বই পড়ার অভ্যাস

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

ফারুক হোসেন সজীব
ama ami

এই তো কিছুদিন আগের কথাই যদি বলি তোহা কিছুতেই বই পড়তে পছন্দ করত না! আর কী করেইবা পছন্দ করবে বল, আধুনিক ভার্চুয়াল জগতে সবাই তো ভিডিও গেমস, ইনডোর খেলাগুলো নিয়ে সময় কাটাচ্ছে, তাহলে তোহাইবা বাদ যাবে কেন? তাই সেও সারাক্ষণ ভিডিও গেমস খেলায় মেতে থাকত।

তোহার আব্বু-আম্মু ভাবেন, কই আগে তো তোহা এমন ছিল না? রোজ সন্ধ্যায় সে পড়তে বসত, দুপুরে সে ঘুমাত, আবার সকাল-সকাল ঘুম থেকেও উঠত। হঠাৎ এই ভিডিও গেমস আর ওই ইনডোর খেলাগুলো খেলে খেলেই তার এমন হচ্ছে। এখন তো তোহা আর খেলাধুলাও করতে যায় না। এভাবে চলতে থাকলে যে ওর শরীরের গঠনও পরিবর্তন হয়ে যাবে, যাকে বলে অতিকায়-স্থূল!

তোহার আব্বু-আম্মু অবশ্য অনেক সচেতন। তাই দুজনে প্ল্যান করলেন, তোহাকে নিয়ে এখানে-ওখানে তারা রোজ ঘুরতে যাবেন। হলোও তাই! অবশ্য এমন ঘোরাঘুরিতে কিছুটা কাজ হলো!

কিন্তু তোহা বলে ভিন্ন কথা, তার নাকি ঘোরাঘুরি করতে একটুও ভালো লাগে না! আসলে তোহার আব্বুও চায় না এত মানুষজন ভিড় বাট্টার মাঝে ঘোরাঘুরি করতে। তাছাড়া চারদিকে পরিবেশ এত দূষিত হচ্ছে যে কী বলব!

তোহার আম্মু বলেন, তাহলে?

তাহলে আর কী তোহার সঙ্গে কথা বলতে হবে! আসলে তোহাকে ওই গেমস যে আনন্দ দিচ্ছে, অন্য কোথাও তো সে সেই আনন্দ পাচ্ছে না! তাই এমন হচ্ছে, বারবার তোহা ফিরে যাচ্ছে তার গেমস্ খেলার টানে! এটাই তো স্বাভাবিক নাকি?

আম্মু সব শুনে ভীষণ চিন্তিত হয়ে তোহার রুমের দিকে গিয়ে দেখলেন, তোহা সেই আগের মতোই বিছানায় শুয়ে শুয়ে গেমস খেলছে। কিন্তু তিনি মোবাইল কেড়ে নিতেও পারছেন না! কারণ এভাবে মোবাইল কেড়ে নেওয়া তো এক ধরনের অভদ্রতা। এতে শিশুদের মনও বিগড়ে যেতে পারে। এমনিতেই এই কদিন তোহা তাদের ইচ্ছাতেই এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছে।

কিন্তু এভাবে গেমস খেলতে থাকলে তো ওর ভবিষ্যৎ জীবনও বিপন্ন হতে বেশি সময় লাগবে না। চারদিকে শিশুদের এত্ত এত্ত পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতা চলছে! তার মাঝে এই ইনডোর গেমসগুলো শিশুদের কর্মক্ষমতাকেও হ্রাস করে ফেলছে। আম্মু মৃদু পায়ে তোহার রুমে প্রবেশ করে তোহাকে বললেন, তোহা তুমি কি ভীষণ বিজি?

তোহা একবার মুখ তুলে তাকাল। তারপর আবার গেমস খেলায় মন দিতে দিতে বলল, কিছু বলবে আম্মু?

তোমার সঙ্গে আমার কথা ছিল যে...?

