আদিবার স্বপ্ন

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবদুস সালাম

মায়ের কাছে গল্প না শুনলে আদিবার ঘুম আসে না। প্রতিরাতে সে গল্প শোনার জন্য আবদার করে। গতরাতে ফুলপরিদের গল্প শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। গতরাতে ঘুমের মধ্যে সে সুন্দর একটি স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্নে দেখে- দাদার বাড়ি যাওয়ার জন্য গ্রামের নির্জন পথটি ধরে একা একা হাঁটছে। সে বুঝতে পারে না চিরচেনা পথটি কীভাবে এত অচেনা হয়ে গেল। মেঠোপথের দুপাশে অবারিত সবুজ মাঠ। কোনো বাড়িঘরের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার একটু বিশ্রামের খুব প্রয়োজন হয়। হঠাৎ তার চোখে পড়ে পথের ধারে একটি বটবৃক্ষ। ক্লান্তি দূর করার জন্য সে গাছের নিচে গিয়ে বসে। হিমেল হাওয়া বইতে থাকে। চোখ বন্ধ করতেই তন্দ্রাভাব চলে আসে। পরমসুখে একটা ঘুম দেয়। কিছুক্ষণ পরই কে যেন ডাকতে থাকে। সে বলেÑ‘এই যে মেয়ে ঘুম থেকে ওঠো। এখানে এলে কী করে? এক্ষুনি যে আঁধার নেমে আসবে।’ চোখ খুলেই দেখে সুন্দর একটা পরি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আদিবা তাকে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল। সে ভয়ে কাঁপতে থাকে। ‘আমাকে ভয় পেও না। আমি তোমার ক্ষতি করব না। তুমি কোথায় যাবে?’ পরিটা জানতে চায়। ‘আমি দাদার বাড়ি যাব। কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলেছি। অনেকটা পথ হাঁটার পরও সঠিক পথটা চিনতে পারছি না। সবকিছু অচেনা মনে হচ্ছে। তাই এই গাছটার নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।’ ‘হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ। তুমি পথ হারিয়ে ফেলেছ। কারণ এটা পরির দেশ। এখানে কোনো মানুষ থাকে না।’ পথ হারানোর কথা শুনে আদিবা কাঁদতে শুরু করে। সেই পরিটা অভয় দিয়ে তাকে বলে, ‘কেঁদো না। আমি তোমার বন্ধু। এখন বলো তোমার নাম কী?’ ‘আদিবা।’ ‘আর আমার নাম মেঘপরি। মেঘ আমার খুব পছন্দ। আমি মেঘে মেঘে ঘুরে বেড়াই। তাই আমার মা আমার নাম দিয়েছেন মেঘপরি। এই স্থানটি খুব ভয়ংকর। গভীর রাতে এই গাছের নিচে দৈত্যরা এসে নৃত্য করে। এখানে রাত্রিযাপন করা মোটেও নিরাপদ নয়। এক কাজ করো। এখন আমাদের বাসাতে চলো। তোমার দাদার বাড়িতে কীভাবে যেতে হবে তা আমার মায়ের কাছ থেকে জেনে আগামীকাল তোমাকে পৌঁছে দেব।’ আদিবা খুশি হয়ে তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।

আদিবাকে পিঠে চড়িয়ে মেঘপরি উড়াল দিল। সবুজ বনানীর ওপর দিয়ে আদিবা উড়ে যাচ্ছে। চারদিকটা দেখতে চমৎকার লাগছে তার কাছে। কিছুক্ষণ পরই একটি ফুলকানন তার চোখে পড়ে। ফুলকাননে হরেক রকমের ফুল ফুটে আছে। ফুলে ফুলে রং-বেরঙের প্রজাপতি উড়ছে। ফুলকাননের এক কোনায় দেখে কয়েকজন ফুলপরি নৃত্য করছে। আদিবার খুব ইচ্ছা হলো কাছে গিয়ে ওদের নৃত্য দেখবে। সে তার মনের ইচ্ছার কথা মেঘপরির কাছে প্রকাশ করল। তার ইচ্ছার কথা শুনে মেঘপরি বলল, বেশ তাই হবে। এখন তোমার ইচ্ছা পূরণ করব। আমি নিচে নামছি। মেঘপরি ফুলপরিদের সঙ্গে আদিবার পরিচয় করিয়ে দিল। আদিবাকে পেয়ে তারাও খুশি হলো। তারপর সবাই মিলে নৃত্য করল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার কারণে ওরা খুব বেশি সময় নৃত্য করতে পারল না। ফুলপরিরা আদিবাকে সুগন্ধযুক্ত কিছু রঙিন ফুল উপহার দিয়ে বিদায় জানাল। আর বিদায়ের সময় বলল, ‘কালকে আবার এসো কিন্তু। আমরা তোমাকে নিয়ে ফুলকাননে ঘুরে বেড়াব।’

