আমতলার পেতনি

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মিনহাজ উদ্দীন শরীফ

রাত তখন আনুমানিক ১১টা প্রায়। ইটবালুর বিশাল ঘরের এক কোণে আমার রুমটা। বাবার রুমটা; আমার কক্ষ থেকে তিনটা কক্ষ ছাড়িয়ে। আমি আনমনা কখন কোথায় কী রাখি খেয়াল থাকে না। ওই রাতে আমি জীববিজ্ঞানের ‘জীবের পরিবহন’ এই পরিচ্ছেদটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম। সাড়ে ১১টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেল; তখন আঁধার এসে আমাকে ঘিরে ধরল। টর্চলাইট খুঁজতে লেগে গেলাম তাড়াহুড়ো করে। কিছুক্ষণ খোঁজার পর পেয়েছি টেবিলের এক কোণে। জ্বালিয়ে আবারও পড়তে শুরু করি। কিন্তু অসহ্য গরমের জন্য রুমে থাকাটা কষ্টসাধ্য ছিল। কোনো উপায় না পেয়ে জানালা খুলে দিলাম। জানালা খুলে দেওয়ামাত্রই শীতল বায়ু আমার রুমটা শীতল করে দিল। আহা! আমি আনন্দে লাফিয়ে গান ধরি গুনগুন করে। বেশ কিছুক্ষণ সময় এভাবে কাটালাম। হঠাৎ জানালার বরাবর চেয়ে দেখি আমগাছের তলে কে যেন কাঁদছে। ফার্স্টটাইম এতটা গুরুত্ব দেইনি। যতটা রাত গভীর হচ্ছে, তত কান্নার ধ্বনি বেড়েই চলছে। বিষয়টা আমার কাছে সুবিধার লাগছিল না। তাই লাইট আর একটা লাঠি হাতে নিয়ে আম গাছের তলে যাই, গিয়ে দেখি কেউ নেই! ভাবলাম আমি হয়তো ভুল শুনেছি। এই বলে রুমে ফিরে আসার জন্য যেই না হাঁটতে শুরু করেছি। ঠিক তখনই পেছন থেকে কান্নার আওয়াজ কর্নে ভেসে আসল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি কারো উপস্থিতি নেই। একটু দাঁড়ালাম এদিক-ওদিক লাইট মেরে দেখছি। কাউকে পেলাম না। আর ভাবছি, এত রাতে এখানে আসা কি ঠিক হইল। বাবা এক দিন বলেছিল, এই আমতলায় একটা পেতনি আছে। ওই তখন আমি বাবার কথাটা কানেই তুলিনি। কারণ আমি সায়েন্স নিয়ে পড়ছি। বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে যারা পড়ালেখা করে তারা এসব বিশ্বাস করে না আর আমিও তাদের ব্যতিক্রম নই। এজন্য ভূত প্রেতাত্মা আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

কিন্তু আজ কেন জানি না বাবার কথাটাই সত্যি মনে হচ্ছে। বিষয়টা আরেকটু ক্লিয়ার করার জন্য মনে সাহস সঞ্চয় করে বলতে লাগলাম কেউ এখানে আছেন? থাকলে সামনে আসেন। চারদিক নির্জন মনে হচ্ছিল, কোনো অশুভ ছায়া ঘিরে রেখেছে ওই রাতটা। তার পরও ভয় পাইনি আমগাছের নিকটে একটা বাঁশের ঝোপ ছিল, সেখানে গিয়ে একটু বসলাম। রীতিমতো ঝড়ও উঠেছে। তাই বাসায় যেতে পারছি না। তখন রাত ১২টা। তখনই দেখলাম আসল লীলা। ছোট্ট-বড় ১৭টি পেতনি এক স্থানে মিটিং করছে। তারা বলছে, আগামীকাল অমাবস্যা রাত, ওই রাতে যদি মানুষের রক্ত পান না করতে পারে, তা হলে তাদের শক্তি হ্রাস পাবে। এই কথা শোনা মাত্রই আমার বুকে কম্পন সৃষ্টি হয়ে গেছে। তখন আমার পাশে বাবার উপস্থিতিটা বড়ই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাবা জানে না আমি যে এখানে এসেছি। কিছুক্ষণ পর ঝড়ও থেমে গেল। ভাবছি পেতনিদের চোখের আড়াল হয়ে চলে যাব বাসায়। যেই না ঝোপের আড়াল থেকে খোলা মাঠে আসলাম; তখনই সবগুলো পেতনি আমাকে ঘিরে ধরল। তাদের বিভিন্ন ধরনের রূপের আকৃতি দেখে আমি ভয়ে হতাশ হয়ে চিৎকার করে বাবাকে ডাকতে লাগলাম। তাদের মধ্যে একটা পেতনি আমার কাছে এসে শরীর আর মুখে চেপে ধরার চেষ্টা করছে। ওইদিকে আমার চিৎকারে বাবারও ঘুম ভেঙে যায়। আমার নাম ধরে ডেকে বলছে, মিনহাজ কইরে তুুই। তাদের মধ্যে শক্তিশালী ও ভয়ানক চেহারার পেতনিটাকে দেখে আমি চিৎকার করতে লাগলাম। আমার চিৎকার শুনে বাবা আমতলায় দৌড়ে এলো। যেই না বাবার পায়ের শব্দ শোনা গেল, তখনই পেতনিগুলো ভ্যানিস হয়ে যায়। বাবা ডাকছে, মিনহাজ তুই কই বাবা। বাবার ডাক শুনে আমি বুকভরা হতাশ নিয়ে বলতে লাগলাম, বাবা আমি এখানে তুমি আমাকে বাঁচাও। বাবা বলল, মিনহাজ চিন্তা করিস না, আমি থাকতে তোর কোনো ক্ষতি হবে না। বাবাকে সামনে দেখতে পেয়ে সব ভয় কেটে গেল দৌড়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। বাবা বলে আর কাঁদতে হবে না, আমি তো আছি তোর পাশে। আমার স্তব্ধ মুখে দিয়ে কোনো সাউন্ড আসছে না। বাবা বলল, এত রাতে তুই এখানে কেন? তুই না পড়তে বসেছিলে। আমি কোনো কথা না বলে বাবাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা বুঝতে পেরেছে আমি যে খুব ভয় পেয়েছি। তাই আর কোনো কিছু জিজ্ঞাস না করে আমাকে বাসায় নিয়ে গেল এবং বাবার বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে দেয়। মুয়াজ্জিনের মধুর কণ্ঠের আজান শুনে বাবা ও আমার ঘুম ভেঙে যায়। বাবা উঠে ওজু করে নামাজ পড়তে গেল মসজিদে। নামাজ পড়ে একটু হেঁটে এসে আমাকে ডাকছে মিনহাজ উঠে গোসল করে আয় তোকে নিয়ে তান্ত্রিকের কাছে যাব।

