বাঘা শোল ও ডোবার গল্প

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

শামীম খান যুবরাজ

বাবলার চরের ধানখেতগুলোর পূর্ব কোনায় একটা ডোবা। ডোবার চারপাশে কেয়ার ঝোপ আর উত্তর পাড়ে একটি হিজলগাছ নুয়ে আছে ডোবার ভেতরে। ফুল ফোটার মৌসুমে হিজলের ফুলগুলো ঝুলে থাকে পানিতে। তারপর একসময় ঝড়ে পড়ে পানির ওপর, পানির ওপর ভাসতে থাকা হিজল ফুলগুলো বাড়িয়ে তোলে কেয়াঝোপবেষ্টিত ডোবার রূপ। গ্রীষ্মকালেও ডোবাভর্তি থাকে পানিতে। কৈ, শিং, মাগুর, খলসে, টাকি, পুঁটি, শোল, বাইমসহ আরো অনেক প্রজাতির মাছের বসবাস এই ডোবায়। দলবদ্ধভাবেই তারা বাস করে। বেশ সুখেই কাটে তাদের দিনগুলো। তবে বারো মাস একই ডোবায় বন্দি থাকতে কার মন চায় বলো? আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টিতে মাছের দুষ্টু পোনাদের মন নিশপিশ করতে থাকে। কখন বন্যা হবে, বৃষ্টির পানিতে ছেয়ে যাবে খেতগুলো, ডুবে যাবে খেতের আল। ডোবার ছোট্ট পাড়টাও ডুবে যাবে একসময়। তারপর তো স্বাধীন। আহ কী আনন্দ! অথৈই পানিতে সাঁতার কাটার কী যে মজা! উফ্, বর্ষাকালটা কেন যে সারা বছর থাকে না।

দুদিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি চলল। ডুবে যেতে লাগল আউশের ধান, খেতের আল। বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর হয়ে গেল ডোবার ভেতরটা। বাহিরের পানির স্রোত এসে ডুবে গেল পাড়। এখন চারদিকে পানি আর পানি। বাতাসের ঝাপটায় ঢেউ ওঠে পানিতে। মাছেদের আনন্দ আর ধরে না। পোনাদের ছটফটানির অবসান হয়। অবাধ সাঁতারের জন্য অস্থির উঠে মাছের দুষ্টু পোনাগুলো। বড়দের সাবধানবাণী শুনতেও রাজি নয় অনেকে। বৃষ্টির শুরুতে কৈয়ের পোনাগুলো পাড় ডিঙিয়ে চলে গেছে কানে ভর দিয়ে হেঁটে। ধানখেতে গিয়ে কোনো দুষ্ট লোকের পেতে রাখা কারেন্ট জালে আটকা পড়ার আশঙ্কায় বেশ চিন্তিত বুড়ো কৈ মাছগুলো। এরই মধ্যে পুঁটি, টাকি ও খলসের পোনাদের ছটফটানি দেখে ক্ষেপে গেলো বয়স্ক মাছেরা। সবাইকে জড়ো করে জোরালো কণ্ঠে সাবধানবাণী শোনালেন বুড়ো মাগুরÑ ‘এখনো পুরো বর্ষা আসেনি। বেড়ে যাওয়া পানিগুলো আবার শুকিয়ে যেতে পারে, তাছাড়া শ্রাবণের এখনো মেলা দেরি। বেশি দূর যাওয়া যাবে না, ডোবার আশপাশের জমিতে দলবদ্ধভাবে সাঁতার কাটবে সবাই। আনন্দ করবে। আর বড়দের কাছ থেকে কখনো দূরে যাবে না। তোমাদের নিরাপত্তার জন্য বাঘা শোল মাছটাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। সে সারাক্ষণ তোমাদের ওপর কড়া নজর রাখবে। আর একটা কথা, এ মৌসুমে কিছু অসাধু লোক কারেন্ট জাল পেতে তোমাদের ধরার চেষ্টা করবে। খুব সাবধানে চলাফেরা করবে কিন্তু।’

বুড়ো মাগুরের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনেছে সব বয়সী মাছ। মাথা নিচু করে প্রথমে বাঘা শোল সম্মতি জানালে সবাই ‘জি, জি’ বলে যে যার মতো তৈরি হতে লাগলো। পুঁটি তার পোনাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লে একে একে ডোবা থেকে বেরোতে লাগলো মাছেরা। নতুন পানি আর বিশাল সাঁতার কাটার জায়গা পেয়ে সবাই খুশি। হারিয়ে যাওয়া কৈয়ের পোনাগুলোকে খুঁজে পেলো সবাই।

