শিয়াল ও হাঁসের বন্ধুত্ব

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শাকিলা আক্তার

বহু বছর আগে, এক দেশে ছিল এক হাঁসের রাজা। তার দলে থাকত বিশ-বাইশটির মতো হাঁস। তাদের নিয়ে তার নিজের হাতে গড়া তার রাজ্য। হাঁসের রাজা একসময় বিয়ে করে ফেলে কোনো দেশের এক হাঁসের রানিকে। বেশ সুখেই দিন কাটছিল তাদের। দেড় বছর পর তাদের ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে হাঁস। সে কী আনন্দ রাজার ছেলেসন্তান পেয়ে। ইচ্ছে করেই ছেলে হাঁসের নাম রাখে হাঁসা। হাঁসার জন্মের পর থেকেই একা। কারণ হাঁসার সঙ্গে মিশতে পারত না অন্য অন্য হাঁসের মেয়েছেলেরা। তাই সব সময় পোকা-মাকড়ের সঙ্গে খেলা করে দিন কাটাতো হাঁসা। বাবা-মা যেসব খাবার এনে দিত, হাঁসা তাই খেত। সে কোনো দিন খাদ্য সংগ্রহ করে খায়নি।

একদিন রাতে রানি আর রাজা এক পাহাড়ের কোনায় বিশ্রামের সময় রাজাকে বলল, রানি আমাদের ছেলে হাঁসা এখন বড় হয়েছে, ওকে নদীতে নিয়ে যাওয়া উচিত। ওকে সাঁতার শেখাতে হবে। তাই রাজা হাঁসাকে ডাকল। হাঁসা এলে বাবা বলল, হাঁসা তুমি কাল থেকে আমার সাথে নদীতে যাবে। হাঁসা বলল, বাবা আমি তো এখন বড় হয়নি, তোমার মতো। রাজা বলল, আমি তোমাকে শিখিয়ে দিব। তুমি এখন আসতে পার। হাঁসা চলে গেল তার রুমে। রুমে গিয়ে ভাবছে হ্যাঁ আমি সাঁতার শিখব এবং সেখানে অনেক বন্ধু পাব। ঘরে একা একা আর ভালো লাগে না।

পরের দিন সকালে, হাঁসা বাবা-মা ও অন্যদের সঙ্গে চলল নদীর দিকে। হাঁসা চারদিক তাকিয়ে দেখছে এত সুন্দর এলাকা আমি তো এর আগে কোথাও দেখিনি। হাঁসা, হাঁটতে পারছে না। এমন সময় রাজা হাঁস এক হাঁসকে বলল, হাঁসাকে ভালোভাবে বোঝাও এখানে কী কী ভয়ানক জীবজন্তু আছে। সেই হাঁসটি হাঁসাকে বলছে, এখানে শিয়াল নামে বেশ কিছু প-িত আছে। হাঁসা সেই হাঁসটির দিকে মনোযোগ নেই তবু বলল, শিয়ালপ-িত আবার কে? হাঁসটা বলল, শিয়াল ভয়ংকর পশু ও আমাদের শত্রু। ওকে দেখলে লুকিয়ে যাবে নইলে দৌড় দেবে নদীর দিকে। তাহলে ও আর ধরতে পারবে না। যদি ধরা পরো, তাহলে কিন্তু তোমাকে খেয়ে ফেলবে। হাঁসটা বলেই যাচ্ছে, এমন সময় হাঁসা দেখতে পেল একটা সুন্দর ঘাসফড়িং। পেছন থেকে হাসা দৌড় দেয় ফড়িংটার দিকে। সেই হাঁসটা কথা বলছেই, সে যানে না হাঁসা পেছনে নেই। এখন তারা নদীতে নামবে এমন সময় হাঁসটা বলল আস্তে আস্তে নামতে হাঁসাকে। হাঁসটা পেছনে তাকাতেই দেখল হাঁসা নাই। হাঁসটা রাজাকে বলল, কীভাবে পেছন থেকে হারিয়ে গেল হাঁসা। রাজা রাগে আগুন, রাজা বলল, একটা মাত্র ছেলে আমার, তাকে হারিয়ে ফেললে? তুমি যাও হাঁসাকে নিয়ে এসো। হাঁসটা আবার পেছনের দিকে এলো হাঁসার খোঁজে।

