পিঁপড়া বিজ্ঞানী জেলিন

প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০

মো. শামীম মিয়া

পিঁপড়ারা সারা বছর নিজেদের খাদ্য জোগাড় করে থাকে। কিন্তু ১৮০১ সালে আমদিরপাড়া রাজ্যের এক পিঁপড়া কলোনিতে নেমে আসে অসাধু কিছু ভয়ংকর বড় ধরনের পোকা। তারা হলো ঘাস পোকা। ঘাস পোকারা পিঁপড়াদের ওপর খুব নির্যাতন চালায়। একসময় পিঁপড়াদের কিছু শিশু পিঁপড়া, তরুণ-তরুণী এবং কয়েকজন বয়স্ক পিঁপড়া মারা যায়। পিঁপড়াদের রাজা-রানি প্রাণে বেঁচে যায়, তবে একটা শর্ত মেনে। শর্তটা হলো : প্রতি বছর ঘাস পোকাদের এক দেড় কেজি করে খাদ্য জোগাড় করে দিতে হবে। যদি না দেয় ১৮০১ সালের মতো নির্যাতন, খুন শুরু হবে তাদের ওপর। এই শর্ত এবং কথাগুলো বলল ঘাস পোকাদের গডফাদার কংকর। পিঁপড়াদের রাজা-রানি মেনে নেয় ঘাস পোকাদের শত এবং প্রতি বছরই এক-দেড় কেজি করে খাদ্য দিয়ে আসছে ঘাস পোকাদের পিঁপড়ারা। ছয় মাস পর পর এসে খায়-দায় চলে যায় ঘাস পোকারা। এভাবে চলে যায় বেশকটা বছর। ১৮০৯ সালের ঘটনা : ইতোমধ্যেই এই পিঁপড়া কলোনিতে জন্ম নেয় বিজ্ঞানী গবেষক ছোট্ট পিঁপড়া জেনিল। জেনিল অন্যদের মতো খাদ্য কুড়ায় না, সে নিজের আবিষ্কারের যন্ত্র দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করবে। জেনিলের যন্ত্রগুলো কাজ করলেও বা দেখার মতো হলেও জেনিল তবু দাম পায় না। তবুও সে খাদ্য উৎপাদন করতে পেছায়নি কখনো। সেদিন লাখ লাখ পিঁপড়া খাদ্য সংগ্রহ করছে। এমন সময় একটা পিঁপড়া অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেখানে এসে যায় পিঁপড়াদের রানি । রানি এক পিঁপড়াকে বলল, ডাক্তারকে ডাকার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে এসে যায় ডাক্তার। রানি ডাক্তারকে বলল, এর মধ্যে আপনার চিকিৎসাধীন অবস্থায় কতজন আছে। ডাক্তার বলল, এবার প্রায় ১০০ জন হবে। রানি চিন্তায় পড়ে যায়Ñ এভাবে যদি সবাই অসুস্থ হতে থাকে তা হলে ঘাস পোকাদের খাদ্য জোগাবে তারা কীভাবে। আজ-কালের মধ্যে আসবে ঘাস পোকারা। এমন সময় জেনিল যন্ত্র দিয়ে খাদ্য উৎপাদন করছে। হঠাৎ একটা পাতা এসে পড়ে যায় রানির ঘাড়ে। রানি মাটিতে পড়ে যায়। রানিকে সবাই ধরে তুলে আনে পাতাটার নিচ থেকে, কিন্তু রাস্তায় সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। যেতে পারে না খাদ্য রাখার গুদামে। পথ সর্দার সঙ্গে সঙ্গে যেতে চায় রানির কাছে। তার পথে বাধা দেয় এক পিঁপড়াÑ সে বলল সর্দার এসব ছোটখাটো ব্যাপারে রানিকে জানানো ঠিক না। তা ছাড়া তোমার মনে নেই ১৮০০ সালে একটা ডাল পড়ে ছিল; আমরা কীভাবে তা পারি দিয়েছি। রানির কাছে না গিয়ে তুমি বুদ্ধিজীবীকে ডাকো কীভাবে পার