ছোটদের কবি নজরুল

প্রকাশ | ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

‘ভোর হল দোর খোল/খুকুমণি ওঠরে/ঐ ডাকে যুঁই শাঁখে/ফুলখুকী ছোটরে’Ñএ ছড়াটি কে শুনেনি! এ রকম আরো অনেক শিশুর জন্য লিখেছেন আমাদের জাতীয় কবি প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটদের জন্য বেশ কিছু ছড়া ও কিশোর-কবিতা, গান লিখেছেন। গ্রামের সাধারণ দৃশ্য ও শিশুদের পছন্দমতো বিষয় বেছে নিয়ে দারুণ ও সাবলিক ছড়া/কবিতা লেখেন।

কবি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১৩০৬ বঙ্গাব্দ ১১ জ্যৈষ্ঠ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারের জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জায়েদা খাতুন। কবি গ্রামের মক্তব থেকে প্রাইমারি পাস করেন। যেটা এখন কবিতীর্থ চুরুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ। নজরুলের চুরুলিয়াকে ভারতে সরকারিভাবেই ‘কবিতীর্থ’ বলা হয়। জানা দরকার, ‘কবিতীর্থ’ আর রবিঠাকুরের ‘শান্তিনিকেতন’ একই জেলায়-বর্ধমানে। তিনি বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর হাইস্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। এরপর কাউকে না জানিয়ে চুরুলিয়াতে পালিয়ে যান কবি। এরপর ভর্তি হলেন বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জ হাইস্কুলে। এখানে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় প্রথম মহাযুদ্ধে যোগদান করেন। কবি আর বেশিদূর পড়া এগোতে পারেননি! দুঃখ-কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছেন বলে সবাই দুঃখু মিয়া বলে ডাকত পরিবার বা চুরুলিয়া গ্রামের মানুষজন। নজরুল তার সিদ্ধহস্তে অসংখ্য ছড়া লিখেছেন। নজরুলের শিশুতোষ ছড়ার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যÑপিলেপটকা, খাদু দাদু, লিচু চোর, মটকু মাইতি, খুকি, কাঠবিড়ালী প্রভৃতি। তাঁর ‘ঝিঙেফুল’ কাব্যে ১৩টি ছড়াই খুবই মজার।

নজরুলের সঙ্গে আলী আকবর নামের এক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়েছিল। ভদ্রলোকটি শিশুদের পাঠ্যবই লিখতেন। একদিন শিশুদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির জন্য আলী আকবর সাহেব কবিতা লিখে নজরুলকে দেখিয়েছিলেন। নজরুলের কাছে লেখাটা যথাযথ মানের মনে হয়নি বলে নজরুল ভদ্রলোককে বলেছিলেন। তখন আকবর আলী সাহেব নজরুলকে লিখতে বলেছিলেন একটি কবিতা। তখন নজরুল লিখলেন :

‘বাবুদের তাল পুকুরে/হাবুদের ডাল কুকুরে/সেকি ব্যাস করলো তাড়া/বলি থাম একটু দাঁড়া।’

কলকাতার স্কুলে যাওয়া দুশিশু রোজ পাঠশালাতে যেত। একজন ছিল দারুণ বেঁটে আর মোটা, অন্যজন টিনটিনে শুকনো আর ছিপছিপে লম্বা। অনেকটা তালপাতার সেপাইয়ের মতো। এ দুজনকে দেখে নজরুল এতটাই মজা পেয়েছিলেন, একদিন হঠাৎই তিনি লিখেছিলেন :

‘মটকু মাইতি বাঁটকুল রায়/ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে যায়/বেঁটে খাটো নিটপিটে পায়/ছের চলে কের চায়/মটকু মাইতি বাঁটকুল রায়।’

কবি কাঠ বিড়ালিকে নিয়ে লিখে ফেললেন চমৎকার একটি ছড়া। ছড়াটি হলোÑ‘কাঠ বিড়ালি কাঠ বিড়ালি/পেয়ারা তুমি খাও/গুড় মুড়ি খাও/বাতাবি নেবু লাউ।’

শুধু শিশুদের চঞ্চল মন মাতিয়ে রাখার পদ্যই লিখেননি নজরুল, শিশু-কিশোরদের মনে তাদের মতো করেই গভীর ভাব জাগিয়ে তোলারও চেষ্টা করেছেনÑএমন মহান কারিগর। নজরুল লিখলেন :

‘নতুন দিনের মানুষ তোরা/আয় শিশুরা আয়!/নতুন চোখে নতুন লোকের/নতুন ভরসায়।/নতুন তারায় বেভুল পথিক/আসলি ধরাতে/ধরার পার আনন্দ-লোক/দেখাস ইশারায়।/খেলার সুখে মাখলি তোরা/মাটির করুণা,/এই মাটিতে স্বর্গ রচিস,/তোদের মহিমায়।’

তোমাদের জন্য অনেক মজার ছড়া লিখেছেন নজরুল। তার লেখা পিলে পটকা, খাঁদু-দাদু, মাইতি, লিচুচোর আর খুকি ও কাঠবিড়ালির মতো শিশুতোষ মজার ছড়া অন্য কোনো কবি আজও লিখতে পারেননি।

বাংলা কাব্য তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হলো ইসলামী সংগীত তথা গজল। ১৩৪৪ সালে মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন সম্পাদিত ‘শিশু সওগাতে’র প্রথম সংখ্যায় ‘শিশু সওগাত’ নামের কবিতায় : ‘ওরে শিশু, ঘরে তোর এল সওগাত/আলো পানে তুলে ধর ননী-মাখা হাত।/নিয়ে আয় কচি মুখে আধো আধো বোল,/তুলতুলে গালে ভরা টুলটুলে টোল।/চকচকে চোখে আন আলো ঝিকমিক।’

শেষ অংশে... ‘ডালে ডালে ঘুম-জাগা পাখীরা নীরব,/তোর গান শুনে তবে ওরা গাবে সব।’

আমাদের ‘রণসংগীত’ চল চল চল... তাঁর লেখা। সংকল্প কবিতা কে না জানে! শিশুমনের ইচ্ছে-আকাক্সক্ষা তুলে বিশ্বজয়ের কথা তুলে ধরেছেন এ কবিতায়। নজরুলের শিশুসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ। তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে প্রথাগত প্রবণতা থেকে মুক্তি দিয়ে বাস্তবমুখী চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। নজরুলের এ অবদান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যময়। ছড়া শুধু শিশুভোলানোর জন্য নয়, তা নজরুল লিখে বোঝালেন। ছোরার উপাদনে যোগ করলেন নতুন উপাদান। কল্পনা, রূপকথা ইত্যাদি বাদ দিয়েও ছড়া হতে পারে তা তিনি দেখালেন। প্রজাপতি, কাঠবিড়ালি, ঝিঙেফুল বা সামনে থাকা ভিন্নরূপের শিশু/জিনিস নিয়ে চমৎকার ও মজার ছড়া-কবিতা লিখলেন। শিশুতোষ ছড়া/সাহিত্য সংখ্যায় কম হলেও মানে কালজয়ী মর্যাদা পেয়েছে তার প্রায় সব ছড়া-কবিতা। এখনো শিশুরা আবৃত্তি করতে বেছে নেয় ‘খুকি ও কাঠবিড়ালী’, লিচুচোর, প্রভাতি ইত্যাদি ছড়া-কবিতা।

নজরুল ছোটদের অনেক ভালোবাসতেন। আদর করতেন। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে কবির জন্মদিনে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশে নিয়ে এনে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। এই মহান কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে কবর দেওয়া হয়।

 

"