পদ্মাকন্যা আইরিশ ও ইলিশ!

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আফফান ইয়াসিন

তার জন্ম হয়েছিল অন্য মেয়েদের মতোই একটা সাধারণ পরিবারে। কিন্তু সাধারণ কাজগুলোকে করে নিত অসাধারণ ভাবে। যেন সুন্দরের মাঝে হেঁটে বেড়ানো সুইট্যাভল পার্সন। তার আচরণে না তাকে বাকপটু বলা যায় না অল্পভাষী বলব! বাল্যকাল থেকেই সে ছিল গুরুগম্ভীর, মাধুর্য ও সৃজনশীল চিন্তাধারার অধিকারী। তার রূপে ছিল দীপ্তির আভা। চোখে ছিল মৃদু মায়ার ছাপ। ভ্রু দুটো যেন স্থীর কোমল নীড়।

কপাল যেন তার ফণীমনসার পাতা। মা-বাবা আয়েশা সিদ্দীকা আইরিশ নাম রাখলেও বন্ধুদের নিকট আইরিশ হিসেবেই পরিচিত। আইরিশ সেদিন নিজের মুখেই বলেছিল, পদ্মার রূপালি ইলিশের প্রজনন, পদ্মার রূপকে চিত্রায়িত করা হরেক রকম অতিথী পাখির সমাগম, পদ্মার বুক কাঁপানো ঢেউ,পদ্মার বুক চিরে যাতায়াতকারী লঞ্চ ও পালতোলা ডিঙ্গি নৌকা, পদ্মার পাড়ে জেগে ওঠা নিত্যনতুন চর, ঠিক দুপুরে সূর্যরশ্মির প্রতিফলনের সাথে মিশে যাওয়া কোলাহলে পদ্মার মলিন ছন্দ, নিশীত জেগে উপভোগ করা পদ্মার নিভৃত ছায়াঢাকা রূপ, বর্ষার বৃষ্টিতে পদ্মার জলধারায় হিমে বাঁধা অপরূপ মায়াবী চাহন। বসন্তের আশীর্বাদ পুষ্ট পদ্মার সবুজদীপ্ত এবং বর্ণিল সূর্য্যাস্ত দর্শন করতে আসা নদীর বুকে ভাসমান মানুষগুলোর বৈচিত্র্য দৃশ্য অবলোকন করতে করতে কখন যে বাল্যকাল থেকে কৈশরে পদার্পণ করেছি টেরও পেলাম না। গোবরে পদ্মফুলের ন্যায়, হাসি-খেলার মাঝেই করে ফেলত কল্পনার রাজ্যের মেরামত!

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্নের আঙ্গিনায় লালন করেছিল এক অভূতপূর্ব ভাবনা।

পদ্মা নদীর পারে থাকবে ঘাস-পাতা ইত্যাদিতে গড়া তার একটি কাঁচাঘর। যার চারপাশ ঘেরা থাকবে পত্রপুট, খড়কুটো ও ডাল-পালা দিয়ে। যার চাল হবে বেতুনগাছের পাতা, তৃণবিশেষ ও খোলা আকাশের নয়নাভিরাম দৃশ্যে। পল্লবের ভাঁটফুলের স্তূপ দ্বারা হবে তার চৌকাঠ। ঘরের আয়তন হবে খুবই ছোট। যেখানে মোটামুটি আঁটসাঁট হয়ে গা-ঢাকা দিয়ে শুয়ে থাকতে পারে। বাড়ির সামনে ছোট একটি আঙ্গিনা থাকবে এবং পেছনে রবে একাধারে শ্যাওলা আবৃত হরিৎ কাশবন। রান্না করার জন্য থাকবে একটি নিজ হাতে বানানো কাঁচা মাটির চুলা। তুলোট ও সদ্য গজানো হোগলা পাতা দিয়ে হবে তার বাউন্ডারি। যার ভিতর প্রবাহিত হবে হিমে হিমে ঢাকা নির্মল ও স্বচ্ছ বায়ু। পুরো বাড়িটার সামনে বিশাল একটি সাইনবোর্ড থাকবে। যেখানে লিখা থাকবে কুহকাফ নগরের প্রাচীর। তার ধারণা মতে এটা হার মানাবে দময়ন্তীর পুষ্পকানন।

