টাক ঢেকে থাক

প্রকাশ | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শরীফ সাথী

শরৎ বিকেলে সবুজ গালিচায় হাঁটতে কার না ভালো লাগে? যদি সে পথ নদীর তীরে হয়। কাশফুল ঘাসফুল দোল খায়। তেমনি ভৈরব নদীর তীরে সবুজ ঘাসে দাদু ও নাতি বসে জমাচ্ছে মজাদার আড্ডা। নদীর নীল জলের ঢেউ, নীল চোখে দাদু ও নাতি প্রাণ ভরে দেখছে। হঠাৎ নাতির আবদার, দাদু এই গোধূলিলগ্নে চমকপ্রদ গল্প শোনাও না? দাদু নাতির মিষ্টি গালে টোকা দিয়ে, দুষ্টু নাতি বলে, মুচকি হেসে গল্প বলতে লাগল। বহু বহু বছর আগের কথা। পল্লী পাটাচোরা এলাকায় বাস করত টাকুব জমিদার। বিশাল ধনসম্পত্তির মালিক ছিল। বিশাল সম্রাজ্য তার। হাঁস-মুরগির খামার, গরু-ছাগলের খামার, বড় বড় পুকুর ছিল। আর ছিল বিশাল বনভূমি। চারদিকে তাকালে শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজ পাতার ডালে আবডালে হাজার পাখির সুরের মেলা, আনন্দে খেলত খেলা। টাকুব জমিদার যেমন রাগি, তেমনি আবার ঠান্ডা মনের মানুষ ছিল। রাখাল কৃষাণই থাকত তার দু-তিন শ। অ-একটা কথা তো ভুলেই গেছি?

-কী কথা দাদু? দাদু শুনতে খুব ইচ্ছা করছে?

-গরিব অনাথ এতিম ছেলেমেয়ে সেই প্রথম লেখাপড়ার উদ্যোগ নেন এবং পড়ানোর যাবতীয় খরচ জোগান দিত সে। দূর শহরেও লেখাপড়ার জন্য পাঠাত।

-তাহলে তো ভালো মানুষ ছিল। তারপর কী হলো দাদু?

-মানুষের দুঃখ-কষ্ট-ব্যথা আর ভাগ সইতে সইতে, ব্যথায় ব্যথিত হতে হতে পুরো টেনশন করতে করতে পুরো মাথার ছাদ আলগা হয়ে গিয়েছিল।

-দাদু মাথার ছাদ মানে?