হওয়া যায় বা যাওয়া যায় গুদামে। সর্দার বুদ্ধিজীবীকে ডাকল। তিনি এসে একটা ম্যাপ আঁকলেন এবং বললেন, এই পাতার সাইড দিয়ে যেতে। সর্দার বলল, আজ না ঘাস পোকারা খাদ্য খেয়ে যাওয়ার পর জেনিলের বিচার হবে। লাখ লাখ খাদ্য সংগ্রহকারী পিঁপড়া এলো অতিকষ্ট করে খাদ্য রাখার গুদামে। গুদামটা ছিল পাহাড়ের ওপর। সবার খাদ্য রাখা শেষ। এমন সময় বেল বেজে ওঠে। এই বেল বাজার কারণ ঘাস পোকারা আসছে। সবাই ছোটাছুটি করছে। জেনিলও তার যন্ত্র নিয়ে দৌড় দেয় গুদামের দিকে। সবাই তাদের আস্তানায়। জেনিল ডাকে, দাঁড়াও আমিও যাব। এর মধ্যে আস্তানায় যাওয়া শেষ পিঁপড়াদের। জেনিল তার যন্ত্রটা রাখতে যায় গুদামের পাশে, এমন সময় যন্ত্রটার ধাক্কায় খাদ্য রাখার গুদামের নিচ থেকে একটা পাথর সরে যায়। অমনি খাদ্যগুলো পড়তে থাকে সাগরে। জেনিল চেষ্টা করলেও রক্ষা করতে পারে না খাদ্যগুলো। জেনিল মনে করে, নাহ্ এই কথাগুলো এক্ষুনি রানিকে জানানো উচিত। সে দৌড়ে যায় রানরি কাছে। রানিকে বলতে চাইলে রানি বলে এখন কোনো কথা না পরে। জেনিল বলল, খাদ্য সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই। রানি তবুও বলে, এখন না পরে। এদিকে হাজির কংকর বাহিনী। এসেই বলল, খাদ্য কোথায়? রানি চমকে উঠল এবং জেনিলকে বলল, খাদ্য কী হয়েছে? জেনিল রানিকে সব খুলে বলতেই এসে হাজির কংকর বাহিনী। তারা এসে বলল, আমাদের সঙ্গে চালাকি। আর ক্ষমা নয়, এবার তোমাদের রক্ষা নাই। রানি বলল, দেখো কংকর আমরা ঠিক সময়ই তোমাদের খাদ্য জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু একটা দুর্ঘটনায় খাবারগুলো পানিতে পড়ে যায়। কংকর রানির মেয়ে চুমকিকে ধরল এবং বলল তুমি ঘাস পোকাদের ভয় পাও? চুমকি বলল, হ্যাঁ ভয় পাই। আমাকে ছেড়ে দাও। কংকর বলল, তোমাকে তো ছাড়া যাবে না। হ্যাঁ ছেড়ে দিতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে। কংকরের কথা শেষ না হতেই জেনিল বলল, চুমকিকে ছেড়ে দাও কংকর। কংকর বলল চুমকিকে নেবে, তা হলে কাছে এসো, নিয়ে যাও। জেনিল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কেউ ভয়ে সামনের দিকে আর এগোল না। রানি বলল, কংকর এবারের মতো তুমি ক্ষমা করে দাও। কংকর বলল, ঠিক আছে, তবে তিন মাসের মধ্যেই আমরা আসব। আর মনে রাখবে কংকর কাউকে ভয় পায় না। তখনই কংকরের এক ঘাস পোকা বলল, কংকর তুমিও ভয় পাও, তবে পাখিদের। মনে আছে তোমার ১৮০০ সালে তোমাকে একটা পাখি খেতে ধরে ছিল। প্রাণে বেঁচে গেছো। অমনি কংকর এসে ওই ঘাস পোকাকে একটা চড় মারল এবং বলল, চুপ একটা কথাও বলবি না। কংকর আবার বলল, আমরা যাচ্ছি সময়মতো আসব। রানি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ঠিক