গল্প

বিশ্বকাপ

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৮, ০০:০০

সাহিদা সাম্য লীনা

ক্লাসে হইচই, চেঁচামেচি। লাভলী ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকেই স্টুডেন্টদের দিলেন ধমক। কী হচ্ছে এসব...? এত চেঁচামেচি কেন? এত বড় হয়েছো তোমরা, ক্লাস ফাইভে পড়ো, ছোট ক্লাসের বাচ্চাদের মতো দুষ্টুমি করো। এবার সবাই নীরব। ছেলেগুলো একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। মুখ টিপে হাসে। এ ক্লাসে মেয়ে আছে মাত্র চারটি। ওরা ওদের মতো শুরুতে যেমন ছিল, তেমনই বসে থাকল। অবশ্য ওদের মধ্যেও যে বিশ্বকাপ নিয়ে কথা হচ্ছে না, তাই নয়। ছেলেগুলো আবারও সরব হয়ে ওঠে এবং কী যেন বলে একে অন্যের সঙ্গে। ম্যাডাম দেখতে পান তা। ম্যাডাম বলেন আচ্ছা, তোমরা আজ কী নিয়ে এত কথা বলছো? পিঞ্জন দাঁড়ায়, ও বলে ম্যাডাম আমরা না, বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলছিলাম। আর তো কদিন পরই বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা তাই ম্যাডাম..। এবার ম্যাডাম বুঝতে পারলেন এত হইচইয়ের কারণ। ম্যাডাম বললেন, হয়েছে এবার খেলার কথা বাদ দেন। এখন পড়াশোনা করেন। ছেলেরা ক্লাসে পড়ায় মন দেয়। তবু পড়ায় কী মন বসে?

প্রতিদিন পিঞ্জন স্কুল থেকে এসে বিশ্বকাপের উত্তেজনা নিয়ে বোনের সঙ্গে আলাপ করে। স্কুলে-বন্ধুদের কাছে যা শুনে সব বলে। বোন এসবের ব-ও বোঝে না। তবু যা বোঝে তাতে ভাইয়ের সঙ্গে সাড়া দেয়। ওদের মা দেখেন আর হাসেন। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে পিঞ্জন হকারের অপেক্ষায় থাকে। কখন হকার আসবে প্রতিক্ষা! ওদের বাবা টেবিলে বসে থাকেন। ছেলেমেয়েকে অঙ্ক করাবেন বলে। কিন্তু ছেলে পিঞ্জন পত্রিকায় খেলার পাতাটা নিয়ে বুঁদ হয়ে আছে। যখন টেবিলে আসে পিঞ্জন, তখন বাবাকে বলে আচ্ছা, আব্বু কাকা কোন দেশের খেলোযাড়? যদিও সে প্রায় খেলোয়াড় কে কোথাকার জানে, তবুও বলে। পড়ালেখায় ফাঁকি এই আর কি? ছেলের মুখে শুধু খেলার কথা আজ কদিন। বাবা হাসেন আর ছেলের কথার জবাব দেনÑকাকা ব্রাজিলের খেলোয়াড়। এরপর বাবা-ছেলে শুরু হয় খেলা নিয়ে নানা বিতর্ক, আলাপ-আলোচনা। বিদ্যুৎ ঝলকানির মতো পিঞ্জন অনর্গল বলতে থাকে ব্র্রাজিল, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেটিনা, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি দেশের খেলোযাড় আর তাদের খেলার ধরনের কথা। বাবা ব্রাজিল, ছেলেও ব্রাজিল। বোনটা আস্তে করে বলে, আব্বু আমিও ব্রাজিল।

পিঞ্জন বলে, আম্মু তুমি না আর্জেন্টিনা? মা-ছেলের গালে চুমু খায় আর বলে হ্যাঁ, আব্বু। এবার তুমি পড়ো।

