হাঁসের ছানা

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

দারিয়াপুর গ্রামে আক্কাস মিয়ার বাড়ি। তিনি একজন দরিদ্র কৃষক। তিনি অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে আর বাড়িতে কিছু রাজহাঁস ও মুরগি লালন-পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আক্কাস মিয়ার স্ত্রীও কঠোর পরিশ্রমী। গৃহস্থালির যাবতীয় কাজকর্ম একাই করে থাকেন। হাঁস-মুরগির নিয়মিত যতœ করেন। অবশ্য হাঁস-মুরগি লালন-পালন করার জন্য তাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। অল্প কিছু খাবার-দাবার দিলেই চলে। বেঁচে থাকতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না। আক্কাসদের বাড়ির ঠিক পেছন দিকে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। নদের পাড়ে রাজহাঁসগুলো একা একা চড়ে বেড়ায়। ওখানে গুগলি ও ঝিনুকের অভাব নেই। ওগুলো রাজহাঁসের প্রিয় খাবার। মুরগিগুলোও বাড়ির আশপাশে সারা দিন চড়ে বেড়ায়। বাড়ির আশপাশে মুরগির খাদ্য-খাবারের অভাব নেই। ছোট্ট উঠানের একপাশে হাঁস-মুরগিদের ঘর। সন্ধ্যার আগে আগে হাঁস-মুরগিগুলো আপন আপন ঘরে প্রবেশ করে। রাজহাঁস ও মুরগির ডিম বিক্রি করে যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে কোনো রকমে তাদের সংসারটা চলে যায়। তাই বাড়ির কর্তা ও গিন্নি হাঁস-মুরগিকে একটু বেশি বেশি আদর-যতœ করে। হাঁস-মুরগিগুলোও বাড়ির কর্তা ও গিন্নির প্রতি বেশ কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা নিয়মিত ডিম পাড়ে এবং ডিম থেকে বাচ্চা ফোটায়।

এক দিন বিকালবেলায় আক্কাস মিয়ার বাড়িতে এক আত্মীয় বেড়াতে আসে। ঘরে তেমন কোনো ভালো খাবার-দাবারের ব্যবস্থা ছিল না। আবার বাইরে থেকে খাবার কিনে আনার মতো টাকা-পয়সাও হাতে ছিল না। তাই আক্কাস মিয়া খুব চিন্তায় পড়ে যায়। অবশেষে স্ত্রীর পরামর্শ মোতাবেক সে একটি রাজহাঁস জবাই করে মেহমানদারি করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন উঠানের পরে ছোট-বড় সব রাজহাঁস ও রাজহংসি বিশ্রাম করছিল। আক্কাস মিয়া একটি রাজহাঁসের ছানাকে ধরে ফেলে। আর অন্য ছানাগুলো লক্ষ করছিল, ওই ছানাটিকে কী করে তা দেখার জন্য। আক্কাসের স্ত্রী রান্নাঘর থেকে একটি ধারালো বঁটি নিয়ে এগিয়ে আসেন। দুজন মিলে হাঁসটিকে শক্ত করে চেপে ধরেন। তারপর আক্কাস মিয়া বঁটি দিয়ে হাঁসটিকে জবাই করে মাটিতে ফেলে রাখেন। হাঁসটি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে গায়ের শুভ্র বরণ লাল রং ধারণ করে। চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে হাঁসটি ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জবাই করার করুণ দৃশ্য এর পূর্বে হাঁসগুলো কখনো দেখেনি। প্যাক প্যাক শব্দে তারা এর প্রতিবাদ করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। হাঁসটিকে তারা বাঁচাতে পারেনি। হাঁসগুলো আরো লক্ষ করল যে, আক্কাস মিয়া ও তার স্ত্রী দুজন মিলে একটি ঝুড়ির ভেতর মৃত হাঁসটির দেহ থেকে পালকগুলো ছাড়াতে থাকে। জবাই করা এবং পালক ছাড়ানোর দৃশ্য দেখে হাঁসের ছানাগুলো খুব ভয় পেয়ে যায়। ভীতসন্ত্রস্ত হাঁসগুলো কাঁপতে থাকে। কী নির্মম নিষ্ঠুরভাবে তাদের পরিবারের এক সদস্যকে চোখের সামনে হত্যা করা হলো। অথচ এর প্রতিবাদ করার কোনো সাহস তাদের ছিল না। ছোট ছানাগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না যে, বাড়ির কর্তা ও গিন্নি কেন হাঁসটির প্রতি এত নির্দয় হলো।

