শীতের দিনে

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মো. জাহাঙ্গীর আলম

সাকিব ও রাকিব দুই বন্ধু এবার সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। সাকিব অনেক ধনী পরিবারের ছেলে। তার বাবা একজন কলেজের প্রিন্সিপাল আর মা হলেন সেই কলেজের প্রভাষক। কিন্তু রাকিব অতি দরিদ্র পরিবারের ছেলে। তার বাবা জন্মের আগেই মারা যান। রাকিবের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে অনেক কষ্টে লেখাপড়া করায়। কিন্তু ঠিকমতো লেখাপড়ার খরচ দিতে পারে না। পারে না ভালো কাপড় চোপড় কিনে দিতে। রাকিব অনেক ভালো ছাত্র বরাবর ক্লাসের ফাস্ট বয়। আর সাকিবও খারাপ ছাত্র নয়। সাকিব সেকেন্ড বয়। সাকিব কোনোভাবেই রাকিবকে টপকাতে পারে না।

আজ খুব শীত পরেছে। শীতের দমকা হাওয়া বইছে। প্রতিদিনের মতো সাকিব স্কুলে গেল। ক্লাস শুরু হচ্ছে তবু আজ কেন জানি রাকিবকে দেখতে পাচ্ছি না। সাকিব শুধু বারবার জানালার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু রাকিবকে তো দেখা যাচ্ছে। বাংলা শিক্ষক আবু তাহের সাহেব রোল কল করছেন। রোল নম্বর এক। কোনো উত্তর নেই। স্যার বলছেন, রাকিবের আজ কী হলো। সে তো স্কুল ফাঁকি দেওয়া ছাত্র নয়। সে তো আমাদের স্কুলের অহংকার। কিন্তু আজ তার আবার কী হলো। সাকিব স্যার রাকিব আমার প্রিয় বন্ধু। কিন্তু আজকে যে কেন এলো না। আমি বুঝতে পাচ্ছি না।

ক্লাস শেষ হলো স্কুল ছুটি হলো। সাকিব আজ বাসায় না দিয়ে রাকিবের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু রাকিবের বাড়ি কোনটা সাকিবের অচেনা। রাকিবের বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে একজনকে বলল, আচ্ছা রাকিব নামে একটা ছেলে আব্দুল হামিদ স্কুলে পড়ে মরহুম আব্দুর রহমানের ছেলে তার বাড়ি কোনটা বলতে পারেন? লোকটা বলল হ্যাঁ, ওই বাঁশ আড়ার কাছে ছোট্ট একটা ঘর দেখতে পাচ্ছেন সেটাই রাকিবের বাড়ি। সাকিব আস্তে আস্তে বাড়ির কাছে গিয়ে ডাকছে রাকিব বাসায় আছো। রাকিব সাকিবের কণ্ঠ শুনে দৌড়ে বের হয়ে আসে। কিরে বন্ধু তুমি। আমার এই ভাঙা বাড়িতে। আয় ভেতরে আয়। সাকিব ঘরের ভেতরে গেলো। ঘরের ভেতরে একটা শুধু চকি তাও বাঁশের তৈরি। ঘরে একটা চেয়ারও নেই। ওমনি বিছানায় বসে সাকিব। সাকিব দেখছে রাকিব শীতে কাঁপতেছে। সাকিব বলছে, আচ্ছা বন্ধু তুমি আজ স্কুলে যাওনি কেন? রাকিব : বন্ধু কি আর বলব, আসলে তুমি বুঝতেই পারছ, আসলে বলতে লজ্জা হচ্ছে, তবু বলি আজকে যে শীত পড়েছে আমার শীতের কোনো মোটা জামা নেই। তাই যাওয়া হয়নি বন্ধু। কালকে যাব ইনশাআল্লাহ্। মা যে বাড়িতে কাজ করেন, সেই বাড়ি থেকে একটা পুরাতন জামা আনবে বলেছে। সাকিব রাকিবের কথা শুনে চোখে পানি এসে গেলো। সাকিব রাকিবের অবস্থা দেখে ওর গাঁয়ের দামি জ্যাকেটটা খুলে রাকিবকে পরিয়ে দিল। রাকিব এ কি করছ বন্ধু। সাকিব কোন কথা চলবে না বন্ধু।

আমার বাবার অনেক কিছু আছে। কিন্তু তোমার তো বাবা নেই। আমি আজই আর একটা কিনে নিবো। কালকে তুমি এই জ্যাকেট পরে স্কুলে যাবে। রাকিব খুব খুশি হলো। আসলে এমন বন্ধুই হয় না।

সাকিব : বন্ধু থাকো আজ আসি আগামীকাল তাহলে দেখা হচ্ছে। রাকিব ইনশাআল্লাহ্। সাকিব বাসায় গিয়ে যেন আর কিছুই ভালো লাগছে না। মা ডাকছে সাকিব বাবা খেতে এসো। কিন্তু সাকিব কোনকিছু শুনছে না। একপর্যায়ে মা সাকিবের রুমে আসে। এসে বলে কিরে বাবা আজ তোমার কী হয়েছে? সাকিব কোন জওয়াব দেয় না। মা আবারো বলছে বাবা আমায় বলো কি হয়েছে। সাকিব মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। কান্নার সুরে বলে মাগো আজ এমন একটা দৃশ্য দেখেছি, যা আমি ভুলতে পাচ্ছি না মা। আমার প্রিয় বন্ধু রাকিব তোমাকে যে বন্ধুর কথা বলেছি সে আমাদের ক্লাসে ফাস্ট বয়। কিন্তু সে আজ স্কুলে যায়নি শীতের দিনে তার গায়ে দেওয়ার মতো একটা জ্যাকেটও নেই। আমি তাকে আমার নিজের জ্যাকেটটা দিয়ে এসেছি। কিন্তু চিন্তা করছি। দেশব্যাপী এমন কত অসহায় মানুষ আছে, যারা এই শীতের দিনে বড়ই অসহায়। মা সাকিবের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। ছেলে আমার বলে কী। সাকিব বলছে, মা আজকে আমরা যারা শীতের দিনে দামি দামি কাপড়, লেপ, জ্যাকেট আরো কত কিছু সুবিধা পাই। কিন্তু আমরা কি কখনো একটু চিন্তা করে দেখেছি? আমাদের বাড়ির পাশের কত মানুষ একটা ভালো কাপড় কেনার সাধ্য নেই! আমরা কখনো ভেবে দেখি না। আমরা বেশি নয় যদি একটি করে শীতের কাপড় দিতাম। তবে বাংলাদেশে কত ধনী মানুষ আছে। তারা যদি নিজ দায়িত্বে দিত। তবে বাংলাদেশে শীতের দিনে কাউকে আর কাঁদতে হতো না। সবাই সুখে শান্তিতে বসবার করতে পারতাম। আসুন সবাই শীতের দিনে এই মহৎ কাজে অংশগ্রহণ করি।

কবির ভাষায়-

শীতের পিঠা গরম কাপড়

ভাগাভাগি করি,

আপন মনে আসুন সবাই

সুখের সমাজ গড়ি।

"