একটুখানি খেলার মাঠ

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

গ্রাম থেকে এক সপ্তাহ হলো শহরে এসেছে হিরণ। কিন্তু শহরে এলেই কী হবে! গ্রামের মতো তো আর স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারছে না! সারাক্ষণ শুধু ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে। ঠিক যেন জেলখানা! হিরণ মায়ের সঙ্গে গ্রামেই ছিল এত দিন। কিন্তু তার আব্বুর চাকরির প্রমোশনে যেই না তারা শহরে এলো! অমনি তার দুঃখ আর অসহায়ের দিনও শুরু হলো! তবে হিরণ বিকেল হলেই একটু জানালার কাছে গিয়ে বসে। জানালার কাছে বসলে, সে সামনে একটু ফাঁকা জায়গা দেখতে পায়, সেখানে আবার তিনটি ছেলে ক্রিকেট খেলে! হিরণ ভাবে সেও তাদের সঙ্গে খেলবে, হিরণ আম্মুকে গিয়ে বলল, আম্মু আমি ওদের সঙ্গে খেলা করি গিয়ে?

আম্মু বললেন, যাবি? কিন্তু ওরা যদি তোকে খেলায় না নেয়?

হিরণ বলল, না নিলে খেলব না! তুমি শুধু যেতে দাও! ঠিক আছে যা! তবে বেশি দেরি করবি না কিন্তু!

অনুমতি পেয়ে হিরণ তার ব্যাটটি হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দৌড়ে তাদের কাছে চলে গেল। ছেলে তিনটি হিরণের হাতে অত সুন্দর একটি ব্যাট দেখে অবাক হয়ে গেল। কারণ তাদের ব্যাটটি তো খেলনা ব্যাটের মতো দেখতে। তারপর তারা এক হয়ে খেলা করতে লাগল। এভাবে বেশ চলছিল হিরণ আর তার বন্ধুদের খেলাধুলা। হঠাৎ এক দিন ঘটল এক বিপত্তি! কোত্থেকে ১০-১২ জন লোক এসে কী সব মাপজোক দিতে লাগল। তার জন্য সেদিন তো তাদের খেলাও বন্ধ থাকল। আবার পরদিন অনেক লোক এলো, কোদাল আরো কী সব যন্ত্রপাতি নিয়ে! কী আশ্চর্য! এসেই তারা আবার মাটি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে দিল। হিরণ আর তার বন্ধুরা অবাক চোখে তাদের মাটি খোঁড়াখুঁড়ি দেখল! তাদের চোখে মুখে-বিস্ময়! হিরণ শুনতে পাচ্ছে, লোকগুলো বলাবলি করছে এখানে নাকি একটি বিশাল বড় বিল্ডিং হবে! অনেক বড় মার্কেট হবে! শুনে হিরণ আর তার বন্ধুদের মন ভেঙে গেল। তারপর তারা যে যার মতো বাসায় চলে গেল!

আম্মু বললেন, প্রায় এক সপ্তাহ তো হয়ে গেল, এখন তো হিরণকে স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে!

শুনে আব্বু বললেন, ঠিক আছে, কালই হিরণকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব। তারপর হিরণ আব্বু-আম্মুর সঙ্গে স্কুলে ভর্তি হতে গেল! কিন্তু এখানে স্কুল কোথায়? হিরণ আশপাশে স্কুল খুঁজতে লাগল। কিন্তু আশপাশে সে কোনো ফাঁকা জায়গায় দেখতে পেল না! কারণ হিরণ জানে স্কুল মানেই হলো, সামনে একটি খেলার মাঠ থাকবে! তার ধারণা খেলার মাঠ ছাড়া কোনো স্কুল হতেই পারে না!

কিন্তু একি! আব্বু তাকে এ কোথায় নিয়ে এলেন?

এটা কোনো স্কুল হলো? খেলার কোনো মাঠ নেই! ফাঁকা কোনো জায়গাও নেই! একটি গলি ভেতরে স্কুল! স্কুলের রুমগুলোও এত্ত ছোট যেন মনে হচ্ছে কবুতরের খোপ! একটু হাঁটাচলার জায়গা পর্যন্ত নেই! আর ছাত্রছাত্রীরা সবাই কেমন অহেতুক হইহুল্লোড় করছে! তাই দেখে হিরণের কেমন কান্না চলে এলো! হিরণ আব্বু-আম্মুকে বলল, আমি এখানে কিছুতেই ভর্তি হতে চাই না! আমি গ্রামের বাড়িতে যাব! কিন্তু আব্বু-আম্মু তবু হিরণকে এই স্কুলেই ভর্তি করিয়ে দিলেন। কারণ স্কুলটি তাদের বাসা থেকে খুবই নিকটে! তারপর স্কুুলে ভর্তি হয়ে হিরণ ভীষণ মন খারাপ করে বাসায় চলে এলো।

পরদিন প্রথম ক্লাসে গিয়েই হিরণ বুঝতে পারল, এখানকার সব ছাত্রছাত্রী অকারণেই কেমন হইহুল্লোড় করে। শিক্ষকদের কোনো সম্মানও করে না! কারো মনে ভয়-ডর নেই! সবার হাতে স্মার্টফোন! সুযোগ পেলেই তারা ক্লাসে ফাঁকি দিয়ে স্মার্টফোনে গেমস খেলে!

হিরণ ভাবে, স্কুলের কোথাও যদি একটুখানি ফাঁকা জায়গা থাকত! তা হলে সে একা একা সেখানে গিয়ে না হয় একটু বসে থাকত কিংবা ক্রিকেট বলটি আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে আবার ক্যাচ ধরত! কিন্তু তারও কোনো উপায় নেই! স্কুলে কোত্থাও একটুখানি খেলার মাঠ নেই! হিরণের চোখ দিয়ে জল চলে এলো!

 

"