মণি-মুক্তার প্রতি ভালোবাসা

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শওকত আলী

খোকা ও রহমান দুই বন্ধু। খোকার ইচ্ছা সে রাজা হবে! সে কিন্তু রাজকুমার। তার বাবার মৃত্যুর পর সে রাজা হয়। হঠাৎ পাশের এক রাজা তার রাজ্য আক্রমণ করে এবং দখল করে নেয়। এখন সে রাজ্যহারা। কিন্তু সে তার ইচ্ছার কথা ভুলেনি। খোকা এবং রহমান বেরিয়ে গেল রাজা হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে। কে করবে তাকে রাজা! হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি এলো, সে একটি ছোট দেশ আক্রমণ করবে! দেশ আক্রমণ করার জন্য চাই হাজার হাজার সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র। তা পাবে কোথায়? তখন তারা দুজন ঘোড়া ব্যবসায়ী সেজে একটি গ্রামে আশ্রয় নিল। এই গ্রামে থাকতে থাকতে তাদের অনেক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয়। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। খোকা এক দিন সে গ্রামের সকল যুবককে নিমন্ত্রণ করেন। সবাই এলো। তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে নানা প্রকার সুস্বাদু খাদ্য। সব তাদের সামনে পরিবেশন করা হয়। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলো। তখন খোকা সবাইকে উদ্দেশ করে তার ইচ্ছার কথা বলল। তাদের অনেকে তার কথায় রাজি হয়। সবাই সেদিনের মতো যার যার বাড়িতে চলে যাই। খোকা সবাইকে বলে দিয়েছিল কখন তারা গ্রাম থেকে প্রত্যাবর্তন করবে। সবাইকে এটিও বলে দেওয়া হয়েছে তারা যেন তাদের পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসে। দেখতে দেখতে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার সময় এসে গেল। খোকা সবাইকে বলল কাল গ্রাম ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশের পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে শিবির গড়তে। কারণ সবাই একসঙ্গে গেলে কেউ সন্দেহ করতে পারে।

সবার আসা শেষ হলো!

এখন যুদ্ধ পরিকল্পনা করা হলো কীভাবে তারা যুদ্ধ করবে? রহমান বলল, তাদের মধ্য থেকে ১০ বা ১৫ জন সৈন্য ঘোড়া ব্যবসায়ী ভেসে রাজধানীতে প্রবেশ করবে এবং রাজদরবারের ফটকে থাকা রক্ষীদের হত্যা করবে। তাদের প্রচ্ছদে অন্যরা যাবে এবং আক্রমণ করবে। তারা বেরিয়ে পড়ল। কথামতো এক দল আগে এবং অন্যরা পশ্চাতে আক্রমণ করল। তখন সেদেশের রাজা মধ্যভোজে ব্যস্ত ছিল। তাই সে যুদ্ধ না করে রাজদরবারের পেছন দরজা দিয়ে পালাই। খোকা ও তার সৈন্যরা সহজে সে দেশ জয় করে নিই।

এখন খোকার রাজা হওয়ার স্বপ্ন পূর্ণ হলো! এখন সে রাজা তার বন্ধুকে করল তার প্রধানমন্ত্রী। আর অন্য সেনাদেরও দেওয়া হয় রাজ্যের বড় বড় পদ। এখন তাদের ইচ্ছা রাজ্যে সুখশান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের দেশের সীমানা বৃদ্ধি করা। দেশ জয়ের তিন বছর পর আরো একটি দেশ জয় করে। নতুন দেশ জয় করার কিছুদিন পর খোকা বন্ধু দেশের এক রাজকুমারীকে বিয়ে করে। বিয়ের কিছু বছর পর তাদের দাম্পত্য জীবনে এলো এক নতুন অতিথি। খোকার জীবনে এলো আরেক খোকা। সুখেশান্তিতে চলছে রাজ্যব্যবস্থা। রাজার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে পুরারাজ্যে।

এই দিকে রাজকুমার যুবক হয়ে উঠছে। অন্যদিকে খোকার বয়সে এসেছে বার্ধক্য। রাজকুমার চাই তার বাবা রাজ্যের ভার ছেড়ে দিয়ে অবসর সময় কাটাক। রাজকুমারের কিছু আচরণ থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তা রাজা দেখে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে। রাজা সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে। একসময় খোকার দেশে এক বন্ধু রাজা বেড়াতে আসে এবং তার জন্য অনেক মণিমুক্তা উপহারও আনে। উপহারস্বরূপ যেসব মণি-মুক্তা পাই, তা রাখার জন্য রাজা ও প্রধানমন্ত্রীর রুমের মধ্যবর্তী স্থানে একটি কক্ষ নির্মাণ করে এবং লোহার কপাট লাগানো হয়। সে কক্ষের দিকে রাজা ও প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত কেউ বিনা অনুমতিতে আসতে পারে না। বন্ধু রাজার দেওয়া উপহারটি সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে বলল, তা ওই কক্ষে রাখার জন্য, মন্ত্রীও তা করল। কিচ্ছুক্ষণ পর রাজার ইচ্ছা হলো, মণিমুক্তার সৌন্দর্য দেখে তার মনকে প্রশান্ত করবে। তা ভেবে রাজা ওই কক্ষে প্রবেশ করল এবং কক্ষের প্রধান দরজাটি খোলা রাখলেন। কোনো এক কাজে মন্ত্রী ওই কক্ষের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, দেখতে পেল মণিমুক্তার কক্ষে দরজা খোলা। তিনি কিছু না ভেবে দরজা বন্ধ করে দিল। কারণ রাজা দেখলে চাকরি তো যাবেই সঙ্গে গর্দানও। কিন্তু ওই কক্ষে ছিল রাজা। তা প্রধানমন্ত্রী জানতেন না। এক দিন হয়ে গেল! রাজাকে রাজদরবারের কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সবাই সবখানে তালাশ করল। কোথাও রাজার খোঁজ মিলল না। এভাবে এক সপ্তাহ চলে যাই। সভাসদের সবার পরামর্শক্রমে রাজকার্য পরিচালনার জন্য রাজকুমারকে করা হলো কার্যবাহী রাজা। রাজ্যের মানুষ যেন রাজকুমারকে সন্দেহ না করে সেজন্য সারা রাজ্যে তালাশ করার আদেশ দেওয়া হয়। রাজ্যের কোথাও পাওয়া গেল না রাজাকে।

রাজকুমার কার্যবাহী রাজা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী রাজ্যের সকল দলিল ও কোষাগারের চাবি এনে দেওয়া হয়। সেখানে ছিল ওই মণিমুক্তার কক্ষের চাবিও! রাজসভা শেষে রাজকুমার মণিমুক্তার কক্ষটি পরিদর্শন করতে ইচ্ছা করে, প্রধানমন্ত্রী তাকে নিয়ে যায়, কক্ষে দরজা খোলে দেখতে পেল তাদের রাজা মৃত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। তিনি সে কক্ষের দেয়ালে রক্ত দিয়ে লিখে রাখেন তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। মণিমুক্তার প্রতি ভালোবাসায় তার মৃত্যুর কারণ।

 

"