রাজকুমারীর বিয়ে

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আবদুস সালাম

অনেক দিন দিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক রাজা। রাজা ছিল এক সন্তানের পিতা। আর সেই সন্তানটি হলো একজন কন্যা। রাজা কন্যাকে খুব ভালোবাসত। রাজার অবর্তমানে বা মৃত্যুর পর ওই কন্যাই হবে দেশটির ভবিষ্যৎ রানি। এ কারণে রাজ কর্মচারীরাও তাকে একটু বেশি আদর-স্নেহ করত। কীভাবে দেশ শাসন করতে হয়, তা রাজা ছোটবেলা থেকে রাজকুমারীকে শিক্ষা দিত। যাতে দেশ চালাতে তার কোনো সমস্যা না হয়। রাজা ছিল প্রজাবৎসল। সে সব সময় ক্ষুধাপীড়িতদের পাশে থাকত। প্রজাদের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য রাজা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফর করত। সফরসঙ্গী হিসেবে রাজা মন্ত্রীদের পাশাপাশি নিজের কন্যাকেও সঙ্গে রাখত। দেশ শাসনের বিষয়ে রাজকুমারীর অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একসময় দেখতে দেখতে সে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে যায়।

রাজকুমারী প্রায়ই সখীদের নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণে বের হতো। এক দিন রাজকুমারী দেশটির বড় একটা নদীতে প্রমোদ ভ্রমণে বের হয়েছিল। যেতে যেতে তার চোখে পড়ে একটা সারণি। সারণির ওপর ছিল একটা সাঁকো। কয়েকজন বৃদ্ধ বস্তাবোঝাই মালসামানা নিয়ে সেই সাঁকোটি পার হচ্ছিল। এমন সময় একজন সুদর্শন যুবক তাদের সামনে এসে হাজির হয়। সে বৃদ্ধদের মাথা থেকে বস্তাগুলো নামিয়ে নেয়। তারপর সে বস্তাগুলো নিজের মাথায় নিয়ে একে একে বৃদ্ধদের সাঁকোটি পার করে দেয়। সাঁকো পার হওয়ার পর বৃদ্ধরা ও যুবক আপন আপন পথে আনন্দচিত্তে হাঁটতে দিল। যুবকটির কর্মকা-ন্ড রাজকুমারীকে মুগ্ধ করে। তার মনে দাগ কাটে। যুবকের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে। ওই ঘটনার পর একই নদীপথে রাজকুমারী অনেকবার প্রমোদ ভ্রমণ করেছে কিন্তু সেই যুবকের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। এক দিন রাজকুমারী প্রমোদ ভ্রমণের সময় ওই সাঁকোর কাছে এসে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নেমে পড়ে। কিছুদূর যেতে না যেতেই তাদের চোখে পড়ে একটা শহর। শহরটা দেখার উদ্দেশ্যে রাজকুমারী সঙ্গীদের নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে থাকে। এমন সময় হঠাৎ সে দেখে শহরের রাজপথে সেই সুদর্শন যুবককে চিঠি বিলি করতে। খুব কাছ থেকে যুবককে দেখে তার খুব পছন্দ হয়। তার ইচ্ছা করছিল যুবকটির সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু সে যুবকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেল না। যুবকটির প্রতি তার মায়া হলো। কিন্তু সে কারোর কাছে তা প্রকাশ করল না।