এদিকে হাঁসা ফড়িংটার পিছেই দৌড়াচ্ছে। এমন সময় ফড়িংটা একটা গাছের ডালে বসে পড়ে। হাঁসাও একটু হাঁপাচ্ছে। হাঁসা বলল, ফড়িং ভাই তোমার নাম কী গো? আমি তোমার বন্ধু হতে চাই গো? তুমি কী আমার বন্ধু হবে? ফড়িং বলল, আমার নাম তিরিং। ফড়িং বলল, তোমরা তো আমাদের শত্রু, তুমি আমার বন্ধু হবে কী করে। হাঁসা বলল, আমি তো জানি না বন্ধু আমরা তোমাদের শত্রু। তিরিং বলল, আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, তোমরা নাকি আমাদের খেয়ে ফেল। হাঁসা বলল, আমি তোমাকে খাব না, আমি তোমার বন্ধু হয়ে থাকতে চাই। আমি কথা দিলাম তোমাকে কোনোদিন আমি খাব না। তিরিং বলল, ঠিক আছে আমি আজ থেকে তোমার বন্ধু হলাম। তারা কথা বলতেই আসে শিয়ালপ-িত। শিয়ালপ-িত বলল, শোনো তোমরা সবাই, আমি কী বলি। ঘাসফড়িং বলল, বন্ধু এটা শিয়াল তোমাদের বড় শত্রু। শিয়াল বলল, আমি তোমাদের বন্ধু হব। হাঁসাকে বলল, কী বন্ধু তুমি কী আমার বন্ধু হবে? হাঁসা বলল, আমি আজকেই প্রথম বাইরে বেড় হয়েছি। তার মধ্যে দুজন বন্ধু পেলাম। শিয়াল মনে মনে বলল, একবার শুধু রাজি হও, পরে বুঝবে আমি তোমার বন্ধু না শত্রু। হাঁসা বলল, আমার বন্ধু তিরিংয়ের সঙ্গে আগে কথা বলতে চাই। শিয়াল বলল, ঠিক আছে তোমরা কথা বল। তিরিং আসলেই হাঁসার ভালো চায় না। কারণ ওর মাকে খেয়ে ফেলেছে এক হাঁস। সেই থেকে ঘাসফড়িংরা রাগে আগুন হাঁসদের ওপড়, শুধু ওদের ওপড় না। তারা রাগে আগুন মুরগিদেরও ওপড়। কারণ এক মুরগি ঘাসফড়িং তিরিংয়ের বাবাকে খেয়েছে। তিরিং মনে মনে বলল, এ সুযোগ আর ছাড়া যাবে না। যাবে না। তিরিংয়ের সঙ্গে বুঝছে হাঁসা কী করা যায়। হাঁসা বলল, বন্ধু দেরি করো না শিয়ালের মতো বড় বন্ধু পৃথিবীতে আর কোথাও খুঁজে পাবে না। হাঁসা বলল, বন্ধু ঠিক আছে, আমি তোমার কথাতেই রাজি হলাম। হাঁসা শিয়ালকে বলল, হ্যাঁ বন্ধু আমি তোমার বন্ধু হয়ে গেলাম আজ থেকে। এর মধ্যে এসে হাজির সেই হাঁসটা। একটু দূরে থেকে দেখল শিয়ালের সঙ্গে হাঁসা কথা বলছে। তাই সে ভয়ে লুকায় আড়ালে। আকাশেরও অবস্থা ভালো না। চিন্তায় পড়ে যায় রাজা এবং রানি তাদের বুকের ধন কোথায় গেল। নেকি কুকুর পাষাণ আর শিয়ালের কাছে বন্দি হলো। হাঁসা