ছাতু খাবো

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

শরীফ সাথী

কয়েক দিন ধরে বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে ডোবা-নালা ভর্তি। সারাক্ষণ ব্যাঙের দলের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাকে চারপাশ সরগরম। উঁইপোকাদের অনবরত ওড়াউড়ি জীবন বিপন্ন। ক্ষুধার্ত পাখিগুলো বাসার ফাঁকে মুখ বাড়িয়ে করুণ কিচিরমিচির ছন্দ সমাহার। পশু ও জনমানুষের স্থবির জীবন। প্রকৃতির এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অবস্থায়ও মাঠে যেতে হয় গরু-ছাগলের খাবার সংগ্রহে। তেমনি পুটে দাদুর যাওয়া। টোকা বা মাথাল মাথায় দিয়ে কাঁস্তে হাতে গেরামের মেঠোপথ ধরে সবুজ বনের পাটাচোরা তীরধরা দ্বীপের মাঠে যাচ্ছে। বজ্রবাতির আলো চমকানোই ধপ করে শব্দ। পিচ্ছিল কাদায় লুটোপুটো পুটে দাদুুর। পা ভেঙে বেহাল দশা। কাদা মাটি অবস্থায় মাঠের লোকজন ধরাধরি করে বাড়ি আনল। বাদল দিনে পরিবারের লোকজনের ব্যস্ততার শেষ নেই। ডাক্তার দেখানো পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে পুরো রেস্টে থাকার পরামর্শ মাস তিনেকের। ভোগান্তির এ জীবনে বিকেলে ঘরের বারান্দায় বসে বৃষ্টি রিমঝিম কলকলা শব্দ মায়াময় ছন্দ তুলছে দুকর্ণে পুটে দাদুর। এমন সময় নাতি ডিফাত এলো দাদুর কাছে। পুটে দাদু মুচকি হেসে বলল, আগেকার সেদিন আর এখনকার এদিন অনেক পার্থক্যরে। নাতি ডিফাত বলল, কি রকম দাদু ভাই?

এই যেমন তুমি টকালো মোলাটের প্যাকেটের চিপস এনে খাচ্ছো আমার পাশে বসে। আর আগেকার দিন ওই দেখো ওই খড়ের ঘরের চালের বাতায় পর পর অনেকগুলো ছিকি টাঙানো থাকত। নাতি বলল, ছিকি কি দাদুভাই? দাদু বলল, সবই বলছি দুষ্টু নাতি। তুমি খাও আর মনোযোগ দিয়ে শোনো। ছিকি হলো পাটের দড়ি পাকিয়ে বোনানো বিভিন্ন ডিজাইনের নকশা করা ঝুল। ঘরের চালের আড়ার সঙ্গে বেঁধে ঝুলে ঝুলে রাখা এবং ওর ভেতরে মেটে হাঁড়ি, কাঠা, কলসি, গামলা ইত্যাদি সাজিয়ে রাখা হতো। হাঁড়ির ভেতর মুড়ি-মুড়কি থাকত। কোনোটায় আবার বানানো চালের পিঠা বোঝাই থাকত। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘরে ছিকি শোভা পেত। তরিতরকারির মাটির মালসা, এমনকি ভাতের হাঁড়িও রাখা হতো। রান্নাঘর বা হেঁশেল ঘরের কোনায় কোনায় থাকত মেটে কোলা। ঠিক এখনকার ব্যারেল ঢপ-এর মতো দেখতে। চাষাবাদের জন্য ধান-গমবীজ যতœসহকারে রাখা হতো কোলা বোঝাই করে। ধান ভানা চাল কোটানোর জন্য হেঁশেলের একপাশে ঢেঁকি থাকত প্রায় বাড়িতে। এসব এখন আর দেখা যায় না। দেখা যায় বিভিন্ন প্লাস্টিকের এবং স্টিলের রেক আলমারি। বর্ষার দিনে আজ যেমন তুমি চিপস্ চানাচুর খাচ্ছ। আমরা তখন মুড়ি-মুড়কি চিড়া ছোলা ভাজা চিবাতাম আর আমার দাদুদের কান্ড বসে গল্প শুনতাম। আহা কি যুগ এলো! আগের দিনের ছিকি থাকা খই মুড়ি, গুড়, মিষ্টি মধুর খেয়ে কত মজা পেতাম। গম চাল ডাল একসঙ্গে ভেজে ঢেঁকিতে বা জাঁতায় পিষে কী মজাদার ছাতু হতো। খেজুর গুড় বা আখের গুড় মিশিয়ে আয়েশে খাওয়ার নির্ভেজাল নিঃশ্বাস সত্যিই বিশ্বাস স্থাপনে মনে করার মতো। সেসময়ে পাড়া গাঁয়ে ছাতু খাওয়ার পাল্লা হতো। ভুরো যব চালের যাও, আয়েশে খাও। আহ গুড় দিয়ে বানানো মজাদার ক্ষির স্মৃতির মেমোরি সাজানো। মাঠের পর মাঠে বোনা ধানের চারায় গরু দিয়ে বিদে ঠেলার দৃশ্য সত্যি অপূর্ব। আমন আউশ চালের পান্তা ভাত। ঝাল পেঁয়াজ ভাত ছানা। গরম ভাতে দেশি খেসারি ছোলা মসুর মুগকলাইয়ের ডাল আর গাঁয়ের পাশের নদীর ছোট ছোট মাছ সত্যিই নাতি ভাই মাছে ভাতে খাটি বাঙালি ছিলাম। বুনো ওল কচুশাক পুষ্টিকর কত সবজি? গাছের পাকা পাকা কত রকম দেশিও ফল। কাঁচা হোক আর পাকা হোক পেঁপে কলা আম জাম লিচু পেয়ারা। এখন আর গ্রামের মানুষ জাতীয় ফল কাঁঠালই খাচ্ছে না। ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে কাঁঠালগাছ বিলীন হচ্ছে। এখন দেশে আবাদ হচ্ছে নতুন নতুন উন্নত ফলনশীল ধান। বারো মাসই ধান চাষ হচ্ছে। ভাতের অভাব নেই। আর তখন ভাত বেগোরে উপোস, কত কিছু খেতে হয়েছে। থাকতে হয়েছে ছাতু খেয়ে। গোয়াল ভর্তি গরু থাকত। রাখাল কৃষাণ থাকত। এখন হয়েছে ছাগল গরুর ফার্ম। তখন গরুর দুধ দই কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া কত কথা মনে পড়েরে নাতি। এখন দেখছি বর্ষা মৌসুমজুড়ে বিভিন্ন রকমের ছাতার সমাহার। আর আগে মাথায় টোকা, গোলপাতার ছাতা বানিয়ে ব্যবহৃত হতো। তখন মানুষে মানুষের কত মহব্বত ছিল। সন্ধ্যার এমন ক্ষণে ডিফাতের আম্মু বলল, ডিফাত ঘরে এসে পড়তে বসো? ডিফাত বলল, আম্মু আমি ছাতু খাবো। ডিফাতের এমন কথায় দাদু এবং আম্মু দুজনাই হেসে উঠল।

 

"