আছে। চলে যায় ঘাস পোকা ‘কংকর’ বাহিনী। পিঁপড়া কলোনিতে সবাই ক্ষিপ্ত জেনিলের ওপর। সবার এক কথা জেনিলকে বের করে দিতে হবে কলোনি থেকে। জেনিলও বলছে আমি কোনো পাপ করিনি সাহায্য করতে চেয়েছি মাত্র। হঠাৎ পিঁপড়া মন্ত্রী বলল, তুমি সাহায্য না করলে আমরা খুশি হই। হঠাৎ জেনিলের মাথায় বুদ্ধি এলো এবং বলল, হ্যাঁ আমি পেয়েছিÑ সবাই চমকে ওঠে বলল পেয়েছি মানে। জেনিল বলল, আমি শহরে যাব পৃথিবীর সব চাইতে বড় বড় পোকাদের খোঁজে, যারা ধ্বংস করতে পারবে কংকরের মতো অত্যাচারী পোকাদের। রানি বলল, না, তা কী করে হয়। জেনিল বলল, রানি আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তা হলে আমি অবশ্যই বড় বড় বীরযোদ্ধা পোকাদের আনতে পারি। রানি বলল, মন্ত্রীরা আপনারা সবাই ভাবুন। তারা এক জায়গায় হয়ে ভাবছে এটাই ভালো হবে জেনিল বাহিরে থাকলে আমরা শান্তিমতো কংকরদের খাদ্য সংগ্রহ করতে পারব। এই কথাই পাকা, বলল মন্ত্রীরা। জেনিল বেশ খুশিই হলো। বলল, আমি কালকেই যাব শহরে আর আজ আমি আপনাদের কাজে সাহায্য করব। সবাই একসঙ্গে বলল, না না না তা আর লাগবে না। তুমি কাল যাবে আজ সব গুছিয়ে নাও। জেনিলও ভাবল সত্যিই তো বলেছে। জেনিল আর কাজে গেল না তার সহযোগীদের সঙ্গে। পরদিন সকালে জেনিল মাথায় ক্যাপ, হাতে হাতঘড়ি, নতুন একটা জামা পরে এলো বাহিরে। এসে তার সহপাঠীদের বলল, আমি যাচ্ছি শহরে বড় বড় সব পোকাদের আনতে। ভালো থেকো আমার জন্য দোয়া করো। সবাই তাকিয়ে আছে জেনিলের দিকে। জেনিল একটু আড়ালে এলে সবাই করতালি দেয়। জেনিলের বুক যেন ভরে যায়। বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো এবং চললো শহরের পথে। এগোচ্ছে জেনিল এমন সময় ডাকলো জেনিকে রানির মেয়ে চুমকি। জেনিল থেমে যায় এবং বলল কী হয়েছে। চুমকির সঙ্গে এসেছে ওর বান্ধবী রজগী। রজগী বলল জেনিল জানো আমার বাবা বলেছে তুমি মারা পড়বে। জেনিল বলল তাই নাকি? রজগী বলল, হ্যাঁ। চুমকি বলল আমার বিশ্বাস জেনিল পৃথিবীর সব বড় বড় পোকাদের আনবে। জেনিল বলল চুমকি তোমার কথাই ঠিক আর আমার সম্বন্ধে রজগীর বাবার ধারণা ভুল। এই বলতেই শেষ হয় জেনিলদের কলোনির সীমানা। চিৎকার দিয়ে ওঠে রজগী বলে জেনিল এইটা তো নদী তুমি কীভাবে যাবে ওপারে মানে শহরে। এই কথা বলতেই পাড়ে থাকা একটা গাছে ওঠে জেনিল। রজগী বলল একি জেনিল তুমি গাছে! শহরে যাওয়ার পথ তো এদিকে। চুমকি বলল চুপ করো কীভাবে ওপারে যাবে সেইটা জেনিল ভালোই জানে। জেনিল গাছে উঠে একটা শুকনো পাতায় কামড় দিয়ে বাতাসে উড়ে গেলো ওপারে। চুমকি বলল, দেখেশুনে যেও। জেনিল ওপার থেকে বলল, ঠিক আছে, গুড বাই। হাঁটতে হাঁটতে জেনিল দুপর বারোটার দিকে এলো শহরে। শহরে পা রাখার আগে মনে