার সংক্রামক রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাস থেকে হয়ে থাকে। এডিস নামক এক প্রকার মশার কামড় থেকে এই রোগ হয়ে থাকে। মজার ব্যাপার কী জান? ডেঙ্গু জীবাণুবাহী মশা। কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। ঠিক তেমনি আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন মশা কামড়ালে সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবেই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত দুই প্রকার। এক. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর, দুই. হেমোরেজিক জ্বর। কোনো ব্যক্তি যদি ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় তা হলে তার জ্বর ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। শরীরের বিভিন্ন অংশে, মাথায়, চোখের পেছনে, হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়। ৪-৫ দিন পর শরীরে লাল লাল দানা দেখা দিতে পারে। বমি বমি ভাব থাকে। অপরদিকে কোনো ব্যক্তি যদি ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরে আক্রান্ত হয় তা হলে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়তে পারে। পায়খানার সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। দাঁতের গোড়া, নাক থেকে রক্ত বের হতে পারে। এতে রোগীর লিভার ও কিডনি আক্রান্ত হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসের একটি বৈশিষ্ট্য হলোÑ এটি রক্তনালির পরিবর্তন ঘটিয়ে জলীয় অংশ বের করে দেয়। ফলে রোগী পানিশূন্যতায় ভোগে। বড়দের তুলনায় শিশুরা পানিশূন্যতায় বেশি ভোগে। অনেক সময় তীব্র পানিশূন্য হয়ে শিশুরা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। এই জন্য শিশুদের প্রতি একটু বেশি নজর দিতে হয়। তাই কারোর জ্বর হলে কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকে মৃত্যুবরণ করে। যাদের বয়স ১৫-এর নিচে তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সব থাকে বেশি।’

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতার কথা শুনে রাহাফ ভয় পেয়ে যায়। সে ডেঙ্গু জ্বর থেকে বাঁচতে চায়। সে বাবাকে প্রশ্ন করে, ‘বাবা, এডিস মশা দেখতে কেমন?’ ‘খুব সুন্দর প্রশ্ন। বলছি কেন। এই মশার সারা শরীরে সাদা সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকে। পাগুলো লম্বা লম্বা হয়। এই মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। ঘরের মধ্যে এডিস মশা বাস করে। টিনের ক্যান, পরিত্যক্ত টায়ার, অব্যবহৃত পানির পাত্র, সেপটিক ট্যাংক, এয়ারকুলার, ফুলের টব, বাড়ির ছাদ, ডাবের খোসায় জমে থাকা পানিতে এরা বাস করতে ভালোবাসে। তাই আমার লক্ষ্য রাখতে হবে এগুলোতে যেন পানি না জমে। ফুলের টব বা ফুলদানিতে জমে থাকা পানি প্রতি তিন দিন অন্তর অন্তর ফেলে দিতে হবে। পানির ট্যাংক, হাউস কিংবা ম্যানহোলের গর্তগুলো ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখলে এবং বাসায় জমানো পানি ফেলে দিলে ডেঙ্গু নিরাময় সম্ভব। মনে রাখতে হবে, মশা যেন বংশবিস্তার করতে না পারে।’ বাবার কথা শুনে রাহাফ বলে, বাবা আমার ডেঙ্গু জ্বর হবে না তো? আমার খুব ভয় পাচ্ছে! ভয় পেও না। তুমি সাবধান থাকবে। খেয়াল রাখবে দিনের বেলায় যেন মশা না কামড়ায়। আর একটা কথা অবশ্যই ঘুমানোর সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমাবে। ইনশাআল্লাহ তোমার কিচ্ছু হবে না। বাবার সান্ত¡নার কথা শুনে রাহাফ খুশি হয়।

আফরা রাহাফের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সে কয়েক দিন ধরে স্কুলে আসে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে সে কয়েক দিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে ভুগছে। দুই দিন পরে শাহেদ নামে তার আরেক সহপাঠী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। শুধু তা-ই নয়, রাহাফদের ক্লাস টিচারেরও ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকসহ সব অভিভাবক রীতিমতো ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকে ভয়ে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে বাবার সাবধান বাণীর কথা রাহাফের মনে পড়ে। সে স্কুলে তার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ডেঙ্গুর বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। জুলি বলে আমাদের স্কুলের চারপাশে অনেক ড্রেন রয়েছে। সেগুলোতে সব সময় পানি জমে থাকে। সেখানে প্রচুর মশা রয়েছে। দিনের বেলায় প্রায়ই আমাদের গায়ে মশা কামড় দেয়। ড্রেনগুলো দ্রুত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ক্লাস ক্যাপ্টেন মুকিম সবার কাছে জানতে চায়; ড্রেনগুলো পরিষ্কারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হেড স্যারের কাছে আবেদন করলে কেমন হয়? সকলেই সমস্বরে বলে ওঠে, উত্তম প্রস্তাব। আমরা আজই এ বিষয়ে আবেদন করব। সত্যি সত্যি তারা একটি আবেদনপত্র লিখে হেড স্যারের কাছে জমা দেয়। ডেঙ্গু বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের সচেতনতার কথা জেনে হেড স্যার খুশি হয়। স্যার ওদের কথা দেয়- আগামীকালই আমি ড্রেনগুলো পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করব। এখন তোমরা সকলে ক্লাসে ফিরে যাও। স্যারের প্রতিশ্রুতির কথা শুনে ছাত্রছাত্রীরা খুশি মনে ক্লাসে ফিরে যায়।

পরদিন হেড স্যার স্কুলের সকল ড্রেন এবং আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করার পর সেখানে মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে মশার উপদ্রব অনেকাংশে কমে যায়। ছাত্রছাত্রীরা নিশ্চিন্তে ক্লাস করে। রাহাফের উদ্যোগকে অনেকে স্বাগত জানায়। এতে তার মা-বাবাও খুশি হয়।

 

"