বজ্রপাত

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

রাফিদ গ্রামের হাইস্কুলে পড়াশোনা করে। তার স্কুল বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে। সে নিয়মিত স্কুলে যায় ঠিকই, কিন্তু স্কুল ছুটির পর সে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে ওঠে। কখনো গাছে চড়ে। কখনো খাল-বিলের পানিতে মাছ ধরে। তাই প্রতিদিন তার বাসায় ফিরতে দেরি হয়। এর জন্য প্রায়ই তাকে মা-বাবার বকুনি শুনতে হয়। তার পরও সে দেরি করে। মা-বাবাকে ভয় পায় না। স্কুলের যাওয়ার পথে ছোট একটা বিল পার হতে হয়। সেই বিল তার খুব প্রিয়। এই বিলের আশপাশেই তার বিচরণ। ছুটির দিনেও সে এর আশপাশেই বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। বাবা দিনমজুরের কাজ করেন। রাফিদের তেমন করে খোঁজখবর নিতে পারে না। তার মা-ই তাকে চোখে চোখে রাখেন। এখন বর্ষাকাল। যখন-তখন বৃষ্টি নামে। বৃষ্টিতে ভিজতে রাফিদের খুব ভালো লাগে। সে ভিজে ভিজে স্কুলের মাঠে বল খেলে। কখনোবা টেসিন বল দিয়ে ক্রিকেট খেলে। গালিব, তালিব, আমের, রাজা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা একই ক্লাসে পড়ে। তাদের বাসাগুলো তার বাসার কাছাকাছি। তাই সুযোগ পেলেই তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করে। একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। বর্ষাকালের বৃষ্টি তাদেরও খুব প্রিয়। বৃষ্টিতে ভিজে তারা খেলতে পছন্দ করে। রাফিদের মা তাকে জ্বর হবে বলে বকা দিলে উত্তরে সে বলে, ‘আমার কখনো জ্বর হতে দেখেছ? যেদিন জ্বর হবে সেদিন বলবা। তার আগে আমাকে বকাবকি করবা না। তারপর থেকে আর বৃষ্টিতে ভিজব না।’ মা রাফিদের সঙ্গে কথায় পেরে ওঠেন না। তবু ডানপিটে ছেলেকে যতটুকু পারে শাসন করেন।

আকরাম স্যার রাফিদদের ক্লাস টিচার। তিনি বিজ্ঞান পড়ান। আজ আকরাম স্যার বজ্রপাত নিয়ে ক্লাস নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা অনেকেই হয়তো লক্ষ করেছ ঝড়বৃষ্টির সময় কিংবা এর আগে-পরে আকাশে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি। এর কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দ। এটাকেই আমরা বজ্রপাত বলি। এই বজ্রপাত খুব ভয়ংকর। বজ্রপাতের আঘাতে মানুষের মৃত্যু ঘটে। বজ্রপাতের কারণ কী জিজ্ঞাসা করলে তোমরা হয়তো অনেকেই বলবে মেঘে মেঘে সংঘর্ষের ফলে বজ্রপাত হয়। এই ধারণ সঠিক নয়। এখন তোমাদের বলব, এই বজ্রপাত কেন হয়। গত ক্লাসে আমি তোমাদের পানি চক্রের ঘটনা বর্ণনা করেছিলাম। নিশ্চয় তোমাদের তা মনে আছে। আজ আবারও বলছি। পানিচক্রের নিয়মে জলাধারের পানি বাষ্পীভূত হয়ে মেঘ আকারে আকাশে আশ্রয় নেয়। বাষ্প যখন ওপরের দিকে উঠতে থাকে তখন অন্যান্য বায়ু ও জলীয় কণার সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। ফলে একেকটা জলীয় কণা ব্যাটারির মতো কাজ করে। বজ্রপাতের জন্য দায়ী মেঘ বৈদ্যুতিক চার্জের আধারের মতো আচরণ করে। ইলেকট্রন জলীয় কণার নিচের দিকে বেশি অবস্থান করে বলে এই অংশে ঋণাত্মক চার্জ জমা হয় আর ওপরে ধনাত্মক চার্জ জমা হয়। যখন এই ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ মিলিত হয় তখনই বজ্রের সৃষ্টি হয়। মেঘের বিপুল শক্তিশালী বিদ্যুৎ ক্ষেত্র তার চারপাশের বাতাসের অপরিবাহী ধর্মকে নষ্ট করে দেয়। যাকে বলে উরবষবপঃৎরপ ইৎবধশফড়হি। মেঘে অবস্থিত বিদ্যুৎ ক্ষেত্র যখন যথেষ্ট শক্তিশালী হয় (প্রতি ইঞ্চিতে প্রায় ১০,০০০ ভোল্ট), তখন তার আশপাশের বাতাস পজিটিভ এবং নেগেটিভ চার্জে বিভক্ত হয়ে যায়। এই আয়নিত বাতাস প্লাজমা নামেও পরিচিত। বাতাস আয়নিত হয়ে মেঘ এবং ভূপৃষ্ঠের মধ্যে বিদ্যুৎ চলাচলের পথ বা শর্টসার্কিট তৈরি করে দেয় এবং বজ্রপাত ঘটায়। এ সময় তড়িৎ বিভবের পার্থক্য ১০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে আর তরিৎ প্রবাহের মাত্রা ৩০ হাজার এম্পায়ার পর্যন্ত হতে পারে। বিভবের পার্থক্যের ওপর প্রবাহের মাত্রা নির্ভর করে। এ সময় বাতাসের তাপমাত্রা ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই প্রচন্ড শক্তির স্থায়িত্ব মাত্র সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ। কেউ যদি বজ্রপাতের মধ্যে পড়ে তা হলে সঙ্গে সঙ্গে সে মারা যাবে। তবে আশার কথা হলো মোট বজ্রপাতের মাত্র ২৫ ভাগ ভূপৃষ্টে পড়ে আর বাকিগুলো মেঘের মধ্যেই ঘটে থাকে। যখন মেঘের মধ্যে ধনাত্মক আর ঋণাত্মক চার্জ মিলিত হয়; তখন তা মেঘের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এ সময় মেঘের জলকণা ভেঙে অক্সিজেন আর হাইড্রোজেনের এক বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে প্রচন্ড শব্দ তৈরি হয়। শব্দ আর বিদ্যুৎ একই সঙ্গে তৈরি হলেও বিদ্যুতের গতি বেশি হওয়ার কারণে আমরা আলো আগে দেখতে পাই আর পরে শব্দ শুনতে পাই।

