ইঁদুরের প্রতিশোধ

প্রকাশ | ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

বনের একপ্রান্তে উঁচু একটা স্থানে একটা সিংহের গুহা ছিল। গুহাটি বেশ পরিপাটি ও সুরক্ষিত। এর পেছনের দিকে একটা সুন্দর নদী ছিল। আর একটু দূরেই ছিল সবুজ মাঠ। গুহার চারদিকটা বেশ ফাঁকা। খুব শখ করে সিংহ এ গুহা নির্মাণ করেছিল। গুহার আশপাশে কোনো পশুপাখি আসার সাহস পেত না বললেই চলে। কিন্তু মাঠের ইঁদুরগুলো ছিল বেশ সাহসী। তারা গুহার আশপাশেই থাকত। সিংহকে তারা ভয় পেত না। সিংহের অনুগত কয়েকটি পশুপাখি তার জন্য প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসত। সিংহ সেগুলো মজা করে খেত। আর অতিরিক্ত খাবারগুলো সিংহ রেখে দিত। ইঁদুরগুলো সুযোগ পেলেই সেসব খাবার খেয়ে ফেলত। শুধু তা-ই নয়, তারা প্রায়ই গুহার জিনিসপত্র নষ্ট করে ফেলত। সিংহটি ইঁদুরগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য খুব চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের শায়েস্তা করতে পারেনি। তাই সিংহ ইঁদুরগুলোকে তার বড় শত্রু বলে মনে করল। আর সব সময় তাদের থেকে সাবধান থাকত।

একবার বর্ষাকাল বেশ দীর্ঘস্থায়ী হলো। চারদিকটা পানিতে থইথই করছিল। ফসলের মাঠটিও পানিতে ডুবে গিয়েছিল। মাঠে যেসব গর্ত ছিল তাতে পানি প্রবেশ করেছিল। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ল মাঠের ইঁদুরগুলো। তারা প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকল। মহাবিপদে কিছুদিনের জন্য হলেও তাদেরকে নিরাপদ স্থানে থাকতে হবে। নইলে তাদের আর রক্ষা নেই। কিন্তু তারা তেমন কোনো সুবিধাজনক স্থান খুঁজে পেল না। ইঁদুর নেতা সব ইঁদুরগুলোকে নিয়ে এক দিন একটা সভা আহ্বান করল। সভায় তারা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করল। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তারা জানতে পারল সিংহের গুহার স্থানটিই হলো একমাত্র নিরাপদ স্থান। বাকি সব স্থান পানিতে ডুবে গেছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলÑ এ বিপৎকালীন সময়ে তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সিংহের নিকট প্রার্থনা করবে। এজন্য তারা আগামীকালই সিংহের সঙ্গে দেখা করবে।

পরদিন ইঁদুরগুলো সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সব কথা খুলে বলল। ইঁদুরগুলো আরো বলল যে, আমরা গুহার আশপাশে থাকলে আপনার কোনো ক্ষতি করব না। বন্যার পানি নেমে গেলে আমরা আপন আপন ঘরে ফিরে যাব। আমাদের আশ্রয় দিলে আমরাও আপনার অনেক উপকার করব। কেউ যাতে আপনার ক্ষতি করতে না পারে, তার জন্য সতর্ক থাকব। প্রয়োজনে আমরা পালাক্রমে আপনার গুহাটি পাহারা দেব। ইঁদুরগুলোর প্রস্তাব শুনে সিংহ তাদের প্রতি রেগে গেল। সে বলল, তোরা আমার কী উপকার করবি? তোরা তো অতি ক্ষুদ্র প্রাণী। তোদের কিবা করার ক্ষমতা আছে? দূর হয়ে যা গুহা থেকে! আর কখনো এখানে আসবি না। বদমায়েশ দুষ্টু! সে ইঁদুরগুলোকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিল। তার এক দিন পরেই আবার ইঁদুরগুলো সিংহের সঙ্গে দেখা করতে এলো। সিংহ তাদের দেখে আরো বেশি রেগে গেল। সে ইঁদুর নেতাকে খপ করে ধরে ফেলল। এতে অন্যান্য ইঁদুরও ভয় পেয়ে গেল। দলনেতাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তারা সিংহের কাছে অনুনয় বিনয় করল। কিন্তু সিংহ তাকে ছাড়ল না। সিংহ দলনেতাকে এক আছাড় দিয়ে মেরে ফেলল। এতে ইঁদুরগুলো অপমান বোধ করল। অবশেষে তারা সিংহের প্রতি খুব নাখোশ হয়ে ফিরে গেল।

ইঁদুরগুলো তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন গাছের ফোকলে আশ্রয় নিল। বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেলে তারা আবার নতুন দলনেতা নির্বাচন করল। নতুন দলনেতা সকলের মতামত নিয়ে আগের দলনেতা হত্যার প্রতিশোধ নিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। সে সবাইকে বুঝিয়ে দিল, কীভাবে তারা হত্যার প্রতিশোধ নেবে। আর কাজটি হলোÑ তারা গুহার চারদিকে গর্ত করবে। গর্ত করতে করতে গুহার পোতা পর্যন্ত চলে যাবে। এ কাজটা তারা খুব গোপনে শুরু করবে। বিষয়টি সিংহ যেন মোটেও টের না পায়। ইঁদুরগুলো কাজ শুরু করে দিল। তারা গর্ত করতে করতে গুহার পোতা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তারপর পোতার চারদিকে গর্ত করতে থাকল। এ কাজটি তারা দ্রুত শেষ করে ফেলল।

কয়েক মাস পর হঠাৎ এক দিন মুষলধারে বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির পানি ইঁদুরের গর্ত দিয়ে সরাসরি গুহার পোতা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। বৃষ্টির পানি ঢোকার ফলে গুহার পোতা খুব দুর্বল হয়ে পড়ল। এক দিন গুহাটি হঠাৎ একদিকে হেলে পড়ল। সিংহ এতে খুব ভয় পেয়ে গেল। সে দ্রুত গুহা নির্মাণে অভিজ্ঞ পশুপাখিদের ডেকে আনল। তারা গুহাটি খুব ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করল। তারপর তারা সিংহকে বলল যে, গুহার চারদিকে ইঁদুরের গর্ত রয়েছে। এ গর্ত দিয়ে বর্ষার পানি প্রবেশ করায় গুহার পোতাটি দুর্বল হয়ে গেছে। গুহাটি এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এটা বসবাস করার জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আপনাকে গুহাটি ছেড়ে দিতে হবে। নইলে গুহাধসে আপনার মৃত্যু হবে।

সিংহ মনে মনে বলল যে, এগুলো ওইসব দুষ্টু ইঁদুরের কাজ। যারা তার কাছে গুহার পাশে আশ্রয় চেয়েছিল। তাদের নেতাকে হত্যা করা এবং তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা মোটেও ঠিক হয়নি। ইঁদুর ক্ষুদ্র প্রাণী হলেও তাদের ক্ষমতাকে খাট করে দেখা ঠিক হয়নি। আমার সাধের গুহাটি এখন ভেঙে ফেলতে হবে। নানা কথা ভেবে সে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকল। তার আর কিছুই করার ছিল না। শেষ পর্যন্ত সিংহকে গুহাটি ছেড়ে দিতে হলো। আর সিংহ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল যে, সে আর কখনো কারোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না।

 

"