এভাবে কেটে গেলো বেশ কিছুদিন। মাছেরা আনন্দে সাঁতার কেটেই চললো। এরই মাঝে আকাশের মেঘগুলো কমে যেতে লাগলো। বন্ধ হলে গেলো বৃষ্টি। কমতে শুরু করলো আউশ খেতের পানি। বুড়ো মাছগুলো পোনাদের সহসা ডোবায় ফেরার তাড়া দিয়ে অনেকেই ডোবায় চলে গেলেন। বাঘা শোলকে বলে গেলেন সবাইকে নিয়ে ডোবায় ফিরতে। এদিকে বাঘা শোল পড়েছে মহাবিপদে। সবাইকে এক জায়গায় একত্র করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সে। দুষ্টু পোনাদের ছুটোছুটি থামেই না। কেটে গেল আরো কয়েক দিন। পানি শুকিয়ে এসেছে প্রায়। ডোবার কাছাকাছি জমির নিচু অংশে যেখানে হেলেঞ্চা লতায় ছেয়ে আছে; সেখানে অবস্থান করলো বাঘা শোল। সবাইকে এখানে জড়ো করতে লাগলো সে। সবাই এসে গেলে কাল সকালে ডোবায় ফিরে যাবেÑ এমন পরিকল্পনা নিয়ে ঘুমিয়ে গেলো সবাই।

খুব ভোরে মাঝারি বয়সি খলসের চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল বাঘাসহ সকলের। চোখ কচলে দেখতে পেল রাতের মধ্যে সব পানি শুকিয়ে গেছে। নিচু হেলেঞ্চা বনের অল্প পানিতে তারা আটকা পড়ে আছে। এখান থেকে ডোবা দেখা গেলেও পানি সরে যাওয়ায় ডোবায় ফেরার উপায় নেই। নিশ্চিত মৃত্যুর কথা ভেবে কান্নাকাটি শুরু করে মাছের পোনাগুলো। ধমক লাগালেন বাঘা শোল, তোমাদের ছেলেমানুষির জন্য আজকের এই বিপদ। বুড়োদের কথা না শুনে এমন বিপদ ডেকে এনেছো তোমরা। এখন চুপচাপ থেকে বুদ্ধি বের করো কীভাবে এখান থেকে ডোবায় ফেরা যায়। কৈ হো হো করে হেসে উঠলে সবাই তার দিকে তাকাল। কৈ বললো, আমি তো কানে হেঁটে ডোবায় চলে যেতে পারবো। কিন্তু এই দুষ্টু পোনাগুলোর কী হবে? এদের কারণেই সবাইকে বিপদে পড়তে হলো।

এতক্ষণ চুপচাপ কথা শুনছিলেন বুড়ো শিং মাছ। কৈয়ের উদ্দেশে এবার মুখ খুললেনÑ দেখো কৈ, ছোটরা তো একটু-আধটু ডানপিটে হয়ই। তাই বলে তাদের মৃত্যুমুখে রেখে যাওয়া কি ঠিক? তুমি বরং তোমার পিঠে করে একজন-দুজন করে ডোবায় রেখে আসো। বুড়ো শিংয়ের কথায় সবাই খুশি হলো। কৈয়ের পিঠে চেপে বসলো পুঁটির পোনা। কিছুদূর যেতেই দমবন্ধ হয়ে এলো পুঁটির। কৈয়ের পিঠে বসেই চেঁচামেচি শুরু করলো সে। উপায় না দেখে আবার ফেরত নিয়ে এলো হেলেঞ্চা ঝোপে। আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করলো সবাই। ভাবতে ভাবতে কেটে গেলো রাত। দিন ফুরিয়ে গেলো। পানি আরো কমতে লাগলো। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো সকলেই। বুড়ো শিংয়ের কথায় কৈকে পাঠানো হলো ডোবায়। ডোবা থেকে বুড়ো মাগুরের সঙ্গে আলাপ করে ফিরে এলে সবাই তাকে ঘিরে ধরলো। তারপর বুড়ো মাগুরের বুদ্ধিমতো বাঘা শোল তার শক্ত মাথা দিয়ে কাদা ঠেলে এগিয়ে চললে নালার মতো যাওয়ার পথ তৈরি হয়ে গেলো ডোবা পর্যন্ত। বাঘা শোলের পেছনে পানির স্রোত। আর স্রোতের সঙ্গে মাছগুলো পোনাসহ ছুটলো ডোবার দিকে। অল্প সময়ের মধ্যে সবাই ডোবায় এসে নামলো। তখন ডোবায় আনন্দের ঢেউ ওঠে। বাঘা শোলের বীরত্বে মাছেরা শোলকে মাথায় নিয়ে মৎস্যনৃত্যে মেতে উঠলো। সবাইকে ফিরে পেয়ে খুশিতে কেঁদে ফেললো বুড়ো মাগুর।

"