গল্প

ঘোড়দৌড়

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

মোহাম্মদ অংকন

সেদিন টিফিনের পরপরই স্কুল ছুটি হয়ে যায়। শুভ, ফারদিন ও আনাস তিন বন্ধু কাঁধে স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রতিদিনের মতো রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। ওদের মধ্যে বেশ সখ্য। তাই একে অপরকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করছিল। এমন সময় তারা একটা মাইকিংয়ের আওয়াজ শুনতে পেল।

‘ঘোষণা! ঘোষণা! আজ বিকাল চার ঘটিকায় কালিনগর পূর্বপাড়া মাঠে এক বিশাল ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। আপনারা আমন্ত্রিত...।’ এমন ঘোষণা শুনে তিন বন্ধুই যেন থমকে দাঁড়াল। মনে উল্লাস নিয়ে তিনজনই সমস্বরে বলে উঠল-‘হুর-রে, আমরা ঘোড়দৌড় দেখতে যাব।’ তিনজনের মধ্যে কতই না মিল! সবার মনে একই ভাবনা খেলা করছে। কিন্তু পরক্ষণেই তাদের তিনজনেরই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কেননা, বাড়ি থেকে এই চৈত্রের দুপুরে তাদের কোথাও যেতে দেবে না, এটা ধ্রুব সত্য। কিন্তু এখন উপায় কী?

তিন বন্ধু মৃদু পায়ে হাঁটছে আর ভাবছে, ‘কী করা যায়! কীভাবে পরিবারকে ফাঁকি দিয়ে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা দেখতে যাওয়া যায়!’ হঠাৎ দুষ্টু বুদ্ধির শুভ সবাইকে অভয় দিয়ে বলল, ‘চিন্তা করিস না তোরা। আমি একটা উপায় বের করে ফেলছি।’ ফারদিন শুভর এমন কথায় উৎসুক হয়ে গেল। ‘বল না দোস্ত, কী উপায় বের করলি?’ ওদিকে আনাসও শুভর উপায়ের কথা শুনতে বেশ আগ্রহী। ‘দেরি করিস না তো। বল না, তর সইছে না আর।’ তাই শুভও আর দেরি না করে দুজনের কানের কাছে চুপিচুপি ঘোড়দৌড় দেখতে যাওয়ার উপায়ের কথাটি বলল। বিকাল তিনটা বেজে গেছে। বুদ্ধি অনুযায়ী এখনই তিনজনের বাড়ি থেকে বেড় হওয়ার পালা। কিন্তু এতে তিনজনেরই বাধা আছে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। শুভ চুপিচুপি বাড়ি থেকে বের হওয়ার উপক্রম আর তখনই তার বাবার হাঁকডাক।

-কী ব্যাপার শুভ, এ রোদের মধ্যে কোথায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছো?

-না, মানে আব্বু একটু ফারদিনদের বাড়িতে যাচ্ছি।

-ওদের বাড়িতে কেন? মাত্রই তো ওর সঙ্গেই স্কুল থেকে ফিরলে?

-আব্বু, ওর আজকে জন্মদিন। তাই...

-ও আচ্ছা। ঠিক আছে যাও। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু।

মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে শুভ বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করতে লাগল। ওদিকে ফারদিনও তার আম্মুর হাতে ধরা পড়ে যায়।

-ফারদিন, এখন কোথাও যেও না বাবা। একটু বিশ্রাম নাও, ঘুমাও। বিকাল হলেই পড়তে বসতে হবে। কদিন পর পরীক্ষা।

-না, আম্মু। আজ তো শুভর জন্মদিন। তাই ওদের বাড়িতে যাচ্ছি।

-শুভর জন্মদিন তো কয়েকদিন আগেই পালন করলে? আজ আবারও?

