শরৎ যাপন

প্রকাশ | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মোহাম্মদ অংকন

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। বর্ষা হলো দ্বিতীয় ঋতু। তবে কয়েকদিন হলো বর্ষাকাল শেষ হয়েছে। তাই সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে শরৎ ঋতুর দারুণ আমেজ বইছে। নদী-নালা ও বিল-ঝিলের পানি নেমে যেতেও শুরু করেছে। নদীর ধারের কাশবনগুলো যেন সাদা সাদা কাশফুল প্রজনন করে চলেছে। কী অপরূপ সেসব দেখতে! কী অপূর্ব শরতের দৃশ্য! এবার বর্ষার চিরায়ত সৌন্দর্য সাইবা উপভোগ করতে পারে নাই বলে শরৎকাল শুরু হতে না হতেই সে ঢাকা থেকে নানার বাড়ি ছুটে এসেছে। গ্রামের পথপ্রান্তরে পা রাখতেই যেন সাইবা শরতের সৌন্দর্যে বিমোহিত। শরতের আকাশ দেখে যেন তার মনপ্রাণ ভরে উঠেছে।

নানার বাড়িতে কয়েকটা দিন অতিক্রম হতে না হতেই সাইবা তার ছোট মামার কাছে বায়না করে।

‘মামা, চলো না আমরা একটু নৌকায় ভ্রমণ করি।’

বিল-ঝিল-নদীতে এখন পানি মোটামুটি কমই বলা চলে। স্রোত প্রবাহও তেমন নেই। নৌকা নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে ঘুরে বেড়ানোটা যেন ছোট-বড় সবার জন্যই বেশ আনন্দদায়ক ও নিরাপদ। তাই সাইবার ছোট মামা মিলন ভাগনির কথায় রাজি হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে আমার শহুরে ভাগনি। আগামীকাল বিকেলেই তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব।’

মামার কথা শুনে সাইবা যেন আনন্দে আটখানা হয়ে গেল।

শরতের বিকেলে নৌকা ভ্রমণ করা আর কাশবন দেখা, নদীর ধার দেখা যেন সত্যি অন্যরকম এক অনুভূতির বিষয়। কিন্তু এত অনুভূতি কী দুচোখে ধরবে? সবকিছু মনে রাখা সম্ভব কী? এমন সব কাল্পনিক বিষয় ভাবতেই সাইবার ছবি আঁকাআঁকির কথা মনে পড়ে যায়।

‘যাক বাবা, দারুণ একটা বুদ্ধি পাওয়া গেল। আগামীকাল ছোট মামা যখন বৈঠা দিয়ে নৌকা ঠেলবে আর তখন আমি নৌকার মাচালে বসে বসে রং-তুলি দিয়ে শরতে নদী ও নদীর পারের গ্রামের দৃশ্যগুলো আঁকব। ভাগ্যিস, রং-তুলিগুলো সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। আহ! আগামীকাল কতই না মজা হবে!’

সাইবা ভীষণ ভালো ছবি আঁকতে পারে। এই কয়েকদিন আগে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান অধিকার করে পুরস্কৃত হয়।

মামার কথামতো পরের দিন বিকেলে সাইবাকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ে। ছোট মামা নৌকার বৈঠা ঠেলে আর সাইবা নদীর পানিতে হাত ডুবিয়ে ডুবিয়ে উল্লাস করে। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যকিরণ সাইবার চোখে এসে পড়ে। গরমের আভাস পেতেই মামা বলে, ‘সাইবা, তুমি ছাতার নিচে এসে বসো। একটু পরই রোদের তেজ কমবে।’

সাইবা তার মামার কথামতো একটি লাল ছাতা ফুটিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে। বসে বসে ভাবতে থাকে, ‘কোন দৃশ্যের ছবি আঁকা যায়!’

নৌকা চলতে চলতে অনেক দূরই চলে যায়। নদী পেরিয়ে বিলের মাঝে চলে যায়। সাইবা দেখতে পায়, বিলজুড়ে আমন ধান ভাসছে। মাঝে মাঝে শাপলা ফুল ফুটে আছে। কচুরিপানার ওপর ব্যাঙাচিগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছে। অতঃপর এমনই একটি দৃশ্য সাইবা চটপট তার রং-তুলি দিয়ে এঁকে ফেলে। তারপর ছোট মামাকে দেখায়।

‘মামা, দেখ আমি ছবি এঁকেছি।’

মামা তো ভাগনির ছবি আঁকা দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ করে দেয়। ‘বাহ! চমৎকার হয়েছে।’

তারপর ছোট মামা নৌকা চালিয়ে বিলের পশ্চিমধারে চলে যায়। সেখানে দারুণ দৃশ্য রয়েছে। কয়েকজন কৃষক পানিতে নেমে কাজ করছিল। তাদের দেখে সাইবা তার মামাকে বলে, ‘মামা, তারা পানিতে নেমে আছে কেন?’

ছোট মামা উত্তর করে, ‘কৃষকরা ধানের জমি থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করছে। যাতে ধান ভালো হয়। শরৎকাল হলো আমন ধানের প্রজননকাল। এ সময় ধানের যতœ নিতে হয়।’

‘ও আচ্ছা, আমি বুঝতে পেরেছি। শরতের পর হেমন্তকাল। আর তখনই কৃষকরা এ ধান ঘরে তুলবে, তাই না মামা?

‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ সাইবা মামুণি।’

মামার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সাইবা আরো কয়েকটি দৃশ্যের ছবি এঁকে ফেলে। ‘মামা, শরতের দৃশ্যের এসব ছবি আমি ঢাকায় নিয়ে আমার বন্ধুদের দেখাব। ওরা গ্রাম-বাংলার অপূর্ব রূপ আমার ছবিতে দেখতে পাবে।’

‘হ্যাঁ, নিয়ে যাবে’ বলতে বলতে মামা নৌকা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করে। তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসে। সাইবা আকাশের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় কয়েক ঝাঁক পাখি তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। মামাকে প্রশ্ন করে, ‘মামা, এসব পাখির নাম কী?’

‘এগুলো সাদা বক। শরৎকালে বিলে-ঝিলে এদের চড়তে দেখা যায়। ধানের পোকা-মাকড় ধরে ধরে খায়।’

‘বাহ! কী সুন্দর পাখিং শরৎকালে কত সুন্দর সুন্দর বক পাখি দেখা যায়!’

একসময় সাইবাদের নৌকা বাড়ির ঘাটে এসে ঠেকে। মামা সাইবাকে নৌকা থেকে নামতে তাগিদ দেয়। সাইবা নামতে নামতে মামাকে বলে, ‘মামা, তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। শরতের বিকেলে তুমি আমাকে যে উপহার দিলে তা আমি কখনো ভুলব না। ঢাকায় ফিরে শরৎ যাপনের দিনগুলো খুব মনে পড়বে।’

"