মেঘপরি সন্ধ্যার আগেই তাদের বাড়িতে পৌঁছে গেল। মেঘপরি যে ঘরে থাকে সেই ঘরে আদিবাকে নিয়ে গেল। ঘরটি মূল্যবান আসবাবপত্রে পরিপূর্ণ ছিল। ঘরে ছিল একটি স্বর্ণের খাট। খাটের ওপর বিছানো রয়েছে তুলতুলে পাখির পালকের তৈরি তোশক। সাদা রঙের সোফাসেট। আর কুশনগুলো লাল রঙের। পাশেই রয়েছে রুপার তৈরি একটি ডাইনিং টেবিল। টেবিলের ওপরে আপেল, আঙুর, কমলা, বেদানা, মেওয়া, আম, জামা, কাঁঠাল, কলা, তরমুজ, পেঁপেসহ নানা ধরনের সুস্বাদু ফলমূল রাখা আছে। ওগুলো দেখে আদিবার খেতে খুব লোভ হলো। একটু পরেই লাল টুকটুকে জরির শাড়ি পরে মেঘপরির মা ঘরে প্রবেশ করল। তার মাথায় ছিল হীরার মুকুট। মেঘপরি আদিবাকে তার মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। কীভাবে ওর সঙ্গে দেখা হলো তাও বলল। ওর সমস্যার কথা মেঘপরি তার মাকে খুলে বলল। মেঘপরির মা আদিবাকে আদর করে দুই গালে দুই চুমা দিয়ে বলল, দুশ্চিন্তা করো না। তোমাকে আগামীকাল পৌঁছে দেওয়া হবে। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো আছে। তোমার যা ইচ্ছা তা পেট ভরে খেয়ে নাও। মেঘপরির মায়ের কথা শুনে আদিবা খুশি হলো। সে পেটভরে ফলফলাদি খেল। খাওয়া শেষে দুজন খেলা করল। একটু রাত হলে মেঘপরির মা আবার পোলাও, কোর্মা, বিরিয়ানি রান্না করে নিয়ে এলো। ওই খাবারগুলো থেকে সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। রাতের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আদিবা মেঘপরির সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে আদিবা দেখে ডাইনিং টেবিলটা নানা ধরনের সুস্বাদু খাবারে সাজানো রয়েছে। মজা করে আদিবা ও মেঘপরি সেই খাবারগুলো খেল। আদিবাকে তার দাদার বাড়িতে কীভাবে নিয়ে যেতে হবে তা মেঘপরির মা এসে মেঘপরিকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। আদিবা মেঘপরির হাত দুটি ধরে বলল, বন্ধু তোমাদের এই পরির দেশে আমি আরো একটা দিন থাকতে চাই। তারপর না হয় তুমি আমাকে দাদার বাড়িতে পৌঁছে দিও।’ ‘ঠিক আছে তাই হবে।’ মেঘপরি উত্তর দিল। এরপর মেঘপরি ফুলকাননে নিয়ে গেল আদিবাকে। সেখানে ফুলপরিদের সঙ্গে আদিবার পরিচয় হলো। নাম না জানা অসংখ্য ফুলের সমাহার সেই ফুলকাননে। ফুলপরিরা আদিবাকে ফুলকানন দেখার জন্য নিয়ে গেল। তারা প্রথমে সবুজ ফুলবাগানে প্রবেশ করল। সেখানে তারা দেখল ফুলগুলো সবুজ রঙের। ফুলের ওপর রং-বেরঙের প্রজাপতি উড়ছে। আর গাছের ডালে নানা রঙের পাখিরা মধুর সুরে গান করছে। ফুলের সুগন্ধে আদিবা ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এরপর তারা একে একে লাল ফুলবাগান, নীল ফুলবাগান, হলুদ ফুলবাগান, বেগুনি ফুলবাগান, সাদা ফুলবাগান, গোলাপি ফুলবাগানে প্রবেশ করে। ফুলবাগানে ঘুরতে ঘুরতে একসময় দুপুর হয়ে গেল। ফুলপরিরা আদিবাকে নানা ধরনের ফলমূল খেতে দিল। আদিবা মনের আনন্দে সেই খাবারগুলো খেল। তারপর আবার ফুলপরিদের সঙ্গে খেলতে শুরু করল।