-বুঝলে না নাতি? মাথার সমস্ত চুল উঠে টাক পড়ে গিয়েছিল।

নাতি হো হো হো করে হেসে বলল, কী মজা, কী মজা? তেলা টাক তেলা টাক।

-জমিদার একদিন সবুজ বনে ঘুরতে গেল। হাঁটতে হাঁটতে দখিনের হাওয়া খেতে খেতে শেষ প্রান্তে নদীর ধারে এসে বসল। টাক মাথায় হাত বুলাই আর প্রকৃতির রূপ দেখতে থাকে অপলক চেয়ে। চতুর্দিকে যেন প্রকৃতিরা নিদারুণভাবে খেলছে খেলা। চোখের জ্যোতি যেন পলকে পলকে তুলছে ছবি। মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে উদাত্ত আহ্বান তার চোখে মুখে। নদীর অপর প্রান্তে এক অচেনা অতিথি পাখি দেখে খেয়ালি বসে একটি ঢিল ছুড়ে মারল। আর অমনি যা হওয়ার তাই হলো। পাখিটি টাকুব জমিদারের সীমানায় চক্কর মারে আর বলে সুরে সুরে এভাবে, ‘টাক ঢেকে থাক, টাক ঢেকে থাক’। জমিদার আঙিনা মাতিয়ে তুলল। বাতাসের ঢেওয়ে ওই শব্দটি বারবার আঁচড়ে পড়ে। রাজ্যের আকাশে-বাতাসে ভাসতে থাকে টাক ঢেকে থাক-টাক ঢেকে থাক। টাকুব জমিদার যেদিকে যায় হাঁস-মুরগির খামারে গেলে, সবাই তালে তালে নাচে আর ডাকে টাক ঢেকে থাক-টাক ঢেকে থাক। ছাগল-গরুর খামারে গেলে মাথা দোলায় মুখ নাড়ায়, গোঁফ তুলে হাসে আর বলে, টাক ঢেকে থাক-টাক ঢেকে থাক। গাছগাছালির পাখিদেরও যেন একই সুর। টাকুব জমিদার লজ্জায় মঞ্জিল থেকে বাহির হতে চাই না। ওই এলাকায় যেন হাস্য-রস্যের খোরাক হয়ে গেল। ভিনদেশি লোকরা টাকুব জমিদারের বাড়ির কথা বললে, এলাকার লোকজন বলতে থাকে কোথায় যাবেন, টাক্কুর আলীর বাড়ি। টাকুব জমিদার হয়ে গেল টাক্কুর আলী। কোনো বুদ্ধিতেই যেন স্বস্তি আসে না। মন ভেঙে যায়। দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। নিরুপায় হয়ে অবশেষে এক প্রবীণ প-িতকে ডেকে পাঠালেন প্রাসাদে। প-িতের কথামতো, টাক্কুর আলী নাম ঘোচাতে সকালে তেলাকুচো পাতার রস মাথায় লাগাতে লাগল। দুপুরে ঠান্ডা জলে ঘোল ঢেলে মাথায় দিতে থাকে আর রাতে তেল ঘুঁটে মাথায় দিতে থাকে মাসের পর মাস। তবু কোনো পরিবর্তন আসে না। টাক মাথা যেন আরো তেলা হয়ে গেল। শহরের পরিবেশে যেই ছেলেমেয়েদের রেখে লেখাপড়া করাত, তারা বিভিন্ন স্টাইলের ক্যাপ পাঠাতে থাকল। সাদা ক্যাপ মাথায় পরে হাঁসের খামারে গেলে, সাদা সাদা হাঁসেরা পালক ঝেড়ে উঠে লাফাই, হাসে আর ছন্দ তালে বলে, ‘আমরা টাকুর মাথায়, দিয়েছি ঢেকে ছাতায়।’ বিভিন্ন রং মেশানো হলুদ, সাদা-কালো মিক্সড ক্যাপ মাথায় দিয়ে ছাগল-গরুর ফার্মে গেলে আনন্দে তারা আটখানা হয়ে সুরে সুরে ডাকে ‘টাক ঢেকেছে আমার রঙে দেখ না তোরা ঢঙে ঢঙে’ পা নাড়ে আর লেজ নাড়ে, চাই শুধু চাই আড়ে আড়ে। টাক্কুর আলী ক্ষ্যন্ত হয়ে, লজ্জিত মুখ নিয়ে ফিরে আসে মঞ্জিলে, আর ভাবে, পশুপাখি যখন এমন বলে, এলাকার লোকজন আমার সামনে কিছু হয়তো বলছে, না অগোচরে কত কি নাই বলে। অনুশোচনায় ভোগে যদি অতিথি পাখির ঢিল না ছুড়তাম তাহলে এমন হতো না। সুখের জীবনে কালো ছায়া দেখতে পেয়ে টাক্কুর আলী ভেবে সান্ত¦না পায় এতটুকুই। থাক আমার টাক মাথা দেখে যদি সবারই হাসি আসে আর রসিকতা করে, তাহলে আমার কষ্ট কিসের? আমার তো ওদের সঙ্গেই হেসে হেসে আমোদ-প্রমোদ করা উচিত। ভালো কিছু আশা করতে হলে তো গ্রাম্য সাম্রাজ্য থেকে শহরে যেতে ত্রিশ-চল্লিশ মাইল কাদাভরা রাস্তা পাড়ি দিতে হবে। তখনো তো আর এমন মোবাইল-টোবাইলের ঢং ঢং কথা বলার যুগ ছিল না। দুর্বিষহ জীবনযাপন ছিল মানুষের। অবশেষে এমন দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা করতে তার পৌষ্য শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা তাকে দূর শহরের রম্যরাজ্যে নিয়ে গেল। টাক মাথা ঢাক সেন্টারে নিয়ে আধুনিক পরিবেশ গড়তে, চলতে কীভাবে হয় নতুনত্ব কৌশলসহ নতুন জ্বলজ্বলে কেশম চুলের ফিটিং ক্যাপ মাথায় সেটিং করে নিল। টাক্কুর আলী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার জমিদারি স্টাইল মাথা ভর্তি চুল, লম্বা পেঁচানো গোঁফ দেখতে পেল। টাকুব জমিদার নিজ এলাকায় ফিরে ঘোষণা দিল, নিজ সাম্রাজ্যের সামনে বিশাল বৈঠক ডাকার। যেমন কথা তেমন কাজ। এলাকার সমস্ত লোকজন, পশু-পাখি সর্বপ্রাণীর সামনে অবশেষে সাহেবি টাকুব জমিদার হাজির হলো। জমিদারের স্টাইল দেখে সবাই ভয় পেল। মনে মনে অবশ্য সবাই মহাখুশি। বক্তব্য দেওয়া শুরু করল-আজ থেকে এই সাম্রাজ্য আমার একার নয়, সবার। যদি এ এলাকায় কোনো অতিথি মানুষ, পশুপাখি আসে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। সুখের পরিবেশ বানাতে আসুন সবাই এক হয়ে এই সেøাগান দিই-‘সবুজ অরণ্য ভরি, সুন্দর পরিবেশ গড়ি।’

-এমন সময় বাতাসে দাদুর মাথার টুপি খুলে টাক বেরিয়ে পড়ল। নাতি দ্রুত টুপিটা নিয়ে দাদুকে বলল, ও দাদু ভাই তুই ও তুই ও টাক্ ঢেকে থাক্।

"