টাইগার কালু

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

হুমায়ুন আবিদ

সরকারি চাকরিতে কর্মরত মতিন সাহেব অফিস ছুটির পরপরই কোথাও দেরি না করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। কারণ, একটু দেরি হলেই গাড়ির জ্যামে পড়তে হয়। অফিস থেকে বাসায় আসতে ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট সময় লাগে। মতিন সাহেব সেদিন রিকশা থেকে নেমে রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাস্তার বিপরীত পাশেই তার বাসা। হঠাৎ লক্ষ করলেন, রাস্তার ওপাশ থেকে এপাশে আসার জন্য একটি মা কুকুর তার বাচ্চাটিকে নিয়ে ছোটাছুটি করছে।

আচমকা মা কুকুরটি রাস্তা পার হওয়ার জন্য দৌড় দিলে অপরদিক থেকে আসা একটি মাইক্রোবাস সজোরে মা কুকুরটিকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। মা কুকুরটি গাড়ির ধাক্কা খেয়ে রাস্তার একপাশে ছিটকে পড়ে। মা কুকুরটির মাথায় আঘাত লাগাতে নাক, কান, মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। কুকুরটি কিছুক্ষণ ছটফট করে মরে যায়। এদিকে বাচ্চা কুকুরটি মা কুকুরটির পাশে এসে জোরে জোরে কোঁ-কোঁ করে চিৎকার করতে থাকে। ততক্ষণে মা কুকুরটি নিষ্প্রাণ দেহে পড়ে আছে।

মতিন সাহেব ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে খুবই মর্মাহত হলেন আর ভাবলেন আজ যদি একজন মানুষ এভাবে মারা যেত এতক্ষণে কত কিছুই না ঘটে যেত। অসহায় বোবা প্রাণী বলে কারো কোনো ব্যথা নেই। ততক্ষণে পৌর পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসে মরা কুকুরটিকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।

মা কুকুরটিকে নিয়ে যাওয়ার পর বাচ্চা কুকুরটি এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছিল। বাচ্চা কুকুরটিরও একটি অঘটন ঘটতে পারে এই ভেবে মতিন সাহেব বাচ্চা কুকুরটিকে ডাক দিলেন। বাচ্চা কুকুরটি লেজ নাড়াতে নাড়াতে মতিন সাবের কাছে এসে কোঁ-কোঁ করে কী যেন বলার চেষ্টা করল।

নাদুসনুদুস লিকলিকে কালো বাচ্চাটিকে দেখে মতিন সাহেবের মায়া লেগে গেল। তিনি কুকুরের বাচ্চাটিকে আদর করে বললেন,

-আমার সঙ্গে যাবি?

বাচ্চা কুকুরটি লেজ নেড়ে সায় দেয়। মতিন সাহেব বাসার উদ্দেশে রওনা দিলে বাচ্চা কুকুরটিও তার পিছু পিছু আসতে থাকে। একসময় তিনি বাড়িতে পৌঁছে যান।

মতিন সাহেবের স্ত্রী সাহেরা বেগম বাচ্চা কুকুরটিকে দেখে বলল

-এ আবার কোত্থেকে নিয়ে আসলে? তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের কর, নইলে ঘর-দুয়ার সব নষ্ট করে ফেলবে। মতিন সাহেব বললেন, একটু দাঁড়াও না, এত অস্থির হচ্ছ কেন? মতিন সাহেব বাচ্চা কুকুরটির সব ঘটনা খুলে বললে সাহেরা বেগমের ভিতরে একটু মায়া হয় এবং বাচ্চা কুকুরটিকে বাসায় থাকার অনুমতি দেয়।

মতিন সাহেবের মেয়ে শায়লা ঘুমিয়েছিল। শায়লা একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

শায়লা তার বাবা-মায়ের কথাবার্তা শুনে ঘুম থেকে জেগে বাইরে এসে বাবার কোলে ওঠে। শায়লা বাচ্চা কুকুরটিকে দেখে বললো

-কী সুন্দর! বাবা তুমি এনেছ বুঝি? আমাদের বাসায় থাকবে?

