ঈদ আনন্দ

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০

আবদুস সালাম

হাবিব ও হাবিবা দুই ভাই-বোন। মেহেরপুর জেলার শহরতলিতে ওদের বাসা। বাবা ঢাকায় রিকশা চালায়। দু-তিন মাস পরপর ওদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। আর মা বাড়িতে বসে কুটিরশিল্পের কাজ করে। কখনো কাঁথা সেলাই করে, কখনো পুঁতি দিয়ে মালা, ব্যাগ ও বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করে। বাবা-মায়ের দুজনের রোজগারে তাদের সংসারটা কোনো রকমে চলে যায়। বাবা-মায়ের কষ্ট দুই ভাই-বোন উপলব্ধি করতে পারে ঠিকই। তারা এ-ও বুঝতে পারে যে, মা-বাবা তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে যে, তারা যেন ভালোভাবে লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে। তাই দুই ভাই-বোন মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। তাদের কোনো বই-পুস্তকের প্রয়োজন হলে বাবা ঢাকার নীলক্ষেত থেকে পুরাতন সেসব বই-পুস্তক কিনে আনে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য তারা উৎফুল্ল চিত্তে সেসব বইয়ের পড়া শিখে নেয়। পড়াশোনায় মনোযোগী দেখে মা-বাবাও তাদের প্রতি খুশি হয়।

হাবিব ও হাবিবা একই স্কুলে পড়ে। পড়াশোনাতে ওরা যথেষ্ট ভালো। দুই ভাই-বোন পায়ে হেঁটে নিয়মিত স্কুলে যায়। স্কুলে যাওয়ার সময় মা টিফিনের জন্য মাঝে মাঝে তাদের হাতে টাকা দেয় আবার কখনো কখনো তাদের জন্য খাবার তৈরি করে দেয়। হাবিব একদিন হাবিবাকে বলল, আমরা তো গরিব মানুষ। আব্বা-মা খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। যখন তখন নতুন জামা-কাপড় কিনতে পারে না। তাই সবসময় পুরাতন জামা-কাপড় পরে থাকে। গতবছর আব্বা আমাদের জন্য ঢাকা থেকে সবার জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনে এনেছিল ঠিকই কিন্তু আব্বা নিজের জন্য কোনো নতুন পোশাক কেনেনি। মাস তিনেক পর আবার রোজা শুরু হবে। চল আমরা এক কাজ করি। মা টিফিনের জন্য আমাদেরকে যে টাকা দেয় তা সব খরচ না করে কিছু টাকা জমা করে রাখি। সেই জমানো টাকা দিয়ে আমরা আব্বার জন্য ঈদের সময় একটা জামা কিনে দেব। তাহলে দেখবি আব্বা খুব খুশি হবে। তবে সাবধান মা যেন আমাদের পরিকল্পনার কথা কোনোভাবেই জানতে না পারে। হাবিবা ভাইয়ের সাবধান বাণীতে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। এরপর থেকে শুরু হয় তাদের টাকা জমানোর পালা।

দুই ভাই-বোনের মধ্যে একজনের টাকা দিয়ে টিফিন কিনে তারা ভাগ করে খায়। মাঝে মাঝে হাবিব না খেয়ে ছোট বোন হাবিবার জন্য পুরো টিফিনটাই দিয়ে দেয়। এভাবেই তারা টাকা জমাতে থাকে। দেখতে দেখতে রোজা শুরু হয়ে যায়। রোজার সপ্তাহখানেক পর তাদের স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। হাবিব তাদের জমানো গুনে দেখে প্রায় ৩৫০ টাকা হয়েছে। ঈদের দুদিন আগে ঢাকা থেকে আব্বা বাড়িতে আসবে শুনে তারা খুব খুশি হয়। যথাসময়ে আব্বা বাড়িতে ফিরে আসে। বাবা সবার জন্য নতুন পোশাক কিনেছে। হাবিব ও হাবিবা নতুন পোশাক পেয়ে খুব খুশি হয়। দুই ভাই-বোন এবারও লক্ষ্য করে যে, বাবা সকলের জন্য কেনাকাটা করলেও নিজের জন্য কিছু কেনেনি।

বাবা পরদিন দুই-ভাই বোনকে নিয়ে বারান্দায় বসে গল্প করছে। এমন সময় হাবিবা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলে তোমাকে আমরা ঈদের জন্য একটা উপহার দিতে চাই। যদি রাগ না কর তাহলে বলতে পারি। ‘ঠিক আছে বল রাগ করব না। তুই যা দিবি তাই নেব।’ বাবা উত্তর দিল। বাবার উত্তর শুনে হাবিব পাশে বসে মুখ টিপে হাসতে থাকে। ‘তোমাকে একটা জামা কিনে দিতে চাই।’ ভাইয়া আর আমি টাকা জোগাড় করেছি। ‘তো কত টাকা জোগাড় করেছিস?’ ‘৩৫০ টাকা।’ হাবিব উত্তর দেয়। এত টাকা তোরা কোথায় পেলি? বাবার এ প্রশ্নের উত্তরে টাকা জমানোর সব কথা হাবিব বাবাকে খুলে বলে। বাবা বুঝতে পারে ঈদে সে নতুন জামা পরে না বলে তার দুই সন্তান এমনটি করেছে। বাবা দুই সন্তানকে পরম আদরে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে। হাবিবা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে বাবার দুই চোখ অশ্রুতে পূর্ণ। সে আবার প্রশ্ন করে, বাবা তুমি রাগ করেছ? ‘না মা, না। আমি রাগ করিনি। আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমি অবশ্যই তোদের টাকা দিয়ে জামা কিনব। তবে আমার অনুরোধ তোরা আর কখনো এভাবে কষ্ট করে টাকা জোগাড় করছি না। তাহলে কিন্তু আমি খুব রাগ করব।’

জামা কেনার জন্য বিকালে বাবা হাটে গেল। ৩৫০ টাকার সঙ্গে আরো কিছু টাকা যোগ করে নতুন একটি জামা কিনল। ঈদের দিন বাবা সেই নতুন জামা পরে হাবিবকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে গেল। বাবার গায়ে নতুন জামা দেখে হাবিব ও হাবিবা দুজনই খুব খুশি হলো।

"