স্মার্টফোন আসক্তি

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব

কিছুদিন হলো আনিকার রাতে ঘুমই আসে না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে রাত প্রায় শেষ হয়ে যায়। আর দিনের বেলাও আধোঘুম-জাগরণে আনিকা ঝিমাতে থাকে। এ জন্য সে আজকাল মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনাও করতে পারছে না! এ জন্য আব্বু-আম্মু আনিকাকে নিয়ে চিন্তা আছেন! হঠাৎ আনিকার কী এমন হলো! কই আগে তো সে এমন ছিল না? আনিকাকে জিজ্ঞেস করলে আনিকা কিচ্ছুটি বলে না, শুধু বলে আমায় স্মার্ট ফোন দাও আমি গেমস্ খেলব! আশ্চর্য! সামনে তোমার পরীক্ষা এ সময় পড়াশোনা করতে হবে। শুয়ে বসে গেমস খেললে তোমার যে রেজাল্ট ভীষণ খারাপ হবে মামুনি! আম্মু আনিকাকে বোঝায়। কিন্তু আনিকা আম্মুর কথা যেন বুঝতেই চায় না। আনিকা জানে আম্মু তাকে এখন কিছুতেই ফোন হাতে দেবে না, এটা জেনে আনিকা আর আবদারও করে না! পড়তেও বসে না! আনিকা সব বোঝে এ সময় পড়াশোনা না করলে তার রেজাল্ট ভীষণ খারাপ হয়ে যাবে। তখন কেউ তাকে আর ভালোবাসবে না! কাছের বন্ধুরাও সবাই দূরে চলে যাবে। কিন্তু আনিকা কী করবে? তার যে ইদানীং পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না! এ কথা সে আব্বু- আম্মুকে কী করে বলবে! আব্বু-আম্মু শুনলে তো আকাশ থেকে পড়বেন। আনিকাও ভাবে সে এমন করছে কেন? সারাক্ষণ চোখের সামনে সে স্মার্ট ফোনের সেই চোখ ধাঁধানো গেমসটি দেখতে পায়। মনে মনে ভাবে, ইস! কত্ত সুন্দর গেমস! যদি এমন হতো তাকে পড়াশোনা করতে হবে না, কেউ শাসনও করবে না! মন যখন চায় সে শুধু গেমস খেলতে পারবে! তাহলে কত্ত মজা হতো!