মনে বলল, না আমাকে গ্রাম্য আচরণ করা যাবে না, শহুরে শহরের আচরণ করতে হবে। ভালোভাবে মাথাটা ঠিক করে নিয়ে চললো। জেনিল অবাক হয়ে বড় বড় পোকা দেখে। মাকড়সা, তেলাপোকা, ফুলপোকা, জোনাকি পোকা ইত্যাদি। জেনিল বলল, আসলে তো সত্যি শহরটা পোকা দিয়ে একদম ভরা। আবার ভাবলো, এসব আমার ভাবার সময় এখন নয়। একদল পোকা নাটক করছে। দশর্ক হিসেবে আছে মাছিসহ আরো অনেক ধরনের পোকা। হঠাৎ এক মাছি নাটকের একজনকে মেয়ে ভেবে বলল, এই সুন্দরী এদিকে একটু আসো কথা আছে। এই সুন্দরী পোকার নাম বেসিন। বেসিন রাগে আগুন হয়ে এলো মাছিদের কাছে।

এসেই বলল, আমি দেখতে মেয়ে হলেও আমি একজন ছেলে। কথাবার্তা সাবধানে বলবে? এক দুই কথায় বড় ঝগড়া বাধে। ঝগড়া দেখে এগিয়ে আসে লাঠিপোকা; এসে ঝগড়াটা মীমাংসা করে দিলো। মাছিগুলো বলল, আমরা আবার আসব এর বিচার করার জন্য। এই বলে উড়ে যায় মাছির দল। নাটকের শো শেষ। দলে দলে দর্শক পোকা বের হচ্ছেÑ এমন সময় জেনিল এলো সেখানে; এসে দেখলো হাজার হাজার পোকামাকড় বের হচ্ছে। অবাক হয়ে গেলো জেনিল, কারণ এত বড় বড় পোকার কাছে কংকর কোনো কিছুই নয়। ভাবছে জেনিল। আবার বলল, আমি তো এই সব পোকার কাছে একটা ধুলার কণার মতো। আবার ভাবলো, এই সব পরে ভাবা যাবে। এখন দেখি ওরা আমার কথায় রাজি হয় কিনা? জেনিল এগোতেই আবার এলো মাছির দল। আবার গেলো বেসিনের কাছে। গিয়ে বলল, এই তুই মঞ্চে আমাদের অনেক বকাবকি করেছিস, এখন তোকে তার ফল দেওয়ার জন্য এসেছি। বেসিনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছে, এমন সময় লাঠিপোকা তার সহপাঠীদের বলল, আমাকে তোমরা লাঠি হিসেবে ব্যবহার করবে ওরা ভয় পেয়ে চলে যাবে। এমন সময় প্রজাপতি বলে উঠলো এই শুয়ো পোকার দল। আমরা বীর যোদ্ধা পোকার দল আমাদের সঙ্গে লড়তে এসেছিস? জেনিল কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তবে মনে মনে বলল, হ্যাঁ আমি সঠিক জায়গায় এসেছি। লাঠিপোকাকে লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেয় মাছির দলকে। জেনিল চিৎকার দিয়ে বলল, হে বীর যোদ্ধা পোকার দল আমি তোমাদেরই খুঁজছি? নাটকের অভিনেতা সদস্যরা চমকে উঠলো। কারণ তাদের বীর যোদ্ধা বলেছে। জেনিল তাদের কিছু বলার সময় দিলো না। বলল হে বীর যোদ্ধা পোকারা আমি তোমাদের সাহায্য চাই; আমি এসেছি সে আমদির পাড়া রাজ্যের অজানাপুর থেকে। রানি আমাকে পাঠিয়েছে। জেনিল পোকাদের পা ধরে বলল, আপনাদের আমাদের কলোনিতে যেতেই হবে। নইলে আমরা ঘাস পোকা কংকর বাহিনীর হাতে মারা যাবো। তাদের মধ্যে গুটিপোকা বলল, ঠিক আছে আমরা যাবো শুধু তোমার কথায়। জেনিল খুশি হয়ে বলল, সত্যি বলছো তোমরা। এবং আমি যেতে যেতে সব বলবো। জেনিল খুব খুশি এবং তারা