-না আম্মু, ওটা শুভর ছোট ভাই সিয়ামের জন্মদিন ছিল।

-আচ্ছা, যাও তাহলে। দেখেশুনে যেও বাবা।

ফারদিনও শুভর মতো জন্মদিন পালন করার কথা বলে মুক্তি পেয়ে গেল। অতঃপর তারা দুজন রাস্তায় একত্র হলো। কিন্তু এখনো তো আনাস এসে পৌঁছায় নাই। তাই ওরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

শুভ ফারদিনকে বলছে, ‘ও বোধহয় আমার বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে পারে নাই।’

ফারদিন উত্তর করল, ‘ঠিক তাই মনে হয়। কেন সে এখনো আসছে না?’ দশ মিনিট পার হতে না হতেই হাঁপাতে হাঁপাতে আনাস এসে হাজির হলো। শুভ আনাকে জিজ্ঞেস করল।

-কী রে তোর আসতে দেরি হলো কেন?

-আরে দোস্ত বলিস না, আম্মু আমাকে আসতে দিচ্ছিল না।

-কেন? তুই কি ফারদিনের জন্মদিনের কথা বলিসনি?

-বলেছি। কিন্তু তারপরও বলে, জন্মাদিনে যেতে হবে না। তারপরও অনেক কষ্ট করে বুঝিয়ে চলে আসলাম।

-চল তাহলে এবার আমরা রওনা করি।

একটি গ্রাম পাড়ি দিলেই পাওয়া যাবে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার মাঠ। তাই তিন বন্ধু হাঁটতে শুরু করল। অনেক মানুষই সেদিকেই যাচ্ছে। তাই ওদের আর ওদিকে যেতে বেগ পেতে হলো না। কাউকে জিজ্ঞেস করতে হলো না-মাঠটা কোন দিকে। চারটে বাঁচতে না বাঁচতেই ওরা মাঠে পৌঁছে যায়। মাঠ যেন লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। দূরদূরান্ত থেকে দল বেঁধে মানুষ এসেছে ঘোড়দৌড় দেখতে। কেউ কেউ মাঠের দুর্বাঘাসের ওপর বসে পড়েছে, কেউ কেউ গাছের ওপর উঠেছে। মাঝেমধ্যে ঘোড়-শৌররা ঘোড়া নিয়ে টহল দিয়ে যাচ্ছে। জনগণ চিৎকার দিয়ে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। মাইকে ঘোষণা দিচ্ছে, ‘প্রিয় দর্শকম-লী, আপনাদের স্বাগতম। অল্পকিছু সময়ের মধ্যে আপনাদের কাক্সিক্ষত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আরম্ভ হবে। আপনারা সুশৃঙ্খলভাবে মাঠের সীমানার বাইরে বসে পড়–ন। শুভ, ফারদিন ও আনাস মাঠের দক্ষিণপ্রান্তে বসে পড়ল।

কিছুটা সময় অতিক্রম হতেই ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। প্রায় দশটি ঘোড়া পূর্বপ্রান্ত থেকে ছুটতে শুরু করল। ঘোড়ার ওপর চড়ে বসেছে ছোট ছোট সব ছেলেমেয়ে। এসব দেখে তিন বন্ধুর একটু ভয়ই হলো। কিন্তু জনগণ যেন আনন্দ ধরে রাখতে পারছে না। দেখতে দেখতে তিন বন্ধুর চোখের সামনে দিয়ে ঘোড়াগুলো একটি চক্কর দিয়ে গেল। ঘোড়া যত দৌড়াচ্ছে, উল্লাস তত বাড়ছে। হঠাৎ দুটো ঘোড়া পড়ে গেল। নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে গেল। এমনই করে ঘোড়দৌড় চলতে চলতে একটি সাদা ঘোড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে গেল। ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয়ও হলো। মাইকে প্রতিযোগীদের নাম ঘোষণা করতেই যেন সবাই আনন্দ করতে লাগল। সবার সঙ্গে ওরা তিন বন্ধুও উল্লাস করল। তারপর সাঁঝ নেমে আসার আগেই তারা বাড়ি ফিরে গেল। তাদের পরিবার যেন বুঝতেই পারল না, তারা কোথায় গিয়েছিল।

 

"