দুজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

আলমগীর কবির

কী সুন্দর গ্রাম। এত ফুল, এত পাখি, এত প্রজাপতি। ধানখেতে চপল হাওয়ার ঢেউ! দেখে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় রাসেল। এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে ও দাদুবাড়িতে বেড়াতে এসেছে। সঙ্গে এসেছে তার বাবা-মা আর ছোট বোনটি। চাচাতো ভাই আবীর সোহাগ বাবুর সঙ্গে সারা দিন হইচই করে কাটাচ্ছে সে। আহা! কী আনন্দ। এর মধ্যে মজার মজার পরিকল্পনা করে ফেলেছে ওরা। ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হবে। আগামীকাল লাটাই ঘুড়ি সংগ্রহের অভিযানে নামবে ওরা। আজ সকালে মারবেল খেলেছে, ডাংগুলি খেলেছে। এই খেলাগুলোর মাঝে এতো আনন্দ আছে রাসেল আগে জানত না। তারপর নদীর কিনারে পায়ে হাঁটা পথ ধরে হেঁটে এসেছে এতদূর। প্রকৃতির শোভা দেখে বারে বারে মুগ্ধ হচ্ছে রাসেল। অনেকদিন পর গ্রামে এসে সে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। খানিক পরেই সন্ধ্যা নামবে। চল এবার বাসায় ফেরা যাক। সোহাগ বললো রাসেলকে। কালকে আবার এখানে আসব। কী বলিস? রাসেল বললো। না, কালকে আবার অন্য জায়গায় যাবো আমরা। অন্য অনেক পরিকল্পনা আছে আমাদের। তোর ভালো লাগবে। ঠিক আছে , চল। বাড়ি ফিরি এবার। চল। যেতে যেতে তোকে বলছি সব। বাড়ি ফিরতে সন্ধে পার হয়ে গেল। বাড়িতেও এক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রথম দিনেই রাসেলের দাদি পিঠা তৈরি করেছেন। নানা স্বাদের পিঠা। খাওয়া দাওয়ার পরে বারান্দায় দাদি শীতলপাটি বিছিয়ে দিয়েছেন। ছোটরা দাদুকে ঘিরে বসেছে। দাদুর কাছে গল্প কোনো চাই। দাদু এতো এতো গল্প জানেন। আবির বললো, দাদু গা ছমছম ভূতের গল্প বলো। বাবু বললো, না দাদু ভূতের গল্প না, রাজা-রানির গল্প বলো। আবির বললো, ভিতু কোথাকার। সোহাগ বললো, আরে ও তো বয়সে সবার ছোট। ভূতের গল্পে ভয় পেতেই পারে। দাদু তুমি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প কোনোাও। সবাই বলল, বেশ বেশ, তাই হোক। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। দাদু বলতে শুরু করেন, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দলে একজন কিশোর যোদ্ধা ছিলো। তোমাদের বয়সি। আজকে আমি তার গল্প কোনোাবো। ছেলেটি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল। নাম সাদিক। সাদিকুল ইসলাম। তোমরা জানো যুদ্ধে আমার হাতে গুলি লেগেছিল। সমুখ যুদ্ধ ছিলো সেদিন। হানাদারের দল আমাদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না কিছুতেই। পিছু হটছিল ওরা। হঠাৎ একটি গুলি আমার হাতে এসে লাগে। ভীষণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম। সাদিক দেখতে পেয়েছিল। হানাদারদের গুলি করতে করতে আমাকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে আসে। ডাক্তারের কাছেও নিয়ে গিয়েছিল সে। আমার জ্ঞান ছিলো না, পরে জেনেছিলাম সেটা। রাসেল বললো, তিনি তো তাহলে খুব সাহসী ছিলেন। দাদু বললেন, তা তো বটেই। আসলে হানাদার বাহিনী আমাদের সাহসের কাছেই হেরে গিয়েছিলো। যুদ্ধে সাহস খুবই মূল্যবান অস্ত্র। আচ্ছা তোমরা কি সাদিককে দেখতে চাও। পাশের গ্রামে থাকে সে। রাসেল বললো, সত্যি বলছো দাদু। আমরা সবাই একবাক্যে রাজি। আমারও খুব ভালো লাগবে। দাদু বললেন, ঠিক আছে তাহলে কালকে তোমাদের নিয়ে যাবো। পরদিন বিকেল বেলা দাদু নিয়ে গেলেন পাশের গ্র ামে। তার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর বাড়ি। উনার বয়স হয়েছে। কিন্তু এখনো বেশ পরিশ্রম করেন। ছেলের মুদিখানা আছে, সেখানে বসেন। ফলের বাগান আছে, দেখাশোনা করেন। এভাবেই তিনি সময় কাটান। মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি নামের তালিকায় দাদু এবং দাদুর বন্ধুর নাম নেই। এটা জানতে পেরে খুব কষ্ট পেলো রাসেলরা। সেদিন অনেক গল্প হলো। ভালো কাটলো সময়টা। বাড়ি ফেরার পথে রাসেল একা একা ভাবছিলো। অর্থ যশ-খ্যাতির জন্য তারা মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তাই এখন তা পাওয়ার চেষ্টাও করেন না। দুজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভালোবাসা, আদর, স্নেহ পেয়ে ওদের মন ভরে গেল। এমন সূর্যসন্তান আছে বাংলা মায়ের, যারা সুখে-দুঃখে দেশকে বুকে আগলে রাখেন।

 

"