রাতের বেলায় হাঁসের ছানাগুলো কাতর কণ্ঠে তাদের মা-বাবাকে প্রশ্ন করলÑ আমাদের বড় ভাইকে কেন এভাবে জবাই করা হলো? তার অপরাধ কী ছিল? ওরা তো আমাদেরকে খুব ভালোবাসে। আদর-যতœ করে খাওয়ায়, থাকার জন্য সুন্দর একটি ঘরও বানিয়ে দিয়েছে। তবে যে...! রাজহংসি ছানাদের বলল, কোন বাচ্চারা। মানুষ তাদের প্রয়োজনে আমাদেরকে লালন-পালন করে। আমাদের থাকতে দেয়। তারা আমাদের ডিম খায়, আমাদের মাংস খায়। আবার আমাদের বাজারে বিক্রি করেও টাকা-পয়সা রোজগার করে। ওরা ব্যক্তিস্বার্থে অনেক কিছুই করে থাকে। ওরা ভাবে এতে কোনো অপরাধ নেই। ওরা বুঝতে চায় না যে, আমাদেরও একটা মন আছে। চোখের সামনে আমাদের কাউকে জবাই করলে আমরা কষ্ট পাই। রাজহংসির কথা শুনে ছানাদের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ছানাগুলো পুনরায় প্রশ্ন করেÑ তবে কি ওরা আমাদেরকেও একইভাবে জবাই করবে?

: ওরা প্রয়োজন মনে করলে তাও করতে পারে। শুধু তোমাদের কেন আমাদেরকেও করতে পারে।

: কিন্তু মা, আমাদের যে খুব ভয় করছে! তোমাকে আর বাবাকে হত্যা করলে যে আমরা সহ্য করতে পারব না। আমরা তখন কী করব মা? বল না মা, কী করব?

মা ছানাদের মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত¡না দিয়ে বলে, ভয় পেও না। এটাই সমাজের নিয়ম। তোমরা ভয় পেও না। এটা মেনে নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোরবেলায় হাঁসগুলোর ঘুম ভেঙে গেল। তারা সকলে নদীর পাড়ে খাবার খুঁজতে বের হলো। কিন্তু হাঁসের ছানাগুলো গতকালের ঘটনাটি কোনোভাবেই ভুলতে পারেনি। চোখের সামনে যখন সহোদর ভাইয়ের জবাই করার দৃশ্যটি ভেসে আসে, তখনই তারা ভয়ে আঁতকে ওঠে ! সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কথাগুলোও মনে পড়ে যায়। তাদের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, তা নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে। অবশেষে হাঁসের ছানাগুলো এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা আর কক্ষনো ভাইয়ের মতো কর্তাগিন্নির হাতে প্রাণ দেবে না। আর কক্ষনো ওই বাড়িতে ফিরে যাব না। তারা মনে মনে এও ভাবে যে, এই নদীই আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখবে। খাবার খুঁজতে খুঁজতে আমরা নদীর এক স্থান হতে অন্য স্থানে চলে যাব। দিন-রাত আমরা নদীতে ভেসে বেড়াব। নানা কথা ভাবতে ভাবতে একসময় সন্ধ্যা নেমে এলো। ছানাগুলো আর বাড়িতে ফিরে গেল না। মা-বাবা তাদেরকে কোথাও খুঁজে পেল না। রাজহাঁসের ছানাগুলো নদীতে ভাসতে ভাসতে দূরে কোথাও চলে গেল। আর কোনো দিন ফিরে আসেনি।

"