পাখি হওয়ার সাধ

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

আলী এরশাদ

নয় বছরের অভি আপন মনে উঠোনে খেলা করছে। কয়েকটি শালিক নেচে নেচে অভিকে খুব আনন্দ দিচ্ছে। অভি শালিকগুলোকে ধরতে গেলেই সেগুলো লাফিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে। অভির তবু ক্লান্তি নেই। অভি বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান, ক্লাস থ্রিতে উঠেছে এবার। পড়ার চেয়ে খেলাই তার প্রিয়। দুষ্টুমিতে সবার সেরা। পাখিদের সঙ্গে খেলতে তার খুব ভালো লাগে। খেলতে খেল তার মনে মনে পাখি হওয়ার সাধ জাগে। মাকে প্রশ্ন করে, মা আমি কেন পাখির মতো উড়তে পারি না? পাখিরা কীভাবে উড়ে?

মা জবাব দেয়, মানুষ উড়তে পারে না, কারণ মানুষের পাখির মতো পাখা নেই। পাখিরা পাখার সাহায্যে উড়ে।

অভির প্রশ্ন, কেন পাখা নেই?

মা বিরক্ত হন কিন্তু হেসে জবাব দেন, মানুষের পাখা হয় না।

অভি চুপ করে গেলেও বিষয়টি মেনে নিতে পারে না। কেন মানুষের পাখা

থাকবে না? কেন মানুষ উড়তে পারবে না? পাখিরা কত সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে যায়। নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত ঘুরে ঘুরে দেখে। এসব ভেবে ভেবে তার মনে দুঃখ হয়। ঘর থেকে চাল নিয়ে এসে উঠোনে ছিটিয়ে দেয়, পাখিদের নাম ধরে ধরে কাছে ডাকে।

অভি পাখিদের সুন্দর সুন্দর নাম রেখেছে, রাজা, রানি, দুখু, সুখীÑ এ রকম বিভিন্ন নাম। পাখিরা অভির বন্ধু হলেও ধরা দেয় না তাই অভির মন খারাপ হয়। পাখিগুলো কেন বুঝে না, ধরা দিলে অভি ওদেরকে বন্দি করবে না, আদর করে তারপর ছেড়ে দেবে। বাড়ির পেছনে বড় বড় আম, জাম, কাঁঠালগাছে পাখিগুলো বাসা বেঁধে থাকে। প্রতিদিন পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে সকালের ঘুম ভাঙে অভির। একটি পাখি আছে খুঁড়িয়ে হাটে, কে যেন ঢিল ছুঁড়ে তার পা ভেঙে দিয়েছে। পাখিটির জন্য অভির খুব মায়া হয়। এই পাখিটির নামই দুখু রেখেছে অভি। যারা পাখিদের ধরে খাঁচায় পোষে অভি তাদের পছন্দ করেন না। পাখিরা উড়বে, গাইবে কতই না ভালো লাগে এসব দেখতে। রাতে পড়ার পর খাওয়া-দাওয়া শেষে অভি ঘুমাতে গেল। হঠাৎ তার পাখিদের কথা মনে হলো, ইস! যদি পাখিদের মতো ডানা থাকত তবে কত মজাই না হতো। মন চাইলেই যেখানে সেখানে উড়ে যেত। নানাবাড়ি ঘুরে আসত মুহূর্তের মধ্যে। মা ডেকেও তখন আর ধরতে পারত না। এমন অনেক এলোমেলো চিন্তাভাবনা করতে করতে অভি ঘুমিয়ে পড়ল।

অভি আকাশে উড়ছে। আহা! কী আনন্দ। উড়তে উড়তে নদী, পাহাড় পেছনে ফেলে গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। জঙ্গলের ভেতরে কি চমৎকার এক বাগান! বিভিন্ন রকম ফুল ফোটে রয়েছে লাল, নীল, সাদা, হলুদ, গোলাপি। সেখানে হাজার রঙের হাজার হাজার পাখি মনের আনন্দে গান ধরেছে। প্রজাপতি আর ভ্রমরগুলো উড়ে উড়ে ফুলের ওপর বসে মধু আহরণ করছে। নতুন অতিথি অভিকে দেখে সবাই স্বাগতম, স্বাগতম নতুন বন্ধু বলে সাদরে গ্রহণ করে নিল। অভি খুশিতে আত্মহারা হয়ে পাখিদের সঙ্গে নাচতে লাগল আর গাইতে লাগল।

আহা! কী আনন্দ, আকাশে-বাতাসে

সমস্ত বন সে ঘুরে দেখল। প্রকৃতির অপরূপ রূপে মুগ্ধ অভি।

খানিক বাদে আকাশ কালো হয়ে উঠল। ঝড়ের পূর্বাভাস লক্ষ করে সব পাখি, প্রজাপতি ভ্রমরাগুলো নিজ নিজ বাসার উদ্দেশে উড়াল দিল। অভিও উড়াল দিল পাখিদের সঙ্গে। ঠ্যাং ভাঙা পাখিটা তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উড়তে পারছে না। দুখুকে রেখে সব পাখি আগে চলে যাচ্ছে, তাই দেখে অভি দুখুকে তার বিশাল পাখনায় বসিয়ে দ্রুত বেগে উড়ে চলল।

আমগাছের শক্ত ডালে অভির বাসা। ঝড় উঠার আগেই অভি তার বাসায় ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো তুমুল ঝড়-তুফান। ঝড়ের ধাক্কায় গাছপালা, বাড়িঘর, দোকানপাট সব উপড়ে পড়তেছে একের পর এক। অভি ভয়ে কাঁপছে, এমন সময় তার ডালটি ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল। ডানায় প্রচ- আঘাত পেয়ে মা—গো, বাবা—-গো বলে চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে দেখে অভি মেঝেতে পড়ে গেছে। হাতে প্রচ- ব্যথা। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল বাহিরে অনেক ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। বুঝতে পারল এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল। পরক্ষণেই গাছে বাসা বেঁধে থাকা পাখিদের কথা তার মনে হলো। এই ঝড়বৃষ্টিতে পাখিগুলো কোথায় আছে? কেমন আছে? দুখু বেঁচে আছে তো! বিড়বিড় করে বলল পাখির চেয়ে মানুষই ভালো।

 

"