বাবা বললেন, হ্যাঁ

-শায়লা শুনে তো মহাখুশি। একাকি এই নির্জন বাড়িতে শায়লা তার বাবা মায়ের সঙ্গে থাকে। খেলার সঙ্গী বলতে তেমন কেউ নেই। মাঝে মাঝে পাশের বাসার ফারিয়া আসে আর বিকেল হলে মায়ের সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যায়। শায়লা আজ কুকুরের বাচ্চাটি পেয়ে মহাখুশি।

শায়লা বাবার কোল থেকে নেমে কুকুরের বাচ্চাটির গায়ে হাত বোলাতেই বাচ্চাটি লেজ নাড়াতে নাড়াতে শায়লার পাশে চুপ হয়ে বসে পড়ল। শায়লা ঘর থেকে বিস্কুট এনে দিলে বাচ্চা কুকুরটি মনের সুখে খেয়ে বারান্দায় চুপ হয়ে শুয়ে থাকে। মতিন সাহেব ভেবেছিল রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কুকুরের বাচ্চাটি কাউকে না পেয়ে নীরবে চলে যাবে।

কিন্তু সকালে উঠে দেখে কুকুরের বাচ্চাটি সেখানেই শুয়ে আছে। মতিন সাহেবকে দেখে লেজ নাড়াতে নাড়াতে পায়ের কাছে এসে বসে পড়ল।

মতিন সাহেব নাস্তা খেয়ে অফিসের উদ্দেশে রওনা দিলে কুকুরের বাচ্চাটিও তার পেছনে পেছনে আসতে থাকে। মতিন সাহেব ব্যাপারাটি লক্ষ্য করে বললেন, বাসায় চলে যা, আমি অফিসে যাচ্ছি। অমনি কুকুরের বাচ্চাটি দৌড়ে বাসার দিকে চলে আসে।

একটু পরে সাহেরা বেগম শায়লাকে নিয়ে যখন স্কুলে রওনা দিল, তখনো কুকুরের বাচ্চাটি তাদের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল। সাহেরা বেগম শায়লাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফিরে আসলে কুকুরের বাচ্চাটিও তার সঙ্গে ফিরে এলো।

এভাবে দেখতে দেখতে এক বছর চলে যায়। কুকুরের বাচ্চাটিও তখন বেশ বড়সড় হয়ে ওঠে। কুকুরটির গায়ের রং লিকলিকে কালো বলে মতিন সাহেব তার নাম রাখেন কালু। কুকুরটিকে এখন কালু বলে ডাকলেই দৌড়ে চলে আসে। কুকুরটি এখন মতিন সাহেবের পরিবারেরই যেনো একজন। প্রতিবেশীরা এই নিয়ে গুণগুণ করলেও মতিন সাহেব সেদিকে কান দেন না।

মতিন সাহেব পুরাতন বাসাটি ভেঙে নতুন বাসা করবেন বলে অনেক আগেই ব্যাংকে হাউস লোনের জন্য আবেদন করেছিলেন। এরই মাঝে সবকিছু প্রসেসিং হয়ে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ব্যাংক ম্যানেজার মতিন সাহেবকে ফোন করে বললেন

-আপনার হাউস লোনের ৩০ লাখ টাকা এসে গেছে। আগামীকাল ব্যাংকে আসলে টাকাগুলো নিতে পারবেন।

পরদিন মতিন সাহেব ব্যাংকে গিয়ে টাকাগুলো উঠিয়ে খুব সর্তকতার সঙ্গে বাসায় নিয়ে আসেন। মালামাল কেনার জন্য টাকাগুলো কন্ট্রাক্টরকে দিতে হবে।

টাকাগুলো নিয়ে বাসায় আসলে সাহেরা বেগম বলল

-এতগুলো টাকা কি বাসায় রাখা ঠিক হবে?

মতিন সাহেব বললেন, এক রাতের জন্য কী আর হবে?

-আগামীকাল অফিস থেকে এসে কন্ট্রাকটরকে টাকা বুঝিয়ে দেব।

পরদিন মতিন সাহেব অফিসের দিকে চলে যান। সাহেরা বেগম আর শায়লার সঙ্গে কালু স্কুলে চলে এলে বাড়ি খালি হয়ে যায়। সাহেরা বেগম শায়লাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ বিল জমা দেওয়ার জন্য ব্যাংকে যাওয়ার সময় কালুকে বলল

