বাবার ভালোবাসা

প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৯, ০০:০০

মিনহাজ উদ্দীন শরীফ

বাবা সে তো একজন মহান ব্যক্তি। বাবার তুলনা শুধু বাবা। আমি যখন ছোট্ট ছিলাম। তখন বাবা প্রবাসে চলে গিয়েছিল। সংসারের অভাব দূর করতে। কারণ প্রবাসে নাকি ভালো উপার্জন করা যায় এ জন্য। আমাকে পড়ালেখা করিয়ে সুশিক্ষিত করার দায়িত্ব শহিদুল চাচ্চুকে বাবা দিয়ে গেছেন। আস্তে আস্তে সংসারের অভাব দূর হতে লাগল। কিন্তু বাবার স্নেহ-ভালোবাসার অভাব ঠিকই রয়ে গেল আমার মধ্যে। চাচ্চু যদিও আমাকে নিজের ছেলের মতো লালন-পালন করেছেন। তবুও হৃৎপিন্ডে বাবার হাহাকার রয়ে গেছে। বাবা ওই ভিনদেশ থেকে এক সাপ্তাহ পর আবার কখনো এক মাস পর চাচ্চুর কাছে পধষষ দিয়ে আমার খবরাখবর নেয়। আমিও মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গে কথা বলি। এক দিন চাচ্চুকে না বলে আমি পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে জলসুখা গ্রামের বিখ্যাত ফুটবল মাঠে খেলতে যাই। সেখানে খেলা চলাকালীন সময় বিপক্ষ দলের একজনের সঙ্গে ঘর্ষণ লেগে আমি মাটিতে থুবড়ে পড়ে যাই। প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছি। নিজে নিজে দাঁড়ানো শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তাই বন্ধুরা ভয় পেয়ে দৌড়াদৌড়ি করে বাজারের একজন গ্রাম্য ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে আসে। তারপর কেউ একজন চাচ্চুকে খবর দিল। চাচ্চু শুনেই পাগলের মতো হন্য হয়ে ছুটে এলো আমার কাছে। এসেই মিনহাজ; মিনহাজ করে ডাকছে। আমি চাচ্চুকে ভয় পেয়ে ডাকে সাড়া দিতে নারাজ ছিলাম। চাচ্চু ডাক্তারের চেম্বারে এসে আমাকে বিছানায় দেখে কেঁদে কেঁদে বলছেন। আমার চান আব্বার কী হয়েছে ডাক্তার সাহেব? তখন ডাক্তার কাকা চাচ্চুকে বলল, একটু অপেক্ষা করেন ভাই, আমি দেখছি কী হয়েছে। ডাক্তার কাকা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চাচ্চুকে জানাল আমার পায়ের একটা হাড় ভেঙে গেছে। আমি এতটা গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু চাচ্চু আমার পায়ের হাড় ভেঙে গেছে শুনে ছোট্ট শিশুর মতো কাঁদছে। ডাক্তার কাকা চাচ্চুকে পরামর্শ দিলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে ঢাকা নিয়ে ভালো ডাক্তার ধারা চিকিৎসা করাতে। এদিকে চাচ্চু ভাবছেন বাবাকে কী করে এই ঘটনা জানাবেন। আমি চাচ্চুকে সান্ত¡না দেওয়ার জন্য বলেছি, চাচ্চু দেখো আমার কিছু হয়নি। ডাক্তার কাকা হয়তো আপনাকে মিথ্যা বলেছেন। চাচ্চু আমার কাছে এসে গালে দুটো থাপ্পড় মেরে দেন। আর বলছেন চুপ কর বাপ। আমি আর পারছি না তোর কষ্ট সহ্য করতে। এই বলে বুকে জড়িয়ে চুমু দিতে লাগল আমার দুগালে। আমিও কেঁদে কেঁদে চাচ্চুকে দুই পেশি দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। এভাবে কোনো দিন চাচ্চুকে ধরিনি আর ধরবইবা কী করে, কোনো দিন তো এমন সুযোগ আসেনি। চাচ্চু আমাকে বললেন, আব্বা এখানে লক্ষ্মী ছেলের মতো চুপি করে বসে থাকো। আমি তোর জন্য আপেল ও কলা আনতে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর এলো পলিথিনের দুটা ব্যাগ কলা ও আপেলে ভর্তি করে।

