বাংলাদেশের স্থপতি

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

কবির কাঞ্চন

বিলাস এইমাত্র স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে। ওর আজকের দিনটা প্রতিদিনের মতো হয়নি। ওদের শ্রেণিশিক্ষক প্রথম ঘণ্টায় এসে রোল কল শেষ করেই ডায়েরি বের করতে বললেন। বিলাসসহ ওর বেঞ্চের সহপাঠীরা একে অন্যের মুখের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকায়। স্যার প্রতিদিন ক্লাসে এসে রোল কল করেন। এরপর পাঠদানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যে আয়া নোটিস খাতা নিয়ে এলে স্যার পাঠে একটু বিরতি নেন। নিজে নোটিসে চোখ বোলান। এরপর জোরে জোরে শব্দ করে তা ক্লাসে পড়ে শোনান এবং ছাত্রছাত্রীদের তা ডায়েরিতে তুলে নেওয়ার তাগিদ দেন। কিন্তু আজ কোনো আয়া নোটিস খাতা নিয়ে আসেনি। স্যার হাজিরা খাতার ভেতর থেকে একটি রঙিন কাগজ বের করে বোর্ডে লিখতে লিখতে বললেন,

-আগামী ১৫ আগস্ট আমাদের জাতির জনকের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তোমাদের জন্য বিভিন্ন ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ করে তোমরা যারা ছবি আঁকতে পারো, তাদের জন্য সুখবর হলো-এবার জাতীয় শোক দিবসে তোমাদের অঙ্কনের বিষয় হলো ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মনের মতো ছবি আঁকা’। তোমরা যারা এতে অংশ নেবে তারা সামনে এসে আমার কাছে নাম জমা দিতে পারো।

এই কথা বলে স্যার চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন। ব্যাগ হতে আরো কিছু কাগজ নিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন। ডায়েরির লেখা তুলে নিয়ে আগ্রহীরা স্যারের কাছে নিজেদের নাম জমা দিল।

এরপর স্যার আবার বললেন,

-আর কেউ অংশ নেবে? এরপর কিন্তু আর কারো নাম জমা নেওয়া হবে না।

বিলাসকে দাঁড়াতে দেখে স্যার বললেন,

-বিলাস, তুমি তো ভালো আঁকতে পারো। নাম জমা দিচ্ছো না কেন?

বিলাস একটু ভেবে নিয়ে বলল,

-স্যার, অঙ্কনের নির্ধারিত বিষয় নিয়ে আমি খুব চিন্তিত।

স্যার বিস্মিত হয়ে বললেন,

-এত সুন্দর একটি বিষয় পেয়ে আবার কিসের চিন্তা!

-স্যার, নিঃসন্দেহে বিষয়টা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সমস্যাটা আমার মনের মধ্যে।

-মানে?

-আমার দাদার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জেনেছি। বঙ্গবন্ধু কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। মা, মাটি দেশকে তিনি জীবন দিয়ে ভালোবেসে গেছেন। ক্ষমতার লোভ পর্যন্ত করেননি। এমন একজন মহান নেতার ছবি আঁকতে মনের বল লাগে। মনের মাঝে অসীম ভালোবাসা লাগে। আমি কী তাঁর সুন্দর ছবি আঁকতে পারব, স্যার! বিলাসের কথাগুলো শোনে স্যার ওর আরো কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর পিঠে হাত রেখে বললেন, অবশ্যই পারবে। বঙ্গবন্ধুর জন্য যার বুকে এমন শ্রদ্ধা আছে, তার আঁকা ছবি হবে মনের মতো। আচ্ছা তোমার দাদা কি কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন?