- কালু, তুই বাসায় চলে যা।

কালু বাসায় এসে দেখল অচেনা দুজন মানুষ ঘরের ভেতরে কী যেন খোঁজাখুঁজি করছে। কালু তাদের দেখে জোরে জোরে চিৎকার শুরু করলে একজন এসে লাঠি দিয়ে কালুর শরীরে আঘাত করে। কালু শরীরে আঘাত পেয়ে অনেক উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং সেই লোকটিকে কামড়াতে থাকে। প্রথম লোকটিকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য দ্বিতীয় লোকটি এসে কালুর শরীরে আঘাত করলে, কালু আরো উত্তেজিত হয়ে দ্বিতীয় লোকটিকেও ঝাপটে ধরে। কালুর চিৎকার ও লোকজনের কান্নাকাটি শুনে আশপাশ থেকে অনেক লোকজন বাসার মধ্যে উপস্থিত হয়। লোকজন এসে দেখে কুকুরটি দুইজন লোকের সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করছে আর লোক দুইটি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে।

পাশের বাসার আলী হোসেন সাহেব প্রায়ই মতিন সাহেবের বাসায় আসতেন। প্রথম প্রথম তাকে দেখে কালু চিৎকার করলেও পরে আর চিৎকার করত না।

তিনি ঘটনা দেখে তৎক্ষণাৎ মতিন সাহেবকে ফোন করে বাসার অবস্থা জানালেন। আলী হোসেন সাহেব একটু এগিয়ে আসলে কালু তাকে দেখে অনেকটা শান্ত হয়ে গেল।

বাসায় আসা লোকজনে কালুকে মারতে উদ্যত হলে আলী হোসেন সাহেব বললেন

- থামুন। এটি মতিন সাহেবের পোষা কুকুর। বিনা কারণে কারো সঙ্গে উত্তেজিত হয় না। আপনারা লোক দুটিকে ধরুন এবং জিজ্ঞেস করুন কেন তারা এখানে এসেছিল?

লোকজন আলী হোসেন সাহেবের কথায় লোক দুটিকে ধরে জিজ্ঞেস করলে তারা সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।

আমরা সোর্স মাধ্যম খবর পাই যে, গতকাল মতিন সাহেব ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা তুলে বাসায় রেখেছেন। এই টাকা চুরির উদ্দেশে গতকাল থেকেই আমরা বাসাটির প্রতি লক্ষ্য রাখছিলাম।

আজ সকালে যখন বাসা ফাঁকা হয়ে গেল তখনই আমরা ঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। আমরা যখন টাকা খুঁজতেছিলাম ঠিক তখনই এই কুকুরটি বাসায় ফিরে আসে। আমরা ভেবেছিলাম কুকুরটিকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে চলে যাবে। কিন্তু লাঠি দিয়ে আঘাত করলে কুকুরটি উত্তেজিত হয়ে আমাদের কামড়াতে থাকে।

ততক্ষণে মতিন সাহেব বাসায় চলে আসলেন।

কালু মতিন সাহেবকে দেখে লেজ নেড়ে কোঁ কোঁ করতে থাকে। মতিন সাহেব দেখলেন কালুর সারা শরীর জুড়ে আঘাতের চিহ্ন। পাশেই দুটো লোক আহত হয়ে পড়ে আছে।

মতিন সাহেবের বুঝবার আর বাকি রইল না। কী ভয়ানক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল আজ!

সাহেরা বেগমও খবর পেয়ে দ্রুত বাসায় চলে আসলেন।

মতিন সাহেব সাহেরা বেগমকে বললেন, যাকে তুমি বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছিলে সেই কালু আজ তার জীবনবাজী রেখে আমাদের বাঁচিয়ে দিল।

এই দুজন চোর আমাদের হাউস লোনের ৩০ লাখ টাকা চুরি করার জন্য ঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে কালু এসে তা দেখে ফেলে এবং জীবন-মরণ যুদ্ধ করে এদের আটকিয়ে দেয়।

সাহেরা বেগম কালুকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে আর কালুও নিশ্চুপ হয়ে সাহেরা বেগমের বুকে মুখ লুকিয়ে রাখে।

বাড়িতে আগত লোকজন হাততালি দিয়ে বলল, আমরা সাহস করে যা করতে পারতাম না প্রভুভক্ত কালু সাহস করে তা দেখিয়ে দিছে। তাই আজ থেকে আমরা কালুকে কালু নয় টাইগার কালু বলে ডাকব।

কালু মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে দুই পা ওপরে তুলে সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।

বাসায় আসা লোকজনও কালুর গায়ে আদর মাখা হাত বুলিয়ে চোর দুটিকে নিয়ে থানায় চলে যায়।

 

"