সঙ্গে সঙ্গে উড়াল দিলো পিঁপড়া কলোনিতে। আসতে আসতে জেনিল সব বলল। জেনিল আর গুটিপোকা ছিল মোটা পোকার ঘাড়ে। গুটিপোকা আরেক গুটিপোকাকে বলল, কিছু বুঝলে? আরেক গুটিপোকা মাথা নাড়িয়ে বললÑ না। জেনিল বললÑ এসে গেছি আমার মাতৃভূমি আমদির পাড়া রাজ্যের অজানাপুর। ঘাসপোকাদের মতো উড়ে এসেছে ওরা। তাই ভয়ে ছোটাছুটি শুরু করছে পিঁপড়ারা। রানির মেয়ে চুমকি টের পেলো জেনিল এসেছে। চুমকি ডাকলো জেনিল। জেনিল প্রথমবারেই টের পেলো চুমকি ডাকছে। জেনিল বলল, চুমকি আমি এসেছি ফিরে। এসে পা রাখলো পিঁপড়া কলোনিতে। মাটিতে নেমেই বলল, রানি আপনি কোথায়? আমি এসেছি আপনি আসেন আমাদের কাছে। আমি শহর থেকে বড় বড় বীর যোদ্ধাদের এনেছি। আসুন আপনারা সবাই। সব পিঁপড়া জেনিল এবং অতিথি পোকাদের করতালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো। রানিকে কয়েকজন পিঁপড়া মন্ত্রী বলল, রানি এখন কী করবেন? রানি বলল, আমি ভেবে পাচ্ছি না, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! এক মন্ত্রী বলল, আমরা কংকর বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করবো। আমাদের দাদা বাবারা যেমন করে জয় এনেছিল আমাদের এই মাতৃভূমিকে। রানি বলল, তোমাদের রাজা সাহেব তো অসুস্থ আমি তার কাছ থেকে শুনে আসি তিনি কী বলেন। রানি উড়ে গেলো রাজার কাছে। গিয়ে বলল, সব খুলে। রাজা বলল, জেনিল কাজের মতো একটা কাজ করেছে। সবাইকে বলো, তৈরি হতে যুদ্ধ করার জন্য। রানি এসে সবাইকে বলল, যুদ্ধের জন্য তৈরি হও। জেনিল দৌড়ে এলো রানির কাছে, কারণ দূর থেকে কিছুই কোনো যায় না। তাই জেনিল একটা পাতা মুড়িয়ে মাইক বানিয়ে দিলো। রানি বলল, সত্যি জেনিল তোমার বুদ্ধির তুলনা হয় না। জেনিল মনে মনে বলল, এত দিনে বুঝলেন আসলে আমি কী? মাইকে রানি বক্তব্য দিতেই এক সুন্দরী প্রজাপতি ফিসফিস করে বলল, লাঠিপোকাকে যুদ্ধ করতে হবে! যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের প্রাণও তো যেতে পারে। এর মধ্যে জেনিল মাইকে বলল, আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর সকল ছাত্রছাত্রী মিলে মুক্তিযুদ্ধের একটা নাটকে এখন অভিনয় করবে। এই নাটকের জন্য একটা ছবিও এঁকেছেন, আমাদের প্রাণপ্রিয় রানির ছোট মেয়ে চুমকি। এতে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা পোকাদের মধ্যে থেকে একজন অর্থাৎ গুটিপোকাকে মৃত দেখানো হয়েছে। এই কথা শুনে গুটিপোকা লাঠিপোকাকে বলল, চলো ভাই আর এক মিনিট এখানে নাই।

