শিমুলতলীর স্কুলবাস

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

গ্রামের নাম শিমুলতলী। নামটি বেশ সুন্দর, তাই না? নাম শুনে কি মনে হচ্ছে, বসন্তকালের শিমুল ফুলের সমারোহ? ঠিক ধরেছ! আগে নাকি শিমুলতলী গ্রামে অনেক শিমুলগাছ ছিল। বসন্তের সময়ে পুরো গ্রাম রাঙিয়ে দিত সেই সব শিমুলগাছ। তো আর কী! সেখান থেকেই গ্রামের নাম শিমুলতলী হয়ে গেল! কিন্তু এই শিশুতলী গ্রামে একটি বড় সমস্যা আছে, তা হলো সেখানকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর অবধি পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়! ভ্যানগাড়ি অবশ্য আছে, কিন্তু ওগুলো তো ইলেকট্রিক ভ্যান। মাঝে মাঝেই তারা আবার একে অপরের সঙ্গে নিছক প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। তাই মাঝে মাঝেই ঘটে মারাত্মক দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনা তাদের কাছে এখন এক ধরনের আতঙ্ক! আর তাছাড়া অত টাকা কী আর তাদের আছে? প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসাতে ২০ টাকার মতো লাগে। খেটে খাওয়া মানুষ যারা, তারা কীভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলের যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন ২০ টাকা করে দেবে? অনেক অভিভাবক তো তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতেই অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার যুগে তারাও এখন বুঝতে শিখেছে, যে করেই হোক ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে হবে! মানুষের মতো মানুষ করতে হবে! এই তো কিছুদিন আগেই তারা দেখল, রাস্তায় একটি ভ্যানগাড়ি গেল উল্টে। সঙ্গে সঙ্গে এক মেধাবী ছাত্রী তাদের সামনেই পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে গেল। তাই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভয়ে আর ভ্যানগাড়িতে ওঠে না। তারা বরং হেঁটেই স্কুলে যায়। এজন্য তারা অবশ্য অনেক সকাল-সকাল বের হয়। কারণ পুরো এক ঘণ্টা সময় হাঁটতে হয় তাদের স্কুলে পৌঁছতে। ছাত্রছাত্রীরা প্রখর রোদে হাঁটতে হাঁটতে ঘেমে একেবারে নেতিয়ে পড়ে। এমনই চলছিল তাদের স্কুলে যাওয়া-আসা!

এক দিন হলো কী! একটি লোক সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দেখতে পেলেন, স্কুলের বাচ্চারা হেঁটে হেঁটে সারিবদ্ধভাবে স্কুলে যাচ্ছে! কোনো ভ্যানে যাচ্ছে না তারা! তিনি রাস্তায় উনার গাড়িটি দাঁড় করিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তোমরা হেঁটে স্কুলে যাচ্ছ? স্কুলের বাচ্চারা সবাই লোকটিকে বলেছিল, ভ্যানে উঠে তাদের একজন সহপাঠী নাকি পঙ্গু হয়ে গেছে! আর তারা তো গরিব, প্রতিদিন ২০ টাকা করে দেওয়ার সামর্থ্যও তাদের পরিবারের নেই। তাই তারা হেঁটেই স্কুলে যাওয়া-আসা করে। লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাদের বলেছিলেন, চিন্তা করো না! খুব শিগগিরই আমি তোমাদের স্কুলের যাতায়াতের জন্য একটি স্কুলবাসের ব্যবস্থা করে দেব! তখন আর তোমাদের কোনো দুঃখ থাকবে না! তারপর থেকে কী হলো ছাত্রছাত্রীরা রোজ পাকা রাস্তায় উঠেই স্কুলবাসকে খুঁজত। কিন্তু আশপাশে তারা কোথাও স্কুলবাসটি দেখতে পেত না! এভাবে অনেক দিন কেটে গেল! তারা একে অপরের কাছে বলত, কোন না কোন লোক তাদের স্কুলবাসের আশ^াস দিয়েছে, তাই তারা বিশ^াস করেছে! এর কোনো মানে হয়?

এমন লোক তো তাদের সমাজেও অনেক আছে। তারা খুবই প্রভাবশালী। তারা তাদের দরকারের সময় কতইনা প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু পরে তারা আবার সব ভুলে যায়। উনিও হয়তো তাদের দলেই! না হলে আজ এত দিন হয়ে গেল কই কোনো স্কুলবাসেরই তো কোনো ব্যবস্থা করলেন না তিনি! হঠাৎ এক দিন ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা! স্কুলে যাবার জন্য যেই না তারা পাকা রাস্তায় উঠেছে অমনি দেখল, একটি ধবধবে সাদা বাস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো শহর থেকে কে বা কারা এসেছেন! কিন্তু বাসটির কাছে এসেই অবাক হয়ে গেল। বাসের গায়ে লেখা ছিলÑ স্কুলবাস! আরো লেখা ছিল, এই বাসে শুধু স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই উঠবে! ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে বাসটির চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। বাসের হেলপার আর ড্রাইভার বললেন, এটা নাকি তাদের জন্যই চালু করা হয়েছে! একদম বিনা পয়সায় তারা এখন থেকে স্কুলে যেতে পারবে, কোনো টাকা লাগবে না! প্রতিদিন নিয়ম করে একটি জায়গায় বাস এসে দাঁড়াবে। এজন্য স্কুলের বাচ্চাদের নাকি ১০ মিনিট আগেই সেখানে আসতে হবে। তারপর থেকে যথারীতিতে বাস চলতে লাগল। শিমুলতলী গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে যাবার জন্য আর কোনো কষ্ট রইল না! কিন্তু কে এই বাসটি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে চালু করে দিলেন, সেই উদার মহৎ ব্যক্তির নামটিইবা কি? তা জানার জন্য গ্রামের মানুষগুলো বাসের হেলপার আর ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলে তারা শুধু বলল, এক মহান ব্যক্তি নাকি তাদের জন্য এটা করেছেন! যিনি নিজের নামটি পর্যন্তও গোপন রাখতে চান! উনার নাকি অনেক টাকা পয়সা! দান, সদকার একটি অংশ দিয়ে তিনি ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বাসটি কিনেছেন! শুনে সবাই অবাক হয়ে সেই মহান ব্যক্তির জন্য দোয়া করলেন। বাসের হেলপার ড্রাইভারও দেখেছে, ছাত্রছাত্রীরা মাঝে মাঝেই সেই মহান ব্যক্তিটির জন্য দোয়া করে! এখন তোমরাই বলো, এমন নিষ্পাপ শিশুদের দোয়া কি কখনো বৃথা যেতে পারে?

 

"