পাখি

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৯, ০০:০০

শাহেদ হোসেন

বছর ঘুরে আবার গরমের ছুটি ফিরে এসেছে স্কুলের ছুটির ক্যালেন্ডারে। গরমের ছুটির আলাদা একটা নাম আছে ছাত্রছাত্রীদের কাছে। এ ছুটিকে অনেকেই বলে আম-কাঁঠালের ছুটি।

এবারের গরমের ছুটিতে তরু মায়ের সঙ্গে নানু বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। বাবা আসতে পারেননি। অফিসে তো আর গরমের ছুটি থাকে না। থাকলে মজা হতো। বাবাও আসতে পারতেন তরুর সাথে। এমনিতেই এবার তারা এসেছে বছর দুয়েক পরে। তাই তরুর মধ্যে গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। গ্রামের সবখানেই যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে পাকা আম কাঁঠালের মিষ্টি গন্ধ। গাছে গাছে লেগে গেছে উৎসবের আমেজ। ঝোড়ো বাতাস হলেই গাছ থেকে আম পড়ছে টপাটপ, আর সেই আম কুড়াতে গ্রামের ছেলেমেয়েদের ভিতর সে কী প্রতিযোগিতা !

তরুর ভালোই লাগছে। সে আম কুড়াতে না গেলেও তার জন্য কেউ না কেউ ঠিকই আম কুড়িয়ে আনছে। তরু নানুর সঙ্গে সম্পূর্ণ গ্রাম ঘুরে দেখতে বের হলো বিকালে। ফসলের মাঠ, পুকুর, বটগাছ, গ্রামীণ বাজার, বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু নদী সব দেখল। সবকিছুই তার কাছে দারুণ লাগল। বিশেষ করে নদীটিকে। এ নদীর নাম করতোয়া। একসময় এ নদীতে নাকি লঞ্চ চলত। নানুর এ কথা শুনে তরুর খুব হাসতে ইচ্ছে হচ্ছিল। এই মরা নদীতে লঞ্চ চলত তার বিশ্বাস হয়নি। তবে নদীটির জন্য তার খুব মায়া হচ্ছিল। নদীর ধারে মাঠের ভেতর একটি বিশাল বটগাছ চোখে পড়ল তরুর। বিশাল মানে বিশালই। এই বটগাছে অনেকগুলো পাখি একসঙ্গে বসে আছে, কেউ আবার উড়ছে, গাইছে আবার একে অপরের সঙ্গে ঝগড়াও করছে।

নানু বলল, এই বটগাছটা অনেক প্রাচীন। আর গাছটা হলো পাখিদের ঘর। আপন ঠিকানা। তরুর খুব আফসোস হলো। এ রকম একটা বটগাছ আর পাখিগুলো যদি তাদের শহরেও থাকত। খুব ভালো হতো। বিকালটা শেষ হয়ে আসছিল। তরু এবং তার নানু বাড়ির দিকে পা বাড়াল। কিছুটা দূরে তরু কয়েকজন মানুষকে খাঁচা নিয়ে বসে থাকতে দেখল।

তরু নানুকে বলল, এই মানুষগুলো খাঁচা নিয়ে বসে আছে কেন নানু? এরা পাখি শিকারি। পাখি ধরে খাঁচায় করে এরা শহরে নিয়ে যায়। বিক্রি করে। এটাই এদের পেশা। তারপর পাখিগুলোর কী হয় নানু? তরুর মধ্যে একধরনের কৌতূহল কাজ করে।

শহরের মানুষরা পাখি কিনে খাঁচায় আটকে রেখে পোষে। আবার কেউ কেউ পাখির মাংস খেতেও পছন্দ করে। আঁতকে ওঠে তরু। তার বিশ্বাস হয় না। পাখিকে কেন খাঁচায় বন্দি করতে হবে, মাংস খেতে হবে। মানুষের কি দয়ামায়া বলে কিছু নেই। পাখি উড়বে আকাশে। বিলে, নদীতে, গাছে মুক্তভাবে বিচরণ করবে পাখি। পাখি আমাদের বন্ধু। আর আমরা পাখির এক নম্বর শত্রু।