বন্ধুরা ও আমার চিন্তায় অস্থির। তারা ও সবাই বলছে দোস্ত চিন্তা করিস না, তুই ঠিক হয়ে যাবি। আমরা আছি তোর পাশে। ওদের কথাবার্তা শুনে আমার সব ব্যথা এমনিতেই দূর হয়ে গেল। এই ফাঁকে চাচ্চু একটা রিকশা ভাড়া করে আনলেন আমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে। চাচ্চু আর বন্ধুরা ধরাধরি করে রিকশায় তুলে দিলেন। বন্ধুরা এক এক করে বিদায় নিয়ে প্রত্যেকের বাড়িতে চলে গেল। চাচ্চু আমাকে জড়িয়ে ধরে বাড়িতে নিয়ে এলেন। কোলে করে বিছানায় নিয়ে রাখলেন। কেঁদে কেঁদে বলছেন, এখন আমি তোর বাবাকে কি জবাব দেব। মাও জানে না আমার এই অবস্থা। মা রান্না ঘর থেকে এসে বলেছেন, কিরে এখনই বিছানায় শুয়ে আছিস যে? তোর তো আবার গা লাগে না দিনের বেলায় বিছানায়। আজ এত আগেই বিছানায় দখল করেছিস কেন? আমি কিছু বলার আগে চাচ্চু মাকে সব বলে দিলেন। মা শুনেই কেঁদে বলছেন, এখন কী হবে ভাইজান। আমি বললাম, মা তেমন কোনো কিছু হয়নি। সামান্য একটু লেগেছে, দুদিন পর আমি ঠিক হয়ে যাব, এত চিন্তা করো না তো তোমরা। মায়ের মন কি আর কোনো কিছুতে বুঝে। এভাবে দিনটা কেটে গেল। কিন্তু রাতে আমার পায়ের ব্যথায় গায়ে একটু জ্বর উঠে গেছে, অসহ্য যন্ত্রণায় আমি কাতর। আমার এই অবস্থা দেখে চাচ্চু আর মা কী করবে ভেবে পাচ্ছেন না। কোনোভাবে রাতটুকু কেটে গেল। ভোর সকালে চাচ্চু বের হয়ে গেছেন ভালো ডাক্তারের খোঁজে গ্রামে গ্রামে। সবাই দেখে দেখে বলে এখানে এই চিকিৎসা হবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকা নিয়ে চলেন। কিন্তু আমাকে ঢাকা নিয়ে যেতে তো অনেক টাকা লাগবে আর এত টাকা মায়ের কাছে বা চাচ্চুরও কাছে নেই। আর বাবা ও এই মাসে কোনো টাকা পাঠাননি। তাই আমি ঢাকা যেতে ইচ্ছুক না। হঠাৎ বাবার পধষষ এসেছে চাচ্চু রিসিভ করেন। চাচ্চু বাবার সঙ্গে কুশলবিনিময় করছেন। প্রতিবারের মতো এবারও বাবা চাচ্চুর কাছে আমার খবরাখবর নিচ্ছেন। চাচ্চু কোনো উপায় না পেয়ে আমার পায়ের হাড় ভাঙার কথা বলে দিলেন। বাবা শুনে স্তব্ধ কাতর সুরে চাচ্চুকে বললেন, আমি আগামীকাল দেশে আসছি ভাইজান।