বিকালবেলায় মেঘপরি আদিবাকে নিয়ে মেঘের দেশে বেড়াতে গেল। আদিবা মেঘপরির কাছে জানতে চাইল। এই মেঘ থেকে কীভাবে বৃষ্টি হয়? মেঘপরি বলল, ‘তুমি খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। তাহলে শোন বলছি। সমুদ্রের ফেনায় উৎপন্ন বায়ুর অসংখ্য বুদবুদ বিরামহীনভাবে ফেটে গিয়ে পানির কণাসমূহকে আকাশের দিকে বিক্ষিপ্ত করে। এরপর লবণে পরিপূর্ণ এই কণাগুলো বাষ্পীভূত হয়ে ওপরে উঠে যায়। বাতাসে ভাসমান লবণ স্ফটিক কিংবা ধূলিকণাকে আশ্রয় করে ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয় মেঘমালা। মেঘমালার বিদ্যমান পানি কণাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় তা বাতাসে ঝুলে থাকে আর আকাশে ভেসে বেড়ায়। একপর্যায়ে সেগুলো ঘন ও ভারী হয়ে তৈরি করে বৃষ্টির কণা। বাতাসের চেয়ে ভারী বৃষ্টির কণাগুলো মেঘ থেকে সরে আসে এবং বৃষ্টিধারা হিসেবে মাটিতে নেমে আসতে শুরু করে।’ কীভাবে বৃষ্টি হয় তা জেনে আদিবা খুশি হয়। স্তরে স্তরে সাজানো মেঘমালার ওপর দিয়ে মেঘপরি আদিবাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। চাঁদের দেশে যাওয়ার জন্য আদিবা মেঘপরির কাছে আবদার করে। মেঘপরি বলে পৃথিবী হতে চাঁদের দূরত্ব ৩৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার (প্রায় ২৩৮,৮৫৫ মাইল)। সেখানে আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না। তা ছাড়া চাঁদে কোনো পানি, বায়ু ও অক্সিজেন নেই। ওখানে গেলে আমরা জীবিত ফিরে আসতে পারব না। তাই আমাদের ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। সন্ধ্যার আগেই আমরা বাড়িতে ফিরে যাব।

সন্ধ্যার আগেই মেঘপরি আদিবাকে নিয়ে বাসাতে ফিরে এলো। রাতেরবেলায় মজাদার সব খাবার খেয়ে আদিবা আবার সোনার খাটে মেঘপরির সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। তারা মধুর একটা ঘুম দিল। ভোরবেলায় তারা ঘুম থেকে উঠে পড়ল। মেঘপরির মা তাদের জন্য মজাদার পিঠা-পায়েস, মধু এবং বিভিন্ন ফলের জুস নিয়ে এলো। তারা সেগুলো মজা করে খেল। খাওয়া-দাওয়া শেষে একটু বিশ্রাম নিল। এরপর মেঘপরি আদিবাকে নিয়ে তার দাদার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। পথে যেতে যেতে আদিবা পাহাড়-পর্বত, নদী-সাগর, মাঠঘাট সবকিছু দেখতে পেল। অবশেষে মেঘপরি আদিবার দাদার বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল। মেঘপরি যখন বিদায় নিয়ে চলে গেল, তখন আদিবার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সে মনের দুঃখে কাঁদতে থাকল। তার কান্না শুনে আদিবার মায়ের ঘুম ভেঙে গেল। আদিবার মা তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। সব কথা শুনে আদিবার মা তাকে কোলে নিয়ে আদর করল। আর বলল, মেঘপরির জন্য আর কাঁদতে হবে না। তুমি এতক্ষণ খুব সুন্দর একটি স্বপ্ন দেখছিলে। আবার ঘুমিয়ে পড়ো।

 

"