তরুর মনটা কষ্টে ভরে গেল। নিরীহ পাখির যে শত্রু থাকতে পারে তার জানা ছিল না। ঘরে ফিরে এসে তরু মাকে সব বলল। পাখি শিকারিদের লোভী মুখগুলো তার চোখে ভাসছিল। তাদের কথা মাকে বলল তরু। মা বলল বাবাকে সবকিছু খুলে বলতে।

তরু বাবাকে ফোন করে ঘটনাটা বলল। বাবা তাকে মন খারাপ করতে নিষেধ করলেন। বাবা বললেন নিকটস্থ থানায় পুলিশকে বিষয়টা জানাতে হবে। তা হলে তারাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা

গ্রহণ করবে।

তরু বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে নানুর কাছে গেল। নানুর কাছে থেকে নিকটস্থ থানার ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করল থানায়।

ওপাশ থেকে কেউ একজন ফোন রিসিভ করে বলল, আমি রহমতপুর থানার ওসি বলছি।

দয়াকরে আপনার পরিচয় দিয়ে কথা বলুন স্যার।

তরু তার পরিচয় দিয়ে পাখি শিকারিদের কথা ওসি সাহেবকে বলল।

ওসি সাহেব তরুকে আশ্বস্ত করে। জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবেন বলে কথা দিলেন।

তরু ওসি সাহেবকে ধন্যবাদ দিল।

কথা শেষ করার পরেও তরুর খুব চিন্তা হচ্ছিল। খুব মায়া লাগছিল পাখিগুলোর জন্য। পাখিদের কথা ভাবতে ভাবতেই তরু একসময় ঘুমিয়ে গেল। পরদিন দুপুরবেলা নানুর সঙ্গে কিছু অপরিচিত মানুষ আর পুলিশ বাড়িতে এসে উপস্থিত। মানুষগুলোর গলায় ক্যামের ঝোলানো। নানুবাড়ির সবাইকে ডেকে বললেন, শহর থেকে সাংবাদিক এসেছে, থানা থেকে পুলিশ এসেছে আমার নানুভাইকে ধন্যবাদ দিতে। পাখি শিকারিদের পুলিশ ধরে ফেলেছে। তাদের কাছে থেকে অনেকগুলো পাখি জব্দ করে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। সাংবাদিকরা আমার তরু নানুভাইয়ের ছবি তুলবে। সেই ছবি কাল সারা দেশের মানুষ দেখবে।

তরুকে সবাই ধন্যবাদ দিল। ওসি সাহেব তরুকে কোলে নিলেন। একসঙ্গে ছবি তুললেন। তরুর সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য উপস্থিতি সবাই প্রশংসা করে চলে গেল। তরুর মনে হলো, সবাই পাখির শত্রু নয়। কেউ কেউ বন্ধুও হতে পারে।

এক দৌড়ে তরুর বটগাছটার কাছে যেতে ইচ্ছে হলো। পাখিদের কথা ভাবতেই তরুর খুশিতে মনটা ভরে উঠল। পাখিগুলো নীল আকাশে উড়ে বেড়াবে। ক্লান্ত হলে আবার এসে বটগাছটায় বসবে। যেখানে কোনো দুষ্টু শিকারি লুকিয়ে লুকিয়ে পাখিদের ধরার জন্য ফন্দি করবে না। পাখিগুলো মুক্ত ও স্বাধীনভাবেই উড়ে বেড়াবে নীল আকাশে।

তরুর এসব ভাবতেই খুব ভালো লাগল।

ভালো লাগল মুক্ত আকাশে পাখিদের

উড়তে দেখে।

 

"