এসব ভেবে ভেবে আনিকা সারা রাত পার করে দেয়। এভাবে বেশ ক’দিন চলে গেল। আনিকা ক্লাসে বসে ঝিমায় ক্লাসের ম্যাডাম আনিকার আম্মুকে ফোন করে বলেন বিষয়টি। শুনে আম্মু আনিকার দিকে তেড়ে এসে আচ্ছামত ধমকান! ধম শুনেও আনিকা কিচ্ছুটি বলে না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে! তাই আম্মু আনিকার ছোট কাকুকে বাসায় আসতে বললেন। আনিকার ছোট কাকু একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বড় ডাক্তার! সবাই এক সঙ্গে বসে রাতের খাবার খাচ্ছেন। হঠাৎ আম্মু খেতে খেতে ছোট কাকুকে বললেন, দেখ না! তোমার ভাতিজির কান্ড কারখানা! সারা দিন শুধু বিছানায় শুয়ে বসে থাকে আর রাতে একটুও ঘুমায় না। সারাক্ষণ বলতে থাকে, ফোন দাও! ফোন দাও! এসবের কোনো মানে হয়? অথচ সামনে ওর পরীক্ষা! ক্লাসে বসে বসেও ঝিমায়! আজও ওর ম্যাডাম ফোন করে বললেন। ছোট কাকু বললেন, নিশ্চয় এত দিন ওর কাছে ফোন দিয়েছিলে তোমরা, তাই না? আম্মু বললেন, হ্যাঁ! ও তো ফোনে শুধু গেমস খেলতে চায়! তাই দিয়েছিলাম! ছোট কাকু বললেন, এখানেই তোমরা মারাত্মক ভুল করেছ! তোমাদের পরে বিষয়টি বুঝিয়ে বলব। ছোট কাকু আনিকাকে বললেন, সেকি! আনিকা! তুমি তো ভীষণ লক্ষ্মী মেয়ে! এমন করছো কেন? আনিকা খেয়াল করল, ছোট কাকু কী সুন্দর করে তাকে ডাকছে। শুনে আনিকার চোখ মুখ উজ¦ল হয়ে উঠল। ছোট কাকু বললেন, ঠিক আছে এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাও, পরে তোমার সব কথা শুনবো কেমন? আনিকা একটু মøান হেসে মাথা নাড়াল। কাকু খেতে খেতে বললেন, স্মার্ট ফোন আসক্তি অনেক ভায়াবহ একটি ব্যাধি! আনিকার বয়সি ছেলে-মেয়েরাই আসক্ত হচ্ছে বেশি। আর গেমসগুলোও এমন আকর্ষণীয় ভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে, তারা পড়াশোনার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, একটি ফোনের জন্য ওরা কিন্তু নিজেদের জীবনও দিতে পারে! এতে করে ওদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। মোটের ওপর, স্মার্ট ফোন আসক্তি হলো, একটি দুরারোগ্য ব্যাধির মতো! ক্যানসারের চেয়েও ভয়ংকর! আস্তে আস্তে এই ভবিষ্যৎ জেনারেশনকে গিলে খাচ্ছে। কথাগুলো শুনে সবাই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল। সেই সঙ্গে আনিকার আব্বু-আম্মুও ভয় পেলেন। ছোট কাকু বললেন, কথাগুলো আনিকার সামনেই বললাম, কারণ আনিকা এখন সব কিছু বুঝতে শিখছে! আম্মু বললেন, ঠিক বলেছ! কিন্তু কী করে ওকে বোঝাব যে, স্মার্ট ফোন এত ভয়ংকর! শুনে ছোট কাকু হেসে বললেন, যেখানে আমরা সবাই স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছি, সেখানে ওদের দোষ দিয়ে তো কোনো লাভ হবে না! তাই নিজেদেরই আগে শোধরাতে হবে। ওদের বোঝাতে হবে! আর ওরা তো অনুকরণপ্রিয়! আমাদের কাছ থেকেই তো ওরা শিখছে, নাকি? আনিকার খাওয়া শেষ হলে সে নিজেই প্লেটটি ধুতে গেল। তাই দেখে ছোট কাকু বললেন, আনিকার কত্ত বুদ্ধি হয়েছে সে নিজের প্লেট নিজেই ধুতে পারে। শুনে আনিকাও মিষ্টি হাসল। আর বলল, আমি তো সব কাজ নিজেই করি। ছোট কাকু বললেন, তাই?

হ্যাঁ নিজের জামাকাপড়ও ধুতে পারি! আনিকা তার নিজের রুমে চলে গেল। ছোট কাকু আনিকার আব্বু-আম্মুকে সব কিছু বুঝিয়ে বললেন, সেই সঙ্গে নিজেদেরও সাবধানে ফোন ব্যবহার করতে বললেন। বিছানার আশপাশে স্মার্ট ফোন রাখতে নিষেধ করলেন। আনিকাকে বেশি বেশি সময় দিতে বললেন। সেই সঙ্গে বললেন, একটি স্মার্ট ফোন আমাদের ছেলে মেয়েদের বিচ্ছিন্ন করবে, ছিনিয়ে নিবে! পিতা-মাতার কাছ থেকে দূরে রাখবে? এটা তো হতে পারে না! আমাদের এক্ষুনি এটার প্রতিকার করতে হবে, না হলে আমরা আমাদের সন্তানদের চিরতরে হারিয়ে ফেলব! কথাগুলো মনে রেখ! পরদিন বিকেল ছোট কাকু আনিকাকে নিয়ে ঘুরতে গেলেন। কাকু যে কয়েকদিন ছিলেন আনিকাকে বেশি বেশি সময় দিলেন। আম্মু ছোট কাকুকে বললেন, জানো! আনিকা এই কদিনে একবারও স্মার্ট ফোন চায়নি। সে স্মার্ট ফোনের কথা ভুলতে বসেছে। এখন আনিকা পড়াশোনা য় ভীষণ মনোযোগী হয়ে উঠেছে! আনিকার ম্যাডামও ফোন করে বললেন, আনিকা নাকি এখন ক্লাসে সব থেকে ভালো করছে। ছোট কাকু হেসে বললেন, এমনটাই তো হওয়া উচিত! শিশুদের প্রতি ভালোবাসাই পারে ওদের প্রকৃত মানুষ করতে! ভালোবাসার চেয়ে বড় আসক্তি আর তো কিছুই নেই!

 

"