ওদিকে রাজারও শরীরটা ভালো যায় না। প্রায় সময় অসুস্থ থাকে। রাজা মনস্থির করল শিগগিরই দেশের সুযোগ্য পাত্রের সঙ্গে রাজকুমারীকে বিয়ে দেবে। এক দিন রাজা সুযোগমতো রাজকুমারীর সামনে তার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করল। সেই সঙ্গে এও বলল যে, তোমার কোনো পছন্দ থাকলে আমাকে নির্ভয়ে বলতে পার। রাজা অভয় দিলে রাজকুমারী নির্ভয়ে রাজার সামনে সেই যুবকের বর্ণনা দেয়। তারপর বলে, ‘বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে ওই যুবককেই বিয়ে করব। তাছাড়া এ মুহূর্তে অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করার ইচ্ছা আমার নেই। আপনার যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে ওই যুবককে খুঁজে বের করেন। বেশ তাই হবে। তবে তার আগে আমি যুবককে পরীক্ষা করে দেখব তোমাকে বিয়ে করার মতো তার ন্যূনতম যোগ্যতা আছে কি না। যদি থাকে তাহলে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।’ রাজা এসব কথা বলে রাজকুমারীকে আশ্বস্ত করল। রাজা জানে যে তার কন্যা খুব জেদী। সে মুখে যা বলে তাই করে। রাজা মনে মনে এও বলল যে, রাজকুমারী যেহেতু শর্তসাপেক্ষে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, তাই সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে দেশের জন্য মঙ্গল হবে। কিন্তু ওই যুবকের নাম-ঠিকানা কারোর জানা ছিল না। তাই রাজা একটু ঘাবড়ে গেল যুবককে খুঁজে বের করতে পারবে কি না ভেবে। রাজা যুবককে খুঁজে বের করার জন্য একটা পরিকল্পনা করল। পরিকল্পনা মোতাবেক রাজা রাজপ্রাসাদে স্বয়ংবর সভার আয়োজন করে। রাজকুমারী যে এলাকায় যুবকটিকে দেখেছে, সেই নির্দিষ্ট এলাকার পার্শ্বস্থ গ্রাম-শহরের সব যুবকের স্বয়ংবর সভায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। রাজার উদ্দেশ্য সব যুবক যাতে রাজার আমন্ত্রণে অংশগ্রহণ করে। রাজার বিশ্বাস সব যুবক স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হবে। রাজার লোকজনরা নির্দিষ্ট এলাকার লোকজনের কানে পৌঁছে দিল স্বয়ংবর সভার খবরটি। তখন লোকজনরা বলাবলি করতে থাকে যে, যুবকদের মধ্যে রাজকুমারী যাকে পছন্দ করবে, তাকে সে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেবে। আর তার সঙ্গে রাজা রাজকুমারীকে বিয়ে দেবে।

