বাবার আদেশ

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবদুস সালাম

রায়হানের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে। তিনি ভালো একটি পদে চাকরি করতেন। অসুস্থ হওয়ার কারণে বয়স শেষ হওয়ার আগেই তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পেনশনের টাকা দিয়ে তিনি কোনোরকমে সংসার চালান। রায়হানরা চার ভাই-বোন। রায়হান সবার বড়। তার বড় বোনের অনেক আগেই বিয়ে হয়েছে। আর ছোট দুই ভাই-বোন এখনো লেখাপড়া করছে। রায়হান বাব-মায়ের আদরের সন্তান। পাড়ার লোকজনরাও তাকে একজন ভালো ছেলে হিসেবেই জানে। তার কপাল খুব ভালো। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাতে ভালো একটি পদে সরকারি চাকরি পায়। এতে মা-বাবা যেমন খুশি হয়, তেমনি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরাও খুশি হয়। পরিবারকে সে বেশ গুরুত্ব দেয়। বাবার পাশাপাশি সেও পরিবারের হাল ধরে। নিজের খরচের টাকা রেখে বেতনের অবশিষ্ট টাকা সে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেয়। ফলে বাবার সংসার চালাতে আগের মতো আর কষ্ট হয় না। ভাই-বোনরাও ভালোভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ পায়। এভাবেই প্রায় দুই বছর কেটে গেল। রায়হানের বাবা একদিন লক্ষ করলেন, ছেলের খরচের হাতটা আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। চাকরি পাওয়ার প্রথমদিকে সে যে পরিমাণ টাকা পাঠাত, এখন তার থেকে অনেক বেশি টাকা পাঠায়। তিনি আরো শুনেছেন, ইতোমধ্যে রায়হান নাকি বেশ কিছু টাকাও ব্যাংকে জমা করেছে। কিন্তু এতে বাবা খুশি হতে পারেননি। তিনি রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন।

কিছুদিন পর রমজান মাস শুরু হলো। বাবা আল্লাহর কাছে ছেলের জন্য দোয়া করলেন। তার ছেলে যেন সৎভাবে জীবনযাপন করে। টাকার লোভ যেন তার অন্তরে বাসা না বাঁধে। ঈদের ছুটিতে রায়হান বাড়িতে আসে। সবার জন্য সে কেনাকাটা করেছে। নিকট আত্মীয়-স্বজনদেরও বাদ দেয়নি। নতুন জামাকাপড় পেয়ে সবাই খুশি হলেও তার বাবা একটুও খুশি হননি। তিনি চিন্তা করলেন, ছেলেকে সাবধান করার এখনই উপযুক্ত সময়। তাই তিনি ছেলেকে একাকী ডেকে বললেন : ‘তুমি এত টাকা কোথায় পেলে?’ বাবার প্রশ্ন শুনে রায়হান ভয় পেয়ে যায়। সে বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, সে বৈধ উপায়ে টাকাগুলো রোজগার করেছে। বাবা সবকিছু শুনে বললেন : ‘আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। আমার অভিজ্ঞতা আছে একজন সরকারি কর্মচারী কত টাকা বেতন পায় এবং সেই টাকা দিয়ে সে কীভাবে জীবনযাপন করে। আমাকে এসব বুঝিয়ে কোনো লাভ হবে না। আমি স্পষ্ট করে আবারও বলছি, তুমি অবৈধ উপায়ে রোজগার করো তা আমি মোটেও চাইনি। যেভাবেই হোক অবৈধ রোজগার তোমাকে বন্ধ করতেই হবে। আর যদি বন্ধ না করো, তাহলে তোমার কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর হ্যাঁ, একটা কথা মনে রাখবে। আর তা হলোÑঅবৈধ পন্থায় যতই রোজগার করবে, তোমার আত্মা ততই অতৃপ্ত থাকবে। অতৃপ্ত আত্মার তৃষ্ণা মেটাতে তুমি হন্যে হয়ে ছুটতে থাকবে জীবনভোর। তবু সে আত্মার তৃষ্ণা মিটবে না সহজে। মানবিক গুণাবলিকে সব ভোঁতা করে দেবে। তোমার বিবেকবোধে মরিচা পড়বে। তখন যেকোনো ঘৃণ্য কাজ করতে তুমি অনুপ্রাণিত হবে। এতে তোমার বিবেক তোমাকে বাধা দেবে না। আর যদি সৎভাবে রোজগার করো, তাহলে দেখবে অভাব-অনটনে থাকার পরও তোমার মনের মধ্যে একটা প্রশান্তির সুবাতাস বইবে। অল্পতে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করবে। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের প্রয়োজন খুব বেশি নয়।’

