পাখির নীড়ে সাপের হানা

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

মজনু ও সোহাগ তারা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দীঘিপাড় গ্রামের হাইস্কুলে তারা একই ক্লাসে পড়ে। অবসর সময়ে একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, একসঙ্গে খেলাধুলা করে। গ্রামের মাঠঘাট, গাছপালা, ঝোপঝাড় তাদের খুব প্রিয়। স্কুল ছুটির পরও তারা সময়মতো বাসায় ফেরে না। এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরির পর বেশখানিকটা দেরি করে বাসায় ফেরে। সময়মতো নাওয়া-খাওয়াও ভুলে যায়। এর জন্য অবশ্য প্রায়ই তাদের ভাগ্যে জোটে বাবা-মায়ের বকুনি। তবুও তারা এর থেকে কোনো শিক্ষা নেয় না। মন যা চায় তাই করে। বড় বড় গাছ তাদের খুব প্রিয়। কখনো গাছে চড়ে, কখনোবা গাছের ডাল ধরে ঝুল খায়। সুযোগ পেলেই পাখির নীড় থেকে ডিম চুরি করে। ডিম না পেলে বাসা ভেঙে দেয়। তবে ডিম ভাঙার খবর যদি বাবা-মা ঘুণাক্ষরেও টের পায়, তা হলে আর রক্ষা নেয়। আচ্ছা করে পিটিয়ে দেয়। গ্রামের ধূপপাড়ার পুকুর পাড়ে বড় একটা সেগুনগাছ আছে। সেই গাছে বেশ কটা নীড় রয়েছে। অনেক দিন ধরেই মজনু সোহাগকে বলছে, ওই গাছে আমরা দুজন একসঙ্গে উঠব। খুঁজে খুঁজে নীড় থেকে ডিম চুরি করব। কিন্তু সোহাগ কিছুতেই রাজি হয় না। কারণ কদিন আগে তার বাবা এই কাজের জন্য তাকে পিটুনি দিয়েছে। পাখির নীড় থেকে ডিম চুরি না করার জন্য তার বাবার কড়া নিষেধ আছে। তাছাড়া বাবা বলেছে গাছের ফোঁকলে যেসব পাখি বাসা বাঁধে, সেখানে গেছো সাপ থাকতে পারে। সোহাগের কথা শুনে মজনু হেসে দেয়। সে তার কথা কোনোভাবেই বিশ্বাস করে না। সে বলে, ‘এসব মিথ্যা কথা। আমি এর আগে অনেকবার পাখির নীড় থেকে ডিম চুরি করেছি। কখনো সাপ দেখেনি। সে আরো বলে, তুই গাছে উঠিস না, আমি উঠব। তুই শুধু নিচে থাকবি। তা হলেই চলবে।’

কয়েক দিন পর সোহাগ আর মজনু হাঁটতে হাঁটতে পুকুরপাড়ে গেল। হঠাৎ মজনু সোহাগকে বলল, ‘চল, আজ ওই গাছ থেকে পাখির ডিম পাড়ি।’ কিন্তু সোহাগ রাজি হলো না। তখন মজনু বলল, ‘তুই গাছে না উঠিস, নিচে থাকবি। আমি উঠব।’ সোহাগ রাজি হয়ে গেল। মজনু গাছে উঠল আর সোহাগ নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর কাজকর্ম দেখতে থাকল। মজনু গাছে উঠে একটি পাখির বাসাতে হাত দিল, কিন্তু ডিম পেল না। এরপর একটি ফোঁকলের দিকে হাত বাড়াল। সে ভাবল, এই ফোঁকলে পাখি বাসা বানিয়েছে। নিশ্চয় এখানে ডিম পাব। গাছের ফোঁকলের ভেতর মজনু যেই হাত দিয়েছে আর ওমনি চিৎকার করে ওঠে। তার হাতের সঙ্গে একটা সাপ বের হয়ে আসে। সাপটি হাত কামড়ে ধরে আছে। সে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘আমাকে বাঁচাও আমাকে বাঁচাও। আমাকে সাপে কেটেছে।’ মজনু যখন গাছ থেকে নামার চেষ্টা করে, তখন সোহাগ এক দৌড়ে মজনুদের বাড়িতে গিয়ে লোকজনদের খবর দেয়। লোকজনরা দৌড়ে মজনুর কাছে ছুটে গেল। উপস্থিত লোকজনরা মজনুর হাতের ক্ষতস্থানের ওপরটা শক্ত করে বেঁধে দেয়; যাতে বিষ উপরে উঠতে না পারে। তার বাবা খবর পেয়ে বাজার থেকে ছুটে আসে। গ্রামের লোকজনরা ওঝা খুঁজতে শুরু করে। ওদিকে মজনু সাপের বিষে ছটফট করতে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য কোথাও ওঝা পাওয়া যায় না। সময়মতো ওঝা পাওয়া না গেলে যে মজনুকে বাঁচানো যাবে না! নানা সব অমঙ্গলের কথা চিন্তা করে মজনুর মা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। পাশের গ্রামের কলেজ পড়ুয়া এক বড় ভাই খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। সে বলে, ‘রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। তবে সাবধান হাতের বাঁধন যেন খুলে না যায়। আর হ্যাঁ বাঁধন যেন খুব শক্ত না হয়। নইলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। এতে গ্যাংগ্রিন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।’ সকলে ধরাধরি করে মজনুকে হাসপাতালে ভর্তি করায়।

যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে মজনু দুদিন পরই সুস্থ হয়ে যায়। মজনুকে দেখার জন্য তার বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন এসেছে। আজ তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে। চিকিৎসক সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ। আপনারা সময়মতো রোগীকে হাসপাতালে এনেছিলেন। নইলে বিপদ হতো। আমাদের দেশে প্রায় ৮২ থেকে ১০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সাপ বিষধর। বাকি সাপগুলো কামড় দিলেও কিছু হয় না। এই সুযোগটাই নেন ওঝারা। আমাদের দেশে বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, সাপে কাটা রোগীর স্বজনরা রোগীকে চিকিৎসকের কাছে না এনে ওঝার কাছে নেন। বিষধর সাপ না হলে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ওই রোগীরা সুস্থ হয়ে যায়। আর স্বজনরা ভাবেন, ওঝার ঝাড়ফুঁক, পানিপড়া, গাছের লতাপাতার চিকিৎসায় রোগী ভালো হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের উচিত সাপে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ওঝার কাছে না নিয়ে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া। আপনারা ঠিক কাজটিই করেছেন। আপনারা মনে রাখবেন, বিষধরের বিষ শরীরে নানাভাবে কাজ করে। বিষ মাংসপেশিকে অসাড় করে দেয়, রক্তকনিকা ভেঙে ফেলে, রক্ত জমাট বাঁধায়। ফলে শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, শক প্রভৃতির মাধ্যমে রোগীর মৃত্যু হয়। সাপে কাটা রোগীকে সব সময় সাহস দেবেন। আক্রান্ত অঙ্গ অবশ্যই স্থির রাখতে হবে। বেশি নড়াচাড়া করা যাবে না। আক্রান্ত অঙ্গ ব্যান্ডেজের সাহায্যে একটু চাপ দিয়ে প্যাঁচাতে হবে। সাবান দিয়ে আলতোভাবে ধুতে হবে অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে আলতোভাবে মুছতে হবে। কোনো ধরনের শক্ত বাঁধন/গিঁট দেওয়া যাবে না। কামড়ানো স্থানে ব্লেড, ছুরি প্রভৃতি দিয়ে কোনো প্রকার কাটাকুটি করা যাবে না, ভেষজ ওষুধ, মুখের লালা, পাথর, উদ্ভিদের বীজ, গোবর, কাদা ইত্যাদি লাগানো যাবে না, কোনো রাসায়নিক পদার্থ লাগানো বা তা দিয়ে ছ্যাঁক দেওয়া যাবে না। আপনাদের প্রথম কাজ হবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। ডাক্তার সাহেব এও বলেন, গাছের ফোঁকলে বা পাখির বাসায় আমাদের মোটেই হাত দেওয়া উচিত নয়। কারণ পাখির বাসাতে সাপ থাকার সম্ভাবনা থাকে। উপস্থিত লোকজনরা সাপে কাটা রোগীর বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারে। তারা এজন্য ডাক্তার সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আর মজনু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল যে, সে আর কখনো পাখির নীড় থেকে ডিম চুরি করবে না।

"