স্বয়ংবর সভা উপলক্ষে মেজবানির আয়োজন করা হয়। নির্দিষ্ট দিনে স্বয়ংবর সভায় শত শত পাণিপ্রার্থী রাজপ্রাসাদে এসে দরবার হলে আসন গ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, উজির ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীও উপস্থিত হয়। রাজা যথাসময় রাজকুমারীকে নিয়ে দরবার হলে হাজির হন। সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে রাজকুমারীর পছন্দের পাত্রকে দেখার জন্য। কে হবে সেই ভাগ্যবান? রাজকুমারী উপস্থিত সব পাণিপ্রার্থীকে একনজর দেখে নেয়। রাজকুমারী তার কাক্সিক্ষত যুবককে দেখতে পায় না। তাই সে মৌনাবলম্বন করে। সভা শেষে সে রাজাকে জানিয়ে দেয়, আমি যাকে পছন্দ করেছি সেই যুবক সভায় আসেনি। তাই উপস্থিত পাত্রদের মধ্যে থেকে কাউকে আমার পক্ষে বরণ করা সম্ভব হয়নি। রাজকুমারীর মতামত জানার পর রাজা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন যেভাবেই হোক সে ওই যুবককে খুঁজে বের করবেন। নইলে রাজকুমারী চিরকুমারী থাকবে। রাজার আদেশ অমান্য করার জন্য সেই যুবকের প্রতি রাজা মনে মনে ক্ষুব্ধ হলো ঠিকই কিন্তু প্রকাশ করল না। কারণ সে হলো তার ভাবী জামাতা। রাজা রাজকর্মচারীদের হুকুম দিলেন যেভাবেই হোক আগামী দুই দিনের মধ্যে সেই যুবককে খুঁজে বের করতে হবে। রাজকুমারীর মুখে যুবকের বর্ণনা শুনে রাজকর্মচারীরা যুবককে খোঁজার জন্য বেরিয়ে পড়ে। অবশেষে তারা মহিনীপাড়া গ্রামে সেই যুবককে খুঁজে পেল। সমাদরে ওই যুবককে রাজপ্রাসাদে হাজির করা হলো। রাজকুমারী এবার রাজাকে জানায় যে, যাকে প্রাসাদে আনা হয়েছে উনিই আমার পছন্দের পাত্র। রাজা শুনে খুশি হয়। রাজা যুবকের সঙ্গে কথা বলে তার নাম-পরিচয়, ধর্ম, বংশ, শিক্ষাদীক্ষা সবকিছু জেনে নেন। রাজা জানতে পারেন ছেলেটির নাম আহনাফ আবরার মাহির। সে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠের একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। চিঠি বিলি করার কারণ জানতে চাইলে মাহির বলে, আমার বাবা একজন ডাকপিয়ন। আমি সময় পেলে বাবার কাজটি করে দিই। যাতে বাবার কষ্ট কিছুটা হলে লাঘব হয়। বাবা ডাকপিয়নের কাজ করে আমাদের মানুষ করেছে। তাই বাবার কাজকে আমি শ্রদ্ধা করি। কোনো কাজকে ছোট মনে করি না। বাবা আমাদের গর্ব। রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করল, আমার আমন্ত্রণে সাড়া না দেওয়ার কারণ কী? উত্তরে সে সুস্পষ্টভাবে জানায় যে, আমি একজন সাধারণ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাজার কন্যাকে বিয়ে করার মতো যোগ্যতা আমার নেই। তাছাড়া আমি মনে করি, রাজার কন্যাকে বিয়ে করার অর্থ হলো তার অধীনতা মেনে নেওয়া। আমি স্বাধীনচেতা। স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পছন্দ করি। আমি স্ত্রৈণ হয়ে থাকতে চাই না। রাজকুমারীকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। এ কারণে স্বয়ংবরা সভায় যোগদান করিনি।

সত্য কথা বলার সাহস দেখে রাজা বুঝতে পারল যে, যুবকটি কোনো সাধারণ যুবক নয়। যদিও রাজকুমারী মুগ্ধ হয়েছে তার রূপের জৌলুস দেখে আর রাজা মুগ্ধ হয়েছে তার অসামান্য গুণের কারণে। ধনসম্পদ, রাজক্ষমতা ও আভিজাত্যের প্রতি যুবকটির কোনো লোভ নেই। রাজার বিবেচনায় মাহির একজন সৎ, সাহসী, সুদর্শন, শিক্ষিত, বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ যুবক। রাজকুমারী মাহির উপযুক্ত পাত্র। কিন্তু দুঃখের বিষয় মাহির এখনো রাজকুমারীকে বিয়ে করতে রাজি নয়। সব ঘটনা শুনে রাজকুমারী মাহিরের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করে। রাজকুমারী মাহিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলে, ‘আমি স্বেচ্ছায় আপনাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। আপনার মতো যোগ্য ব্যক্তিকে স্বামী হিসেবে পেলে আমার জীবন ধন্য হবে। এতে আপনার কোনো অমর্যাদা হবে না। এর জন্য আপনি যা শর্ত দেবেন, তাই মেনে নেব।’ রাজকুমারীর কথায় মাহির মুগ্ধ হয়। সবদিক বিবেচনা করে মাহির রাজকুমারীকে বিয়ে করতে সম্মত হয়। অবশেষে রাজা মহা ধুমধামে মাহিরের সঙ্গে রাজকুমারীকে বিয়ে দেন।

 

"