সেটা হবে সম্পূর্ণ এক আলাদা বাড়ি। গ্রাম/পাড়ায় হই-হুল্লোড় পড়ে যাবে। সবাই বাড়ি দেখার জন্য চারপাশে ভিড় জমাবে। নানানজন নানান প্রশ্ন করবে! কেউ কেউ ফটোগ্রাফার হয়ে ছবি তুলে বিখ্যাত হবে! কেউ আবার সাংবাদিক হয়ে ভিডিও করে, সেগুলো ফেসবুকে আপলোড দেবে। আর এটা দেখার জন্য সবাই চাঁদপুর পদ্মার পারে জড় হবে। তখন তার আনন্দ কে দেখে? সবাই মনে করবে, না জানি এই বাড়িতে কত সুখ! কত শান্তি! কী শোভা! কী স্নেহ! কী ছায়া! সব কালো এবং আলোর সর্বোত্তম সবকিছু রয়েছে এখানে। শান্তিতে অপরিসীম একটি গহিন নিবাস। একবার হলেও ঘুরে দেখতে হবে। সবাই বলাবলি করবে কী সাংঘাতিক মাইয়া! কেমন তার মাথা! সুযোগ পেলে একজন প্রশ্ন করবে কোন ইঞ্জিনিয়ার দিয়া বানাইছ? তখন সে গোপনে গোপনে মুচকি হেসে এড়িয়ে যাবে তাদের প্রশ্নগুলো। তার কল্পনা রাজ্যের রানি হবে সে নিজেই। শাসন করবে ঘরে বসবাসরত পোকা-মাকড়গুলো। প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিবে বাজার থেকে কিনে আনা দুটি কোয়েল পাখি। নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করবে কোয়েলদের সাথে হাসি-তামাশা করা। পুরো বাড়িটি অবারিত করে দেওয়া হবে দেশ-বিদেশ থেকে পদ্মার বুকে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে আসা বিচিত্র রঙ্গের অতিথি পাখিদের জন্য। যেন মনে হয় বাড়িটি তরঙ্গায়িত পাঠশালা। সকাল হলে পদব্রজে চলে যাবে পদ্মা নদীর খেয়াঘাটে। আর অবলোকন করবে পদ্মার পারে ঝরে পরা অবর্ণনীয় ঘনশ্যাম কুলফির।

সেখান থেকে নৌকা নিয়ে ছুটে যাবে

নদীর গভীরে, আর যতন করে পদ্মার গভীর থেকে তুলে নিয়ে আসবে অকৃত্রিম রুপালি ইলিশ। কেননা, পদ্মা নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়। একদম টাটকা ইলিশ। পদ্মার গভীরে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো আইরিশ অনেক ইলিশ মাছ খেয়েছে কিন্তু রুপালি ইলিশ কখনো জীবিত দেখতে পায়নি। সবসময়ে বরফে ঢাকা ইলিশ দেখতেই অভ্যস্ত। তাই, সকাল সকাল নৌকা নিয়ে পদ্মার গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। ভাবতেই কেমন চঞ্চল হয়ে যায় আইরিশ। মাছ ধরার জাল হাতে কেমনই বা দেখাবে তাকে। পার্বতীদের মতো লাগবে না তো? যাই হোক ইলিশ নিয়ে ঘরে ফিরে মাটির চুলাটা দিয়ে শুরু করবে রান্নার কাজ। আর রান্নার কাজটাও করবে সে নিজেই। লাকরি হিসেবে ব্যবহৃত হবে তিলে তিলে গড়ে তোলা তুষানল। গোধূলি শেষে মেঘমুক্ত ভূখন্ডে এবং তারকাখচিত আকাশের রাতে যখন, আকাশে তারার মেলা বসবে। ঠিক তখনি চাঁদ মামাকে নিমন্ত্রণ করবে পদ্মার ইলিশ আর সরষে বাটা দিয়ে আপ্যায়ন করার জন্য।

কেননা সে শুনেছে,

চাঁদ জ্যােৎস্না হয়ে ঝরে ,

চাঁদের দেশের ঘরে ঘরে।

চাঁদ মামার সাথে বসে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার ক্ষণে সরষে-ইলিশ মিশ্রিত মিষ্টি বাতাস অতিক্রম করবে তাদের। তারপর সময় করে দুজন খেয়ে নেবে টাটকা ইলিশ আর সরিষা বাটা।

"