পিঞ্জনের জন্য বড় একটা পতাকা ওর আব্বু কিনে নিয়ে এসেছেন। বাবা-ছেলেতে মিলে সেটা শক্ত করে বেঁধে বারান্দায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। পিঞ্জন মহাখুশি। সন্ধ্যায় মা পড়াতে বসান ছেলেমেয়েকে। এবারও শুরু করে পিঞ্জন বিশ্বকাপের গল্প। সারা দিন বিশ্বকাপ ফুটবল, রোনালদো, মেসি, দুঙ্গা, কাকার কথা শুনতে শুনতে মা একেবারে অতিষ্ঠ। তবু তিনি ছেলের আনন্দের খোরাক জোগাতে ফুটবলের নানা কাহিনি শোনান। সেই জুলেরিমে হারানো বিশ্বকাপের কথা। ম্যারাডোনা কে? কীভাবে ম্যারাডোনা এলেন ফুটবল খেলায়। এখন সে যে সেই আর্জেন্টিনার কোচ দিয়াগো ম্যারাডোনা। বিশেষ করে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত গোল। যেটা ইশ্বরের গোল নামে পরিচিত। মা যত বলে ছেলে তত প্রশ্ন করে। আম্মু আমাদের ক্লাসে সবাই পেলের কথা বলছিল। এটা কে? ছেলের এত জানার আগ্রহে মা ভীষণ অবাক হন। আদর করে বলেন, তুমি ব্রাজিল সমর্থক; অথচ পেলের কথা জান না? অবশ্য জানবে কী করে। ও তো ধরতে গেলে এই প্রথম বিশ্বকাপ দেখবে। চার বছর আগে পিঞ্জন অনেক ছোট ছিল। তখন বিশ্বকাপ ভাবনা ওর মাথায় এতটা আসেনি। ক্লাসেও বন্ধুদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হতো না। সেই ১৯৫৮ সালে মা ফিরে যান। ওর মায়েরও জন্মের অনেক বছর আগের কথা। ১০ নম্বর জার্সি পরা ১৭ বছর বয়সী এডসন আরেন্টস ডোনাসিমান্টো যাকে সারা বিশ্ব পেলে নামে চিনে। এবার মা-ছেলেকে পড়া করতে বলেন। মা মনে মনে একটু বিরক্ত হন।

রাতে ওর আব্বু বাসায় এলে কথাটা তোলেন তিনি। আচ্ছা ছেলেটা খেলা খেলা করে দিন পার করছে। এর ওপর বিশ্বকাপ, ওর রাত, দিন-চব্বিশ ঘণ্টা শুধু বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা। সামনে ওর মডেল টেস্ট। একদম পড়াশোনা করছে না। এগারো তারিখে খেলা শুরু হবে। তখন ছেলেটা আরো ভেস্তে যাবে।

পিঞ্জনের আব্বু হাসে। বলে দেখুক না, কী হবে। ছোট মানুষ। নতুন খেলা দেখবে এবার।

মা জানে পিঞ্জনের আব্বু এমনই বলবে। বাবাও কী কম? রাগত স্বরে বলে পিঞ্জনের আম্মু। অবশ্য মা নিজেও বিশ্বকাপ খেলা দেখার পাগল। তবু এবার চিন্তিত বেশি ছেলের জন্য, প্রথম মডেল টেস্টে ভালো করতে না পারলে ও পিছিয়ে পড়বে। কিছু একটা করতে হবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে খেলার পাতাটা পড়ে পিঞ্জন স্কুলে চলে যায়। বাসার পাশেই স্কুল, মাও যান স্কুলে আজ। ছেলের পড়ালেখার খবর নেবেন। যাওয়ার আগে তার পরিচিত পিঞ্জনের ক্লাসমেটদের মায়েদের জরুরি ফোন করেন। স্কুলে আসতে বলেন ওদের। স্কুলে আসতেই দেখেন পিঞ্জনের ক্লাসমেটদের মায়েরা সবাই উপস্থিত। কুশলবিনিময় শেষে সবারই একি কথাÑভাবী জানেন ছেলেটা না বিশ্বকাপের জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। ছাদে, বারান্দায় সব খানে পতাকা লাগিয়ে পুরিয়ে ফেলেছে। একজনের এক মত, প্রান্তর মা বলে, ভাবী প্রান্ত ওর চুলগুলো ইংল্যান্ডের ওয়েইন রুনির মতো করেছে। মাহিম করেছে দিদিয়ের দ্রগবার মতো, মাহিমের মা বলল। পিঞ্জনের আম্মু যা ভেবেছিলেন তাই হয়েছে। সব ছেলের একি দশা। ক্লাসে ঢুকে ব্যাগ রাখতে না রাখতে শুরু হয় অমুক মিডফিল্ডারের কথা। অমুক স্ট্রাইকারের কথা।

