বন্ধুর অবদান

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

হুমায়ুন আবিদ
ama ami

সুজন সাহেব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার এক ছেলে আবু সাইম এক মেয়ে ইসরাত জাহান রুমী এবং স্ত্রী জান্নাতকে নিয়ে সুখের সংসার। চাকরিজনিত কারণে সুজন সাহেবকে প্রায় সময়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে হয়। সুজন সাহেবের অবর্তমানে স্ত্রী জান্নাত বেগম সংসারের সবকিছুর দেখভাল করে আসছে সেই বিয়ের পর থেকে। সুজন সাহেব সব সময় চেষ্টা করেন স্ত্রী সন্তানদের সব ধরনের চাহিদা সুন্দরভাবে পূরণ করতে। সুজন সাহেব বেতন পেয়েই নিজের হাত খরচের টাকাটা রেখে বাকি টাকা স্ত্রী জান্নাত বেগমের হাতে তুলে দেন। সুজন সাহেবের কাছে ছেলেমেয়েরা যখন যা কিছু চেয়েছে, তা কখনো অপূর্ণ রাখেনি। যেভাবেই হোক তাদের চাহিদা পূরণ করেছে। কারণ সুজন সাহেবরা ছিলেন পাঁচ ভাই তিন বোন। বাবা সামান্য আয়ের চাকরি করতেন। তাই জীবনে অনেক কষ্ট করে তাদের মানুষ হতে হয়েছে। এ জন্য নিজের শৈশবের কষ্টটাকে অনুধাবন করে ছেলেমেয়েদের সব চাহিদা পূরণ করেছেন দ্বিধাহীনভাবে।

আবু সাইম ছোটবেলা থেকেই পড়া শোনায় বেশ ভালো। সব সময় ক্লাসে প্রথম হয়ে আসছে। পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে ভিত্তি পেয়েছে। ক্লাস এইটেও সাধারণ গ্রেডে ভিত্তি পেয়েছে। সাইমকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনের নির্দেশনা আসে। সাইমের বন্ধুরা সাইমকে স্টুডেন্ড কেবিনেট নির্বাচন করার জন্য অনুরোধ করে। বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সাইম বিষয়টি নিয়ে তার বাবা, মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে। সাইমের বাবা-মা স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনের খারাপ কোনো কিছু দেখতে না পেয়ে সাইমকে বলল, নির্বাচন করতে পারো অসুবিধা নেই। তবে পড়াশোনার যেন কোনো বিঘœ না ঘটে।

সাইমের ক্লাসে নাফিস নামে একজন নামকরা ধনী লোকের ছেলে ছিল। তার আজে-বাজে বন্ধু-বান্ধবের অভাব ছিল না। পড়াশোনাতে মোটেও ভালো ছিল না। এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে ওঠার জন্য প্রতিবারই তার বাবা-মায়ের এসে রিকুয়েস্ট করতে হতো। নাফিস সারা দিন বন্ধু-বান্ধদের নিয়ে আড্ডা আর ঘুরাফেরায় মেতে থাকত। স্কুল-শিক্ষকরাও নাফিসকে তেমন কিছু বলত না। নাফিস প্রতিদিন বাইকে নিয়ে যখন খুশি স্কুলে আসত আবার যখন খুশি স্কুল থেকে চলে যেত।

স্কুলে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনের কথা শুনে নাফিসের বন্ধুরা নাফিসকে বলল, স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে। নাফিস তার বন্ধুদের বলল, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা তো কোনো সমস্যা না, সমস্যা হলো সাইম যদি নির্বাচন করে তবে তো তার ধারের কাছেই থাকা যাবে না পাস তো দূরের কথা। সাইম ভালো ছাত্র, স্যারদের সুনজরে আছে, তা ছাড়া সবাই তাকে অনেক পছন্দ করে।

নাফিসের বন্ধুরা বলল, সাইমকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো রাস্তা নেই। নাফিস বলল, সাইমকে যদি ভয় দেখায় পরে যদি আবার স্যারদের কাছে সব বলে দেয় তবে তো হিতে বিপরীত হবে। নাফিসের বন্ধুরা বলল, তাহলে উপায়! নাফিস তার বন্ধুদের বলল, তাকে এমনি ভালোভাবে জিজ্ঞেস করে দেখি সে কি বলে। পরের দিন সাইম স্কুলে আসলে নাফিস তাকে ডেকে নিয়ে বলল, তুই ভালো ছাত্র, তোর প্রতি তোর মা-বাবার অনেক আশা-ভরসা, এসব নির্বাচন করে তোর মা-বাবার স্বপ্নকে নষ্ট করে দিস না ভাই। তাই বলছি, তুই স্কুল কেবিনেট নির্বাচন থেকে সরে আয় আমি নির্বাচন করব। তুই তো জানিস আমার বন্ধুরা কত খারাপ আমি চাই না তারা তোর সঙ্গে এই ব্যাপার নিয়ে খারাপ আচরণ করুক।

সাইম-নাফিসের কথা শুনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিল। সবাই কারণ জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বলল, এসব আমার ভালো লাগে না। পরে বন্ধুদের অনুরোধ আর স্যারদের নির্দেশ অমান্য করার মতো দুঃসাহস দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে আসতে পারেনি। সাইমকে স্কুল কেবিনেট নির্বাচনে দাঁড়াতেই হলো। পরে স্কুল কেবিনেট নির্বাচনে সাইম বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাফিস এবং তার বন্ধুদের মনে বিরাট ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে একদিন বিকেলবেলা স্কুল মাঠে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে সাইমের বন্ধুদের সঙ্গে নাফিসের বন্ধুদের মারাত্মক মারামারি হয়। এতে সাইমসহ তার বন্ধুরা মারাত্মক আহত হন। নাফিসসহ তার বন্ধুরা সামান্য আহত হলেও সাইমদের মতো এত মারাত্মক অবস্থা হয়নি। এই মারামারির বিষয় নিয়ে দুই গ্রুপের অভিভাবকরা স্কুল কমিটির কাছে নালিশ করে। দুই পক্ষের নালিশের পরিপ্রেক্ষিতে স্কুল কমিটি উভয় পক্ষের অভিভাবকদের ডেকে বিষয়টি মীমাংসার জন্য বসে। বিচারে সবার সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নাফিস এবং তার বন্ধুরা দোষী প্রমাণিত হয় এবং এই মারামারি ইন্ধনদাতা হিসেবে নাফিসের নাম উঠে আসে। স্কুল কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক নাফিসকে বিশটি বেত্রাঘাত করে সবার কাছে করজোরে মাফ চাওয়ানো হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ নাফিসের অভিভাবকদের সতর্ক করে বলে দেয়, নাফিস যদি ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় তাহলে তাকে টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে।

নাফিসের বাবা বাসায় গিয়ে নাফিসের মাকে বলল, এই ছেলে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। যেখানে যাবে সেখানেই একটা অঘটন ঘটিয়ে আসবে আর আমার মানসম্মান নিয়ে খেলা করবে। আজকের পর থেকে যদি তোমার ছেলের নামে কোনো অভিযোগ শুনি তবে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেব।

নাফিস বাড়িতে এলে নাফিসের মা বলল, তোর জন্য আর কত অপমাণিত হতে হবে। আমাদের উঁচু মাথা আর কত ছোট করতে চাস। হাসিব কত ভদ্র ছেলে, পড়াশোনায়।

"