কী বলবে বলে ফেল! বেশ ভালো স্কোর করে ফেলেছি ইতোমধ্যেই! খুব এক্সাইটেড আমি!

আম্মু আমতা আমতা করে বলেন, আচ্ছা তোহা ! আমরা কদিন আগে যে বাণিজ্য মেলায় ঘুরতে গেলাম তোমার কেমন লাগল কিছুই তো বললে না আমাকে?

ও! এই কথা, বেশ ভালোই তো! সামনের বারেও কিন্তু যাব!

আম্মু দেখল, তোহা একটু হলেও আগ্রহ দেখাচ্ছে। তার মানে এভাবেই ওকে...!

তুমি কি জান বইমেলা শুরু হয়েছে?

হ্যাঁ, আম্মু জানি তো?

তুমি যাবে না?

তোহা অবাক হয়ে বলল, তোমরা নিয়ে গেলে অবশ্যই যাব! তাহলে কাল তিনটের দিকেই আমরা যাচ্ছি! তুমি কী বল?

তোহা একটু হেসে বলল, তাই? ঠিক আছে আমি স্কুল থেকে এসে খেয়েদেয়ে রেডি হয়ে থাকব।

আম্মু অনেক হাসিখুশি মন নিয়ে তোহার আব্বুর কাছে গিয়ে সবকিছু খুলে বললেন।

সব শুনে আব্বু বললেন, বেশ ভালো করেছ? তাহলে আমরা কিন্তু কাল যাচ্ছি!

তোহা আব্বু-আম্মুর সঙ্গে বইমেলার ফটকে এসেই অবাক হয়ে গেল। চারদিকটা এত সুন্দর করে সাজানো, অপূর্ব। স্টলগুলোতে থরে থরে বই সাজানো। চারদিকে কী এক অদ্ভুত ম-ম গন্ধ বিরাজ করছে। কারো মনেই যেন কোনো দুঃখ নেই। সবাই হাসিখুশি।

তোহা আব্বু-আম্মুর সঙ্গে শিশুতোষ বইয়ের স্টলগুলোতে গিয়ে তো অবাক! এত্ত এত্ত বই তোহা যেন জীবনে দেখেনি। তার বয়সী শিশুরাও নানা বই কেনার জন্য আবদার করছে। তোহা অবাক হয়ে আম্মুকে বলল, আমাকেও কিনে দাও আম্মু!

আব্বু কিছুটা উপহাস করে বলল, সে কী! তুমি বই কিনে কী করবে? তুমি তো আর বই পড়বেও না! শুধু শুধু টাকাগুলো নষ্ট হবে।

আব্বু কথাটি যেন একটু জোরেই বললেন, যেন অন্যরা শুনতে পায়। তার বয়সী একজন তো তোহার দিকে তাকিয়েই কী অদ্ভুতভাবেই না হাসল! তাই দেখে তোহা বলল, কী বললে আমি বই পড়ব না! আমি এখন থেকে শুধু বই-ই পড়ব! আর গেমস খেলব না।

আম্মু বললেন, ঠিক তো? প্রমিজ করো?

তোহা আম্মুর হাত ধরে প্রমিজ করল।

তারপর আব্বু তোহাকে যত খুশি মন চায় বই কিনে দিলেন। তারপর থেকে তোহার পুরো জীবনটাই শুরু হলো বই দিয়ে রাঙানো। এখন তোহা তার পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে বই পড়ে। এতে করে তোহার সৃজনশীলতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তোহাকে নিয়ে আব্বু-আম্মুর আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই! দেখলে তো বন্ধরা তোহার বইপড়ার অভ্যেসটা তোহাকে কীভাবে বদলে দিল। তোমরাও হাতের কাছে যা পাবে, তাই পড়বে! পত্রপত্রিকা পড়বে। এতে করে তোমাদের সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে। আর হ্যাঁ কখনো অলস সময় নষ্ট করবে না, কিন্তু মনে থাকে যেন!

 

"