আকরাম স্যার আরো বলেন, ‘বিশ্বে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম। সারা বিশ্বে মার্চ থেকে মেÑ এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। এশিয়ায় বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার মধ্যে বাংলাদেশের নোয়াখালীর অবস্থান পঞ্চম। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এই তথ্য ওঠে এসেছে। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা করা হয়েছে। দেশে বজ্রপাতের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাবে, ২০১৪ সালে সারা দেশে ৯১৮টি বজ্রপাত আঘাত হেনেছিল, ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৮টি, ২০১৬ সালে তা দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এখন আমাদের জানতে হবে এই বজ্রপাত থেকে আমরা কীভাবে বাঁচতে বা রক্ষা পেতে পারি। বজ্রপাতের সময় তোমরা কেউই বাইরে বের হব না। সব সময় বাসাবাড়ির মধ্যে অবস্থান করব। বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবে না। জানালা বন্ধ করে রাখব। রাস্তায় কিংবা খোলা মাঠে থাকাকালীন এমন পরিস্থিতি সামনে পড়লে পাকা বাড়ির নিচে আশ্রয় নেবে। কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় থাকব না। উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকবে। বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় তোমরা কেউ বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ, বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি ইত্যাদি স্পর্শ করবে না। এমনকি ল্যান্ডলাইন টেলিফোনও স্পর্শ করব না। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে। গাড়ির ভেতরে থাকলে গাড়ির কাচে হাত দেব না। আর হ্যাঁ তোমরা বজ্রপাতের সময় কেউ পানিতে সাঁতার কাটবে না। কেউ খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করবে না। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।’ আকরাম স্যার সব ছাত্রছাত্রীকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, ‘এখন বর্ষাকাল। যেকোনো সময় ঝড়বৃষ্টি হতে পারে। বজ্রপাত হতে পারে। তোমরা বজ্রপাত থেকে অবশ্যই সাবধান থাকবে।’

আকরাম স্যারের ক্লাস থেকে সব ছাত্রছাত্রী শিক্ষা নেয়। কিন্তু রাফিদ স্যারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেনি। আর যেটুকু শুনেছে তা তার বিশ্বাস হয়নি। কদিন পরেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। মাঝেমাঝে বিদ্যুৎ চমকায়। রাফিদ বৃষ্টিতে ভেজার জন্য ঘর থেকে বের হতে চাইলে তার মা নিষেধ করে। কিন্তু সে মায়ের কথায় কান দেয় না। বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়ে। সে গালিবকে ডাকার জন্য তাদের বাড়িতে যায়। কিন্তু গালিব বজ্রপাতের মধ্যে বাইরে যেতে রাজি হয় না। এরপর সে দৌড়ে চলে যায় রাজাদের বাড়ি। সেও রাজি হয় না। কী আর করা সে একাই ভিজতে থাকে। খালি পায়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে। হঠাৎ প্রচ- একটা বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায়। রাফিদের কথা চিন্তা করে তার মায়ের বুকটা ভয়ে কাঁপতে থাকে। বৃষ্টি ছাড়তে না ছাড়তেই পরিচিত একজন দৌড়ে এসে রাফিদের মাকে বলে, ‘রাফিদের মাথায় বাজ পড়েছে।’ তার মা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যায়। রাফি আর প্রাণে বেঁচে নেই। রাফিদের মৃতদেহ ঘিরে ইতোমধ্যে পাড়ার লোকজনরা ভিড় করে আছে। তার মা রাফিদের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। খবর পেয়ে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনরা ছুটে আসে। রাফিদের ডাকে সাড়া দিলে গালিব ও রাজারও হয়তো একই রকম পরিণতি হতো। তাই রাফিদের ভয়াবহ পরিণতির কথা মনে হলে তার এই ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু নির্বাক নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে জীবনে যত দিন বেঁচে থাকবে, কখনো গুরুজনদের

অবাধ্য হবে না।

 

"