নইলে আমি এখনি মারা যাবো বাস্তবে। নাটকের অভিনয়ের মতো না। এই কথা শুনে এক পিঁপড়া এসে জেনিলকে বলে, এরা তো নাটক করে। এরা বীরযোদ্ধা না। জেনিল বলল, নাটক করে মানে? এই বলে তাদের কাছে আসতেই দেখে তারা চলে যাচ্ছে। রানি বলল, জেনিল কোনো সমস্যা নাকি? জেনিল বলল, না রানি তারা মনে করছে নাটক না দেখে যুদ্ধ বিষয়ে আলোচনা করলে ভালো হয়, আমি আসছি রানি। জেনিল পিছে পিছে দৌড় এবং ডাকছে দাঁড়াও বন্ধুরা এমন সময় থেমে যায় পোকাগুলো। জেনিল গিয়ে বলল, গুটিপোকাকে তোমরা যাওয়ার আগে আমাকে মেরে ফেলে যাও। গুটিপোকা বলল না আমরা নাটকে অভিনয় করি কোনো যোদ্ধা না। জেনিল বলল, না আমি মানি না। যুদ্ধ করতেই হবে তোমাদের তখন লাঠিপোকা এসে জেনিলকে একটা চড় মেরে বলল, যাও। আমরা যেতে পারবো না। পোকাগুলো উড়ে যেতে চাইলে জেনিল লেজ টেনে ধরে। জেনিলও উড়ে যায় ওদের সঙ্গে। গুটিপোকা লাঠিপোকাকে বলল, জেনিলকে টেনে মাটিতে ফেলে দিতে। টানছে লাঠিপোকা হঠাৎ জেনিল বললÑ বন্ধু পাখি। এই বলে জেনিল দৌড় দিলো পাথরের কোনোয়। লাঠিপোকা বলল, জেনিল এতো তাড়াতাড়ি দৌড়তে পারে। এর মধ্যে পাখির কণ্ঠ শুনতে পায় লাঠিপোকা এবং সবাই দৌড় পাথরের দিকে। রানিসহ সব পিঁপড়া নদীর এপারে। আর ওরা ওপারে। সবাই পাথরের নিচে। কিছু দেখা যাচ্ছে না। রানির মেয়ে চুমকি জেনিলের বানানো একটা যন্ত্র আনলো তা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তারা প্রাণে বেঁচে যায় পাখির হাত থেকে। এতে খুশি হয় পিঁপড়া কলোনির সব পিঁপড়া। এবং করতালি দেয়। লাঠিপোকা বলল, জেনিল এটা কিসের আওয়াজ শুনা যায়। জেনিল বলল, আমরা বেঁচে যাওয়ার জন্য কলোনির সবাই করতালি দিচ্ছে। সবাই খুশি হয়েছে। লাঠিপোকা বলল, না এখান থেকে যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের এই কলোনির সব পিপড়া নির্বোধ ভাববে। সবাই বলল, হ্যাঁ। আমরা রাজি এই যুদ্ধ করবো আমরা মুক্ত করবো পিঁপড়া কলোনি। আমরা আমাদের আরো বন্ধুদের ডাকবো। তারাও আসবে। আমাদের ডাকে আসবে পৃথিবীর সব বড় পোকা। অসহায় ছোট্ট পোকা পিঁপড়াদের ওপর আর নয় নির্যাতন। জেনিল বলল, বন্ধুরা তাহলে চলো, এখন ওপারে যাওয়া যাক। লাঠিপোকা বলল, ঠিক আছে, চলো সবাই এলো আবারো এপারে। এসে রানির কাছে তাদের পরিচয় বলল। রানি বলল, তোমরা পারবে তো আমাদের মুক্ত করে দিতে ওই সব ঘাসপোকাদের হাত থেকে? লাঠিপোকা বলল, হ্যাঁ পারবো তবে আমরা তো মূর্খ না। আগে বসবো ওদের সঙ্গে বুঝাবো ওদের যদি না মানে তা হলে ডাইরেক্ট একশন হবে। সবাই আবার চিৎকার দিয়ে বলল, হ্যাঁ ডাইরেক্ট একশন হবে। রানিকে লাঠিপোকা বলল, এর সব অবদান আজ জেনিলের। জেনিলের যন্ত্রপাতি দিয়ে সব ঘাসপোকাদের শেষ করা যাবে। আর আমি আমাদের মধ্যে একটা পোকাকে পাঠাবো আমাদের সঙ্গীদের আনতে। আজকেই যাবে আমাদের বন্ধু গুটিপোকা ওদের আনার জন্য। ঘাসপোকারা আসবে কবে? রানি বলল, কাল আসার কথা আছে মানে আসবেই। লাঠিপোকা