রায়হান বাবার এসব কথায় কোনো কর্ণপাত করল না। ঈদের ছুটি শেষে সে আবার যথারীতি কর্মস্থলে ফিরে গেল। সে আগের মতো বাবার ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠাতে থাকল। যদিও তার বাবা তা উত্তোলন করেননি। কাঁচা টাকার গন্ধে রায়হান ব্যাকুল। দুই মাস পর সে আবার কোরবানির ছুটিতে বাড়িতে এলো। এককভাবে কোরবানি দেওয়ার জন্য সে পশুরহাট থেকে বড় একটি গুরু কিনে আনল। ছেলে এখনো সঠিকপথ বেছে নেয়নি বুঝতে পেরে বাবার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কোনো উপায় না দেখে তিনি রায়হানকে কড়া ভাষায় বলে দিলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সঠিক পথে ফিরে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার দেওয়া কোনো কিছু গ্রহণ করব না। তাই এই গরু কোরবানির মাংস আমার পক্ষে খাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার ব্যাংক হিসাবে আর কখনো টাকা পাঠাবে না।’ বাবার নিষেধ সত্ত্বেও রায়হান গরুটি কোরবানি দিল। বাড়িতে যেন এই মাংস রান্না করা না হয়। কিন্তু বাবা কোরবানির মাংস স্পর্শ করল না। ফলে রায়হান বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সে খুব লজ্জাও পেল। সে জানে, বাবা খুব নীতিবান মানুষ। তিনি কখনো তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবেন না। বাবার কথা অমান্য করার সাহস এ বাড়িতে আর কারোর নেই। সে হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকে। বাবার আচরণ তার বিবেককে চরমভাবে নাড়া দেয়। শেষ পর্যন্ত রায়হান বাধ্য হলো কোরবানির সব মাংস গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে।

ছুটি শেষে রায়হান আবার কর্মস্থলে ফিরে গেল। তার মনটা তেমন ভালো নেই। বাবার কথাগুলো তার হৃদয়ে প্রতিধ্বনি হতে থাকে বারবার। সে কী করবে তা ভেবে কূলকিনারা পায় না। ছোটবেলার কথা তার একে একে মনে পড়ে যায়। তখন বাবা কীভাবে সংসার চালিয়েছেন। অভাবের মধ্যেও মা কীভাবে হাসি-খুশি থাকতেন। তিনি কষ্টকে কষ্ট মনে করতেন না। তবু সংসারে কোনো দুঃখ স্পর্শ করতে পারেনি। বাবার আদশের কথা স্মরণ করে সে সিদ্ধান্ত নিল, অবৈধ পন্থায় সে আর রোজগার করবে না এবং অন্য কাউকে সে সুযোগ দেবে না। বাবার মতো সৎভাবে জীবনযাপন করবে। চাকরিতে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। অবশেষে তার ব্যাংকে সঞ্চিত টাকা কোনো সোয়াবের আশা না করে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিল। এসব কথা জানার পর রায়হানের বাবা তার প্রতি খুব খুশি হলেন। আর ছেলের জন্য প্রাণভরে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।

"