পেছনে তাকাতেই বলল, আমি এখন যাই মা আবার বকবে। ঘাসফড়িং তিরিং বলল, বন্ধু তুমি এত বড় হয়েছো মাথায় যেন একটুও বুদ্ধি নাই তোমার। আকাশের অবস্থা ভালো না। এ অবস্থায় কেমন করে যাবে বাবা মায়ের কাছে। তুমি আজ আমার রাজ্য থেকে কাল চলে যাবে। শিয়াল খুশি হয়ে বলল, বন্ধু তিরিংয়ের বুদ্ধি আছে। ঠিক বলেছে তিরিং। আমার বাড়ি এখানেই। বন্ধু তুমি ইচ্ছা করলে যেতে পারো। আকাশ ভালো থাকলে বা ভালো হলে বাড়ি চলে যাবে। আর যেতে যেতে তোমার পরিচয় নেব। হাঁসা বলল, ঠিক আছে চল। শিয়াল ওর পরিচয় পেয়ে খুব খুশি। কারণ হাঁসা, হাঁসদের রাজার ছেলে। হাঁসাকে সঙ্গে নিয়ে অনেক হাঁসকে আনা যাবে এখানে। হাঁসার কথা শুনলে ওরা আসবে। শিয়াল হাঁসাকে ওর আস্তানায় নিয়ে গেল। সেখানে বেশ কয়েকজন হাঁস আর মুরগি জেলখানায় বন্দি। শিয়ালকে হাঁসা বলল, বন্ধু ওনারা এখানে বুঝলাম না। শিয়াল মিথ্যা বলল, বন্ধু ওরা আমার কাছে পড়ে। আমি ওদের পড়াই, তুমি পড়বে আমার কাছে? হাঁসা বলল, হ্যাঁ পড়ব, তবে বাবা-মাকে তো বলতে হবে। এ কথা বলতে হাঁসা দেখতে পেল বেশ কিছু শিয়াল মিলে সেই হাঁসটাকে ধরে এনেছে। হাঁসা বলল, বন্ধু ওই হাঁসটাকে কেন আনছে ওরা? শিয়াল বলল, আমি তোমাকে পরে সব বলব। হঠাৎ আকাশে প্রচ- মেঘ আবার জমে যায়। হাঁসা বলল, বন্ধু আমি যাই, নইলে আমার বাবা-মা খুব চিন্তা করবে। শিয়াল বলল, তোমার বাবা-মা কোথায় আছে আমাকে বলো, আমি নিয়ে আসি তাদের। হাঁসা বলল, আসলে মা-বাবারা অনেক আছে সেখানে। শিয়াল কৌশলে শুনছে আসলে ওরা কোথায়। হাঁসা বলেও দিল ওই নদীর ধারে। শিয়াল মনে মনে বলল, আজ শিকার করে আর শিকার করব না। এত দিনে যা জমাইয়াছি তা খেতে খেতে আমাদের জীবন কেটে যাবে। এসব মনে মনে বলছে শিয়াল। শিয়াল হাঁসাকে বলল, বন্ধু আমরা তোমার বাবা-মাকে নিয়ে আসি এবং তাদের সঙ্গে যারা যারা আছে তাদেরও নিয়ে আসব। হাঁসা খুশি হয়ে বলল, তাহলে যাও। আমি এখানে আছি। শিয়ালরা সবাই চলে গেল। বন্ধু শিয়াল হাঁসাকে বলল, বন্ধু ভুলেও যেন ওইখানে যেও না। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। হাঁসা ভয়ও পেল। হাঁসা বলল, ঠিক আছে তাই হবে। শিয়ালরা ছুটল শিকার করার জন্য রাজার বাহিনীকে।