বাবার কথামতো উঠে গোসল করে আসলাম। এই ফাঁকে বাবা নাশতা রেডি করে রেখেছে। আমি এসে খেলাম, পরে বাবা বলে, এখন আয় যাওয়া যাক। বাবার হাতটা ধরে বাসা থেকে বাহির হয়ে টমটমগাড়িতে চড়ে ওই তান্ত্রিকের বাড়িতে গেলাম। ওই তান্ত্রিক নাকি আমার ফুফা হয়। বাবা আসতে আসতে বলল। তান্ত্রিকের বাড়িতে গিয়ে তান্ত্রিকের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র বাবা সালাম দিল আমিও দিলাম। তারপর কুশল বিনিময় হলো ফুফার (তান্ত্রিকের) সঙ্গে বাবার। তান্ত্রিক ফুফা বাবাকে জিজ্ঞাসা করছে কিরে ভাই কি মনে করে আসলি বলত? বাবা তান্ত্রিক ফুফার কাছে এক এক করে ওই ঘটনাসহ পূর্বের ঘটনাও বলল। ফুফা বলে আর বলতে হবে না, আমি সব জানি। আমি তো তান্ত্রিক ফুফার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেছি। বাবা বলল, ভাই আমাদের এই পেতনির হাত থেকে রক্ষা করেন। বাবার কথা শুনে তান্ত্রিক ফুফা রাজি হলো আমাদের বাড়িতে আসার। আবারও আমরা টমটম ভাড়া করে বাড়িতে আসলাম তান্ত্রিক ফুফাকে নিয়ে। তান্ত্রিক ফুফা আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করেই মন্ত্রপাঠ করতে লাগল। তারপর বাবা নিয়ে গেল ওই ভয়ানক আমতলায় তান্ত্রিক ফুফাকে। তান্ত্রিক ফুফা গাছের তলায় গিয়ে পেতনিদের আহ্বান করছেন। কিছুক্ষণ এভাবে আহ্বান করার পর ছোট্ট-বড় ১৭টা পেতনি হাজির হলো। তারপর তান্ত্রিক ফুফা বলছে, তোরা কার বাড়িতে আস্তানা করেছিস জানিস কি? পেতনিরা তান্ত্রিক ফুফার মন্ত্রে বশ হওয়া তাই কথামতো উত্তর দিল না। তান্ত্রিক ফুফা বলল, এটা আমার শ্বশুরবাড়ি। তোর আজকের মধ্যেই এই বাড়ি থেকে দূরে অন্য কোথাও চলে যাবি। তাদের দলের প্রধান পেতনিটা সাহস করে বলে উঠল হুজুর যেতে পারি একটা শর্তে। তান্ত্রিক ফুফা বলল, আবার কিসের শর্ত বল শুনি। বুঝে আসলে রাখব, না হলে বাদ। পেতনিটা বলল, হুজুর আমাদের একটা ভেড়া দিতে হবে। তান্ত্রিক ফুফা বলল, সারাজীবনের জন্য বন্দি হয়ে থাকতে চাস কি? পেতনিটা বলল, না হুজুর আজ গভীর রাতেই আমরা চলে যাব। তান্ত্রিক ফুফা বলল, যেতে তোদের ভেড়া নিয়ে যাইস। পেতনিটা বলে, তা হলে হুজুর গভীর রাতে ভেড়াটা দিতে হবে। তাদের কথামতো গভীর রাতে তান্ত্রিক ফুফা ভেড়াটা আমতলায় ছেড়ে দিল। পেতনিরা ভেড়া পেয়ে আমগাছের সবচেয়ে উঁচু ডালটা ভেঙে চলে গেল। ভোরবেলা তান্ত্রিক ফুফা আবারও মন্ত্র পাঠ করে; দেখে আসলেই চলে গেছে পেতনি ও তার দলবল। ওই থেকে আমাদের বাড়িটা প্রেতাত্মা মুক্ত।

 

"