বাবা রাতে রাতে সব ব্যবস্থা করে পরদিন বিকেল ৫টায় দেশে এলেন। এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বাবা নোহা গাড়ি করে গ্রামের বাড়ি চলে এলেন। বাড়িতে এসেই বাবা আমাকে খুঁজতে লাগলেন। আর মিনহাজ মিনহাজ ডেকে বলছেন, দেখো আমি চলে এসেছি। তোর জন্য কতো খেলনা আর চকলেট নিয়ে এসেছি। আয় বাবা আমার কাছে। পায়ে ব্যথা বলে বাবার কাছে উঠে যেতে পারিনি। বাবা নিজেই আমার রুমে এসে প্রবেশ করেন। তখন বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলাম, আব্বু আমার খুব ব্যথা করছে। আপনি আমাকে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলেন। বাবা বললেন, চিন্তা করিস না খোকা, আমি তো তোর কাছে চলে এসেছি। বড় ডাক্তার দেখানো হবে। বাবা এসেছেন, তাই আজকে হরেক রকম খাবারের আইটেম করা হয়েছে। রাতে বাবা, আমি, চাচ্চু এখন সঙ্গে অনেক দিন পর খেতে বসলাম। মা খাবার পরিবেশন করছেন। আমাদের খাওয়া শেষ। মা খেতে বসলেন। আর এই ফাঁকে বাবা আমার চকলেট আর খেলার জিনিস বের করে দিচ্ছেন। আমি এক এক করে সব খেলনা ও চকলেট হাতিয়ে দেখলাম। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, টুম্পার জন্য কি এনেছেন? বাবা বললেন, কিরে মিনহাজ এই টুম্পাটা কে? আমি বলি, বাবা টুম্পাকেও আপনি ভুলে গেছেন। তারপর বললাম, শহিদুল চাচ্চুর মেয়ে। বাবা বললেন, ও টুম্পা। আমার মামণির জন্য অনেক কিছু এনেছি, তোর চেয়েও বেশি। এসব আলোচনা করতে করতে রাত ১২টা হয়ে গেল। বাবা বললেন, আয় এখন ঘুমাই, আগামীকাল ঢাকা যেতে হবে তোর চিকিৎসা করাতে। তারপর বাবাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল পাখিদের ডাকে। ফ্রেশ হয়ে হালকা নাশতা মুখে দিয়ে আমি, বাবা, চাচ্চু রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে। ভোর ৭টা ৩০ মিনিটে।

বাবার এক কাছের বন্ধু এমবিবিএস ডাক্তার তার কাছে আমরা যাব, তাই বাবা আগেই পধষষ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। তারপর সরাসরি তার চেম্বারে আমরা যাই। তিনি বাবাকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। আর আমাকে দেখে তো আরো খুশি। আঙ্কেল আমাকে বললেন, কেমন আছো কবি সাহেব? আমি লজ্জায় কোনো কথা বললাম না। কারণ কবি বললে আমাকে আমি লজ্জাবোধ করি। তারপর যে কাজের জন্য এলাম বাবা ডাক্তার চাচ্চুকে বললেন। ডাক্তার চাচ্চু আমাকে দেখে তিনি বিশ্বাস করছেন না যে আমার পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। ডাক্তার চাচ্চু আব্বুকে প্রশ্ন করলেন, দোস্ত মিনহাজের যে পায়ের হাড় ভেঙেছে কে বলল? আব্বু বললেন, আমি জানি না! ভাইজান জানেন। তারপর ডাক্তার আঙ্কেল চাচ্চুকে জিজ্ঞাস করলেন। মিনহাজের যে পায়ের হাড় ভেঙে গেছে কে বলেছে? চাচ্চু বলেন, গ্রামের একজন গ্রাম্য ডাক্তার। ডাক্তার চাচ্চু বললেন, আচ্ছা আমিও এক্স-রে করে দেখছি আসলে কী হয়েছে। এই বলে আমাকে এক্স-রে রুমে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার চাচ্চু রিপোর্ট দিলেন বাবাকে, আমার তেমন কোনো কিছু হয়নি। একটু আঘাত লাগছে, এটা কয়েক দিন পর এমনিতেই সেড়ে যেত। আমি আর শহিদুল চাচ্চু আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। আমি চাচ্চুকে বললাম, দেখলেন চাচ্চু আগেই বলেছিলাম তো আমার তেমন কিছু হয়নি। বাবা মাকে কল করে জানিয়ে দিয়েছেন। মাও খুব খুশি। আহা! আমরা সবাই মিলে ফাইভস্টার হোটেলে খঁহপয করতে গেলাম। খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ জবংঃ নিয়ে। বাবা; চাচ্চু; আমি ডাক্তার চাচ্চুকে বিদায় দিয়ে গ্রামে আবার চলে আসলাম। বাবা ও চাচ্চুর সঙ্গে খেলাধুলা করে এখন আমার প্রতিনিয়ত সময় কাটে। আমি আর খেলতে মাঠে যাই না। বাবার সঙ্গে, না হয় চাচ্চুর ও টুম্পার সঙ্গে খেলা করি। বাবাকে কাছে পেয়ে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ আমার হাতের কাছে। বাবা ও চাচ্চু আমাকে খুব স্নেহ ও ভালোবাসেন। আমিও আমার বাবা এবং চাচ্চুকে খুব ভালোবাসি।

 

 

"