ওই হাঁসটা বলল, হাঁসা তুমি একি বললে, তোমার মা-বাবাকে ওরা ধরে নিয়ে আসবে এবং খাবে তোমার বাবা-মাকে। হাঁসা বলল, এসব হাঁস নাকি পড়ার জন্য এখানে আছে? ওই হাঁসটা বলল, সব মিথ্যা কথা। তুমিও রক্ষা পাবে না হাঁসা, তোমাকেও খেয়ে ফেলবে ওরা। হাঁসা বলল, তাহলে আমি এখন কী করব। ওই হাঁসটা বলল, হাঁসা তুমি আমাদের সবাইকে ছেড়ে দাও। আমাদের বাঁচাও।

এদিকে ঘাসফড়িং গান গাইতে গাইতে বাড়ির দিকে যাচ্ছে, পথে তার দেখা হয় এক বয়স্ক ফড়িংয়ের সঙ্গে। ঘাসফড়িং তিরিং বলল, চাচা আজ আমি খুব খুশি আমার বাবার খুনিকে শিয়ালের হাতে তুলে দিয়ে এসেছি। চাচা বলল, তোর বাবাকে তো শিয়ালগুলোই মেরেছে। কিছু বদমায়েশ শিয়াল মুরগি এবং হাঁসকে শিকার করতে যায়, তখন হাঁস আর মুরগি দৌড় দিলে শিয়ালের পায়ের নিচে পড়ে তোর বাবা মারা যায়। তিরিংয়ের মাথার মধ্যে যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তখন ওই পথ দিয়ে যাচ্ছে শিযালগুলো এবং বলছে রাজার ছেলে হাঁসাকে ধরে নিয়ে গেছি। এখন রাজা-রানি অন্যদের ধরতে পারলে বাঁচি। বসে বসে খাব সারাটা জীবন। এ কথাগুলো শুনল তিরিং। তাই তিরিং মনে মনে ভাবল, না আমি ভুল করেছি, এবার রাজা-রানিকে বাঁচাতে হবে। তাই শিয়ালের আগে উড়ে গেল নদীর পাড়ে তিরিং। রাজা এবং রানিকে তিরিং হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আপনাদের শিয়াল জানোয়ার বাহিনী ধরতে আসছে। আপনারা নদীর মাঝে জান, যদি প্রাণে বাঁচতে চান। এ কথা শুনে হাঁসগুলো নদীর মাঝে গেল। তিরিং ওইখান থেকে শিয়ালদের আস্তানায় তিরিং হাঁসা বন্ধুকে দেখে দৌড়ে এলো এবং তিরিং বলল, বন্ধু এই সুযোগে হাঁস-মুরগি যারা জেলে আছে তাদের সবাইকে ছেড়ে দেও। হাঁসা আর ঘাসফড়িং মিলে সবাইকে ছেড়ে দিল। সবাই হাঁসাকে এবং তিরিংকে ধন্যবাদ দিল এবং সবাই চলে এলো নদীর পাড়ে। মুরগিগুলো উঠল গাছের ডালে আর হাঁসগুলো উড়াল দিল নদীতে। নদীতে নেমে হাঁসা বলল, বন্ধু আমরা সবাই পালিয়ে এসেছি তোমার ওইখান থেকে, তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছ। গাছের ডাল থেকে মুরগিগুলো বলল, কিরে আমাদের খেয়ে সারাজীবন কাটাবি বলে আশা করেছিলি তাই না? শিয়াল দক্ষিণে তাকিয়ে দেখল, তিরিং। তিরিং বলল, তুই আমার বাবা-মাকে মেরেছিলি। আজ আমি তার বদলা নিলাম। এ কথা শুনে শিয়ালগুলো সেখানে অজ্ঞান অবস্থয়া পড়ে গেল মাটিতে। আকাশ গুড় গুড় করছে। ঘাসফড়িং হাঁসা এবং সবার কাছ থেকে বিদায় নিল এবং বলল, আজ আসি বন্ধু আবার দেখা হবে। হাঁসা টাটা দিয়ে বলল, ঠিক আছে বন্ধু আবার দেখা হবে। গাছ থেকে নেমে এলো মুরগিগুলো। নদীর মঝে থেকে আসে হাঁসের রাজা ও রানি এবং অন্য অন্যরা। এসে মুরগি এবং হাঁস বন্ধু হলো। তাই তো তারা একসঙ্গে থাকে, কোনো ভেদাভেদ নেই তাদের মধ্যে। তারা একে অপরের ডিম তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। রাজা-রানি হাঁসাকে ফিরে পেয়ে খুব খুশি। হাঁসাকে বুকে নিয়ে রানি এবং রাজা আদর করতে লাগল। তারা চলে গেল বাড়িতে। এর মধ্যে তুফান হয়ে যায় এবং শিয়ালদের পানির সঙ্গে ভেসে নিয়ে যায় নদীর মধ্যে। মারা যায় শিয়ালগুলো। সেই দেশ থেকে মুক্ত হলো শিয়ালপ-িত। সুখে হাঁস-মুরগি বসবাস করতে লাগল।

লেখক : বগুড়ার সোনাতলা আবদুল মান্নান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী

"