পিঞ্জনের আম্মু বলে, সব বাচ্চার একই সমস্যা। চার বছর পর বিশ্বকাপ হচ্ছে। আর বাচ্চা ছেলেদের ওপর এটার প্রভাব পড়বে স্বাভাবিক। ভাবী এখন কী করা যায়, সেটা নিয়েই কথা বলুন। সামনেই ওদের মডেল টেস্ট পরীক্ষা। বিশ্বকাপ ওদের লেখাপড়া ধ্বংস করে দেবে। সব মা পরামর্শ করে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে।

প্রিন্সিপাল ম্যাডাম মায়েদের অভিযোগ এবং চিন্তিত দেখে হাসেন। সব শুনে তিনি মায়েদের বলেন, আপনারা বাসায় বাচ্চাদের এখন একটু বাড়তি কেয়ার নেবেন। দিনের বেলায়ই ওদের পড়া তৈরি করে দেবেন। এক মাস খেলা চললেও ওদের মন থেকে বিশ্বকাপের রেশ কাটবে না। কারণ হারজিতের ব্যাপার আছে। কার দল জিতল, কার দল হারল এ নিয়েও ওরা মাথা ঘামাবে। কেউ কেউ দুঃখ পাবে ওদের কারো প্রিয় দল হেরে গেলে। কাজেই আপনারা বাসায় বাচ্চাদের দিনের বেলায় পড়াবেন। আর অবশ্যই ওদের খেলা দেখতে দেবেন।

পিঞ্জনের আম্মু বলে, কিন্তু ম্যাডাম ওরা যে ক্লাসেও এসব নিয়ে আলোচনা করে। কাল পিঞ্জনের ইংরেজি খাতায় দেখলাম অজস্র ভুল। অযথা, যেখানে ভুল হওয়ার কথা নয়।

প্রিন্সিপাল বললেন, ঠিক আছে আমি ক্লাসেও ওদের সতর্ক করব। ক্লাস টিচারকেও বলব। মায়েরা সবাই নিশ্চিন্ত হয়। কারণ প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে বাচ্চারা ভয় পায়। বিশ্বকাপের আর একদিন বাকি। বিশ্বকাপ আলোচনায় রত ক্লাস ফাইভের ছেলেরা। প্রিন্সিপাল ম্যাডাম এলেন। তিনি প্লে ক্লাস থেকে এ পর্যন্ত যা দেখলেন তাতে মনে হলো ক্লাস ফোর এবং ফাইভের ছেলেদের মধ্যে বিশ্বকাপ গল্প চলে বেশি। তিনি এতে বরং খুশি হলেন। কারণ এরাই তো আমাদের ভবিষ্যৎ। এরাই আজকের খুদে দর্শক! তিনি তবু ওদের পড়ালেখার কথা ভেবে বিশেষ করে ক্লাস ফাইভের বাচ্চার মায়েদের অভিযোগের ভিত্তিতে সবাইকে পড়াশোনা কীভাবে করবে এই এক মাস তার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দেন। বাসায় আম্মুর কথা শুনবে এবং বিকেলে টিভিতে বিশ্বকাপ দেখবে। কিন্তু পড়ালেখার গ্যাপ দেবে না। বাচ্চারা সবাই ম্যাডামের কাছে প্রমিজ করে।

পিঞ্জনের ঘুম আসে না। ঘুম আসবে কী করে! রাত পেরোলেই কয়েক ঘণ্টা পর সেই স্বপ্নের বিশ্বকাপ। অবশেষে মায়ের বকুনিতে ঘুমিয়ে পড়ে। পিঞ্জন স্বপ্ন দেখে ও দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছে!

"