বৃষ্টিভেজা কলাগাছের ভেলা

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

শামীম শিকদার

সকাল থেকেই টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। ঘর থেকে বের হয়ে কোনো কাজ করার উপায় নেই। দুদিন ধরেই এমন বৃষ্টি। রাস্তাঘাট কাদায় ভরপুর। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি ভিজে একাকার। বাড়ির চারপাশে পানিতে থৈ থৈ করছে। তাইফ ব্যস্ত মাছ ধরা নিয়ে। রিমঝিম বৃষ্টিতে মাথায় পলি বেঁধে ঠেলা জাল দিয়ে মাছ ধরছে বাড়ির পাশেই। ওপরে দাঁড়িয়ে তাইফের মাছ ধরা দেখছে পাশের বাড়ির আতিফ। দুজনের গলাগলি সম্পর্ক। দুজন একসঙ্গে হলে দুষ্টামিটা যেমন স্থায়ী হয়, কাজটাও তেমন সুন্দর হয়। বাড়িতে মায়ের শত বাধা পেরিয়ে শখের বশে মাছ ধরতে এসেছে তাইফ। বাড়ির চারপাশে ধানখেত। টানা বৃষ্টি হওয়াতে তাতে পানি জমে ডুবায় পরিণত হয়েছে। ওপরের খেতগুলো থেকে নিজের খেতে পানি নামে। পানি নামার সময় তাইফ ঠেলা জাল ধরে রাখে। সেখান থেকেই ছোট ছোট মাছ জালে ধরা পড়ে। মাছ নিয়ে তাইফের কৌতূহলের শেষ নেই। হঠাৎ বৃষ্টিতে কোথা থেকে আসে মাছ! এমন প্রশ্ন বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে তার দাদুর কাছে।

আতিফ পাশে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা উপভোগ করছে। তাদের দুজনের ভালো কাজের মধ্যেও যেন দুষ্টামি এসে ভিড় জমায়। আতিফের মাথায় কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানানোর বুদ্ধি এলো। এমন বুদ্ধির কথা তাইফকে না বলে আর পারা যায়! মাছ ধরা বাদ দিয়ে তারা নেমে গেল কলাগাছ সংগ্রহের কাজে। কলাগাছ পাওয়া গেল, কিন্তু তা পানিতে নামানো বেশ কষ্ট। দা দিয়ে গাছ টুকরো টুকরো করে কেটে তা পানিতে নামানোর যোগ্য করা হলো। এবার শুরু হলো একটি গাছের সঙ্গে অন্য গাছের জোড়া লাগানোর কাজ। সে কাজকে সহজ করার জন্য ব্যবহার করা হলো বাঁশ। কিছু সময়ের জন্য তাদের কাজের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াল তাইফের মা। হাতে লাঠি নিয়ে এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে জ্বর বাঁধানো ছাড়া আর কোনো কাজ আছে, ওপরে ওঠে আয়। বেশ কয়েকবার বলার পর বাধ্য হয়ে চলে গেল। তাতে তাদের দুজনের কোনো গুরুত্ব নেই, তারা মন দিয়ে কাজ করছে। অবশেষে কলাগাছে তিনটি টুকরো দিয়ে তৈরি করল নান্দনিক একটি ভেলা। দুজনে ভেলায় ভেসে অজানা সুখ পায়। শত কষ্টের মাঝেও তাদের অনুভূতিগুলো যেন সার্থক। সময়-অসময় ভেলায় ভাসে তারা। এমনভাবে কত শুকনো কাপড় যে ভিজিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। এজন্য বাড়িতে রীতিমতো বকা শুনতে হয়। কে শুনে কার কথা, এত কষ্টের শখের ভেলায় না ভাসলে কী আর হয়। তাদের পাড়ায় আরো অনেক ছেলেমেয়ে থাকে। সবার সঙ্গেই খেলাধুলা মেতে উঠে সকলে। তবে তাইফের বেশ ভালো সম্পর্ক আতিফের সঙ্গে। দুজনে একসঙ্গে স্কুলে যায়। একই ক্লাসে পড়ে। এমনকি একসঙ্গে বাড়িতে টিফিন খেতে আসে। দুদিন ধরে স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না বৃষ্টির কারণে। টানা বৃষ্টি পড়ছে, তবে তা টিপটপ বৃষ্টি। এমন বৃষ্টির দিনে মাছ ধরা যেমন আনন্দের নিজে ভেলা তৈরি করে তাতে ভাসাও কম আনন্দের নয়। সামনে দুজনেরই পিএসসি পরীক্ষা। দুষ্টুমি শুরু করলে পড়ালেখার কথা মনে থাকে না। কয়েক দিন ধরে কলাগাছের ভেলা নিয়ে ব্যস্ত তারা দুজন। বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু থামেনি তাদের শখের ভেলা চালানোর কাজটি। স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে অবসর থাকলে নানা বুদ্ধি তাদের মাথায় ভিড় জমায়। সে বুদ্ধিগুলোকে বাস্তবায়ন করতে একে অপরের সহযোগিতা নেয়। আতিফের বাড়ির পাশেই একটি কদম ফুলগাছ। তাতে ফুলও এসেছে বেশ। কিন্তু গাছ থেকে ফুলপাড়ার সাহসটুকু কারো নেই। গাছটি আতিফের বাড়ির কাছে হলোও গাছের প্রকৃত মালিক রহিম মিয়া। খুব কড়া মানুষ। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা উনাকে খুব ভয় পায়। কদম ফুল দিয়ে উনার কোনো কাজ নেই, তবুও কাউকে তা ছিঁড়তে দেবে না। দিনের বেলা ওনার ভয়ে কেউ গাছের কাছেও যায় না। আজকে অবিরত বৃষ্টি পড়ছে। আতিফ ও তাইফ ফুল পাড়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলো। মনের ভেতর হালকা ভয় কাজ করছে। তবে তাদের ফুল পাড়া চাই। ডানপিটে স্বভাবের ছেলে বলে কথা। যে ভাবনা সে কাজ। চুপিচুপি গাছে উঠে পড়ল তাইফ। দুই হাত ভরে ফুল নিয়ে দ্রুত বাড়িতে হাঁটা শুরু করল। অবিরত বৃষ্টির কারণে আশপাশে কোনো মানুষ নেই। একেবারে ফাঁকা জনপথ। ফুল চুরি করে তাদের ব্যক্তিগত কোনো লাভ না হলেও মনের শখ তো মিটবে। বৃষ্টি ভেজা প্রতিটি মুহূর্তই কাটে তাদের এভাবে।

 

"