গাছবিজয়ী মুমু

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

শাম্মী তুলতুল

মুমুর খুব মন খারাপ। ছোট মামা বিদেশে চলে যাওয়াতে মনমরা হয়ে আছে। তার একমাত্র খেলার সাথি ছোট মামা। স্কুল থেকে ফেরার পরই খাওয়া-দাওয়া আর বাড়ির কাজ শেষ করে সন্ধ্যার পরপর মামার সঙ্গে খেলতে বসে। এক বসাতেই তার রাত ১০টা। মামার সঙ্গে সে সারা দিন গেমস খেলে নয়তো ব্যাটমিন্টন খেলে। নয়তো বেড়াতে যায় পার্কে অথবা মেলায়। মুমুদের বাড়ির পাশেই একটি পার্ক রয়েছে। সেখানে প্রতি বছর বৃক্ষমেলা হয়। মামা তাকে সেই বৃক্ষমেলাতে নিয়ে যেত। বৃক্ষমেলা থেকে অনেক ফুলের গাছও কিনে দিত। সেই থেকে মুমু হয়ে উঠে বৃক্ষপ্রেমী। যখন তার মন খারাপ হয়, তখন সে গাছের সঙ্গে কথা বলে। মামা বলেছেন, গাছও আমাদের ভাষা বোঝে। তাদেরও দুঃখ আছে। কষ্ট আছে। তারাও কাঁদে।

সেটা কেমন জানতে চাইলে মামা বলেন, চারপাশে দেখবে মানুষ শত শত গাছ কেটে ফেলছে। তুমি কি দেখেছো কখনো গাছ কেটে ফেলতে?

হ্যাঁ আমাদের পাশের আনিস কাকাই তো সেদিন কৃষ্ণচূড়া ফুলের গাছ কেটে ফেলেছিল। তা হলে সেই গাছও কি কেঁদেছিল মামা?

অবশ্যই কেঁদেছিল।

কিন্তু তারা তো কথা বলতে পারে না মামা। বুঝব কী করে?

তুমি যখন দিন-রাত গাছ নিয়ে গবেষণা করবে, জানতে চাইবে, শিখতে চাইবে; তখন নিজেই তা অনুভব করতে পারবে।

তাই বুঝি?

হুম। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, বাতাস দেয়, ছায়া দেয়। আমাদের জীবিকাও নির্বাহ করে। গাছ বিক্রি মানুষ অনেক টাকা লাভ করে। গাছের ফলফুল বিক্রি করে বিক্রেতা টাকা আয় করে। তাদের ঘর চলে। কিন্তু গাছের যতœ না নিলে অযথা গাছ কেটে ফেললে তাতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়। তুমি দেখবে তোমার গাছগুলোর যদি অযতœ করো এগুলো বিমর্ষ হয়ে যাবে। ঝিমিয়ে পড়বে।

ঠিক বলেছ। পানি না দিলে ওরা কেমন জানি হয়ে যায়।

ঠিক, পানি ওদের খাদ্য। আমাদের যেমন খাবার না খেলে শরীর খারাপ করে; তেমনি ওরাও খাবার না পেলে রাগ করে, শরীর খারাপ হয়ে যায়। তাই মানুষের মতো ওদেরও যতœ নিতে হয়। তাই মন খারাপ হলে ওদের সঙ্গে গপ্পো করবে, দেখবে তোমারও মন ভালো হবে, ওদেরও মন ভালো হয়ে যাবে। ছোট মামার প্রতিটি কথা সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। আজও মন খারাপ হওয়াতে মুমু বাগানবিলাস গাছের সামনে বসে রইল। পাতাগুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছিল। এমন সময় পাতাগুলো নড়ে উঠল। যেন তাকে আদর করে দিল। মুমু খুশি হয়ে গেল। বলল, তোমরা কত ভালো। পাতাগুলো আবার নড়ে উঠল। মুমু আনন্দে হেসে দিল।

প্রতি বছর তাদের বাড়ির সামনের পার্কটিতে বৃক্ষমেলার সঙ্গে সঙ্গে বৃক্ষ প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতাও হয়। এখানে ছোট-বড় সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে। স্কুলের ক্লাস শিক্ষিকা ছাত্রছাত্রী সবাইকে বলল, তোমরা যারা গাছ ভালোবাসা, বাগান করতে ভালোবাসো সবাই বৃক্ষ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতে পারো। তাই আজ স্কুল ছুটির পর নাম দিয়ে আসবে। নয়তো অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

মুমু শুনে মহাখুশি। স্কুল থেকে ফেরার পথে মায়ের সঙ্গে নাম দিয়ে ঘরে ফিরল। মেয়ের এমন আগ্রহ দেখে খুব খুশি হলো মা। প্রদর্শনীর দিন খুব সুন্দর করে মুমুকে তৈরি করে দিলেন মা। মুমু তার বাগানবিলাস ফুলের টব নিয়ে মায়ের সঙ্গে রওনা দিল বৃক্ষমেলায়। গিয়ে চারপাশ দেখেই মুমু চমকে গেল। চোখ বড় বড় করে সবার গাছ দেখতে লাগল। হরেকরকম ফুল আর ফলের গাছ নিয়ে অনেক মানুষ হাজির। খুব সুন্দর লাগছে চারপাশ। চারপাশ সবুজ আর সবুজে ঘেরা। মুমুকে দেখে সবাই তার সঙ্গে পরিচয় হতে লাগল। এতটুকুন মেয়ের গাছপ্রীতি দেখে সবাই বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মুমুর দিকে। মুমুর ফুলের গাছ দেখে পরিদর্শক বললেন, বাহ তোমার গাছ দেখি খুব তরতাজা। পাতাগুলোও খুব পরিষ্কার।

মুমু বলল, আমি রোজ আমার গাছের যতœ নিই। তাদের খেয়াল রাখি।

বাহ, কে শিখিয়েছে এমন?

আমার ছোট মামা শিখিয়েছেন। গাছ আমাদের অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করে। তাই আমরা যেন বিনা কারণে গাছ না কাটি, তাও শিখিয়েছেন তিনি।

পরিদর্শক মুমুর কথায় খুব অবাক হলেন। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, তোমাকে নিয়ে আমরা গর্বিত। যা আমরা জানি না বুঝেও পালন করি না তা আমাদের শিখিয়ে দিলে তুমি। তোমার ছোট মামাকেও ধন্যবাদ বাচ্চাদের এভাবে শিক্ষা দেওয়ার জন্য।

কথা শেষ হলে পরিদর্শক মাইক হাতে নিয়ে স্টেজে গেলেন। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী প্রথম স্থান অর্জনকারীর নাম ঘোষণা করলেন। প্রথম যে হলো সে আর কেউ নয় আমাদের ছোট্ট মুমু। নাম শুনে মুমুর মায়ের মাথা গর্বে উঁচু হয়ে গেল। তিনি মনে মনে বললেন, যা আমি পারিনি, তা আমার মেয়ে করে দেখাল।

 

"