বলল, ঠিক আছে। রাতেই চলে এলো গুটিপোকার সঙ্গীরা। চারদিক আনন্দ গান নাচ ইত্যাদি হচ্ছে। লাঠিপোকা সব পোকাদের সব বলল, কিভাবে তাদের সঙ্গে লড়বে। কাল সকালে ঘাসপোকারা আসবে কিন্তু খেতে না মরতে যদি না মানে লাঠিপোকাদের কথা। ঠিক এগারোটার দিকে এলো ঘাসপোকা কংকংর বাহিনী। এসে প্রথম বারের মতো বলল আবারোÑ আমাদের খাদ্য কই। রানি আবারও আমাদের ফাঁকি দিয়েছে। এবার আর বাঁচতে পারবে না রানি আমাদের হাত থেকে। লাঠিপোকারা সবাই আড়ালে লুকিয়ে আছে। এমন সময় লাঠিপোকারা সবাই এসে যায় কংকংর বাহিনীর সামনে। কংকংর লাঠিপোকাকে দেখে বলল, তোমরা এখানে কেন। লাঠিপোকা বলল, এই আপনি করে বল। থাপড়ায়া গাল ফাটিয়ে ভেলাবো নইলে। মাথা নিচু করে থাকলো কংকংর। কংকংর বলল, আপনারা শেষ পর্যন্ত মাটি চাষাদের পক্ষে হলেন। এই ছোট্ট পোকাদের পক্ষে হলেন। এর মধ্যেই এলো লাখ লাখ পিপড়া মিছিল করতে করতে আর নয় ভয়, পিঁপড়া কলোনি করবো জয়। কংকংরের কলিজা যেন শুকিয়ে গেলো। ঐ যে একটা ঘাসপোকা যে গতবার বলেছিল কংকংরকে পাখি খেতে চেয়েছিল। সেই ঘাসপোকা বললÑ লাঠি ভাই আমি আগেই বলেছিলাম আসো কংকর আমরা নিজেদের খাদ্য নিজেরাই সংগ্রহ করি। কিন্তু কংকর আমার কোনো কথাই শোনে না। লাঠিপোকা বললÑ কংকর তোমরা মরতে চাও, না বাঁচতে চাও। কংকর বললÑ আমরা বাঁচতে চাই। লাঠিপোকা বলল, তাহলে একটা পথ ফাঁকা আছে যদি রানি চায় তাহলে বাঁচতে পারো। কংকর রানির পায়ে পরে গিয়ে বলল, রানি আমাকে মাফ করে দাও আমরা আর কোনোদিন আসবো না, তোমাদের কলোনিতে। রানি বললÑ আমি জানি না। জেনিল যদি চায় তাহলে মাফ পেতে পারো। কংকর জেনিলের কাছে গিয়ে বলল, আমাদের মাফ করে দাও জেনিল। জেনিল বলল, শোনো কংকর আমরা ছোট্ট হলেও অনেক বড় কাজ আমরা করতে পারি। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই শোনো। আমাদের দেখলে হাতি ভয় পায়। সেই কথা তো জানোই। কংকর বলল, আর লজ্জা দিও না ভাই আমাদের ক্ষমা করে দাও। আমরা চলে যাবো এই কলোনি ছেড়ে বহু দূরে। আর কোনো দিন আসবো না। লাঠিপোকা বললÑ তোমাদের একটা কাজ করতে হবে। কংকর বলল, কি কাজ? লাঠিপোকা বলল, এত বছর যতো খাদ্য নিয়েছো তা শোধ করে দিতে হবে। রানি বলল, তা আর লাগবে না। কংকংরসহ ওদের সবাইকে লাখ লাখ পিঁপড়াদের মধ্যে কান ধরে একশ বার বসতে হবে এবং উঠতে হবে। কংকর বললÑ ঠিক আছে তাই হবে। তারা সবাই কান ধরে উঠবস করলো। জেনিল রানি রাজা পিপড়া সবাই ঘাসপোকাদের ক্ষমা করে দিলো। এবং উড়ে গেলো ঘাসপোকারা। লাঠিপোকারাও বিদায় নিলো রানি এবং জেনিলের কাছ থেকে। রানি ঠিক করলো, জেনিলের সঙ্গে তার মেয়ে চুমকির বিয়ে দিবে। বিয়ে দিয়েই দিলো। পিঁপড়া কলোনি মুক্ত হলো। সুখে সবাই বসবাস করতে লাগলো।

 

"