-হ্যাঁ, দাদু বলেছেন, ৭ই মার্চের সেই ভাষণে তিনি নাকি বিশাল জনসমুদ্রের সামনের দিকে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছিলেন, তখন লাখো মানুষের সেøাগানে পুরো ময়দান উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এরপর মাইকের সামনে দাঁড়াতেই চারদিকে সুনসান নীরবতা।

দাদুর মতে, নেতা এলেন, দিকনির্দেশনা দিলেন আর উদ্বেলিত জনতার মনে প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করার বীজ বোপন করে চলে গেলেন। এরপর স্যার বিলাসকে বললেন, বাসায় গিয়ে তোমার দাদুকে আমার সালাম জানাবে।

‘জি স্যার’ বলে বিলাস ঘাড় নাড়ে।

স্যার ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর বিলাস বন্ধুদের সঙ্গে নিজের দাদার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার গল্প শোনায়। বন্ধুরা দাদুর সাক্ষাৎ লাভের জন্য বিলাসের কাছে বায়না ধরে। বিলাস তাদের দাদুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার কথা দেয়। কিছুদিন পর বিলাসের দাদা ওর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে স্কুলের দিকে আসেন। ততক্ষণে স্কুল ছুটি হয়ে যায়। দাদুকে দেখে বিলাস ও তার বন্ধুরা খুশি হয়ে এগিয়ে আসে। বিলাস তার বন্ধুদের সঙ্গে দাদুকে পরিচয় করিয়ে দেয়। পরিচিত হয়ে কথা বলতে বলতে তারা স্কুলের মাঠের এককোণে শহীদ মিনারের পাশে গিয়ে বসলেন। বিলাসের বন্ধুরা একজন মুক্তিযোদ্ধার সান্নিধ্য পেয়ে ভেতরে ভেতরে কৌতূহলী হয়। মহান এই মুক্তিযোদ্ধাকে ঘিরে মনে মনে শ্রদ্ধাবোধ জাগে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে অস্ত্র ধরার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। এ জন্য প্রায় অনুশোচনা করে। জন্মটা কেন একাত্তরের আগে হলো না? আবার ভাবে, জন্মে তো আল্লাহ ব্যতীত কারোর হাত থাকে না। দাদু বিলাসের সহপাঠী মুনিরকে ভাবনায় নিমগ্ন থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

-কী ভাবছো, দাদু?

-আপনাকে।

-আমাকে মানে!

-আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন যোদ্ধাকে সামনাসামনি দেখছি। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে। আমাদের দেশের প্রকৃত বীর কিন্তু আপনারাই। বিলাসের দাদু ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, না, দাদুভাই আমাদের দেশের প্রকৃত বীর একজনই। আর তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা দেশবাসী ছিলাম সেই বীরের অনুসারী।

-সরি, আপনি যেভাবে ভাবছেন আমি সে অর্থে বলিনি। আমার মতে, দেশের ডাকে সেদিন যারাই সাড়া দিয়েছিলেন, তারা সবাই হিরো। আচ্ছা, বিলাসের কাছ থেকে জেনেছি আপনি নাকি রেসকোর্স ময়দানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে উপস্থিত ছিলেন। সেই অবিস্মরণীয় দিনটিতে আপনার অভিজ্ঞতার কথা যদি আমাদের বলতেন।

-সেদিন খুব ভোরের দিকে আমরা মিছিল নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছি। বেলা যত গড়াতে থাকে, তত মানুষের ঢল নামতে থাকে। আমরা আগে আগে পৌঁছেছিলাম বলে একেবারে মঞ্চের কাছে বসার সৌভাগ্য হয়। মূলত দুপুর তিনটার পর থেকে আমাদের মন ছটফট করতে থাকে। নেতার কাছ থেকে সঠিক নির্দেশনার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকি। মাঝেমধ্যে গা গরম করতে সেøাগান ধরি। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মঞ্চে আসেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রাণের নেতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি প্রথমে উপস্থিত জনতার অভিবাদন গ্রহণ করলেন। এরপর পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির সব ষড়যন্ত্রের বর্ণনা দিলেন। ১৮ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম... বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠের এই ভাষণে আমরা সেদিন উজ্জীবিত হই। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে আমরা যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেলাম।

সবাই প্রিয় জন্মভূমিকে শত্রুমুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরে আসি। তারপরের ঘটনা তো সবার জানা। আমাদের অসীম ত্যাগের ইতিহাস। বিলাস ও তার বন্ধুরা খুব আগ্রহী মনে শুনছিল। এরপর রেজা পাশ থেকে বলল, দাদু, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই।

-যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু আবার নতুন করে দেশ গড়ার কাজে হাত দেন। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে লাগলেন। বিশ্ব নতুন এক স্বাধীন রাষ্ট্রকে আবিষ্কার করে। চারদিকে বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নেতারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ধন্য হতেন। কিন্তু...। হঠাৎই যেন দাদুর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো! অবাক হয়ে সবাই খেয়াল করল, তার চোখ জলে ভরে গেছে এবং অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বিলাস ও তার বন্ধুরা দাদুর আরো কাছে বসে দাদুর কান্না থামানোর চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর দাদু নিজেকে সামলে নিয়ে আবেগী গলায় বললেন,

-তারপর ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কিছু কুলাঙ্গার রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বিলাস দাদুর মুখের দিকে লক্ষ্য করল। তখনো দাদুর চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। স্বজন হারানোর নিদারুণ কষ্ট দাদুর হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করছে। বিলাস সন্দেহের চোখে বলল,

-আচ্ছা দাদু, বঙ্গবন্ধুর জীবনের গল্প বলতেই যেভাবে কাঁদলে তাতে মনে হচ্ছে তিনি আমাদের পরিবারের কেউ! বিলাসের দাদু খুব আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন,

-তুমি একদম ঠিক কথা বলেছো, দাদুভাই। সত্যি তো বঙ্গবন্ধু আমাদের পরিবারের কেউ নন। তবে এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, তিনি আমাদের আত্মার লোক। তার সাথে বাঙালির সম্পর্ক রক্তে নয়; আত্মার। স্বার্থে রক্তের বাঁধন ছিঁড়ে; আত্মার বাঁধন জনম জনম অটুট থাকে। তা ছাড়া পিতাকে কি কভু ভোলা যায়?

বিলাসের বন্ধু আদিত্য বলল,

-না, তা কি করে সম্ভব! পিতা তো পরম শ্রদ্ধার পাত্র।

দাদু শন্তানুর দিকে চোখ রেখে বললেন,

-এ বিষয়ে তুমি কি কিছু বলবে?

-ঈশ্বরের কৃপায় পিতার জন্যই তো জীবন পেয়েছি।

শন্তানুর কথা শেষ হতে না হতেই দাদু উজ্জ্বল মুখে বললেন,

-তোমাদের বাবা যেমন তোমাদের জন্ম দিয়েছেন বলে তোমরা বাবাকে ‘বাবা’ বলে পরম শ্রদ্ধা করো। তেমনি যে দেশটিতে আজ তোমরা সুখে-শান্তিতে বড় হচ্ছো এর স্থপতি মানে জন্মদাতা কিন্তু এই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্যই তিনি আমাদের বাঙালি জাতির পিতা।

দাদুর কথাগুলো শোনে বিলাস ও তার বন্ধুরা মুগ্ধ চোখে দাদুর মুখের তাকিয়ে থাকে। দাদু সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, আগামীকাল তো জাতীয় শোক দিবস। তোমাদের ছবি আঁকার কী খবর?

তখন ওরা প্রায় একসঙ্গেই বলল, ‘দাদু আপনার কাছ থেকে গল্প শুনে না দেখা সেই মহান ব্যক্তিটির ছবি আমাদের হৃদয় ক্যানভাসে ইতোমধ্যে এঁকে ফেলেছি। এখন শুধু কাগজে আঁকার অপেক্ষা। আশা করছি অবশ্যই ভালো হবে। আপনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ দাদু হাসতে হাসতে গর্ব করে বললেন, যে জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার পিতাকে এত ভালোবাসতে পারে, সে জাতির উন্নতি তো সময়ের ব্যাপারমাত্র। আশা করি, তোমাদের কাছে আমাদের সীমাহীন ত্যাগে অর্জিত পতাকার সম্মান অক্ষুণœ থাকবে। বিলাস ও তার বন্ধুরা দাদুর চোখে চোখ রেখে দেশের জন্য সর্বদা কাজ করার শপথ নেয়। এরপর দাদু সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনারের সামনে এসে দাঁড়ায়। পরম শ্রদ্ধায় জাতির সূর্যসন্তানদের স্মরণ করে।

 

"