চুয়াডাঙ্গা কবি নজরুলের স্মৃতিভূমি

প্রকাশ : ২৬ মে ২০১৮, ০০:০০

শরীফ সাথী
ama ami

চুয়াডাঙ্গা জেলার ঐতিহ্যবাহী কার্পাসডাঙ্গা মিশনারির এলাকা কি সুন্দর দাদু ভাই?

-হ্যাঁ নাতি ভাই।

মিশনারির পল্লীর ভেতরে ঢুকতেই বামপাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে ঘরে অবস্থান করতেন, সে ঘরটি দাদু তার নাতিকে দেখিয়ে বলল, নাতি ভাই আজও স্বযতেœ দাঁড়ানো এই আটচালা খড়ের ঘরটিতে কবি নজরুল থাকতেন, তুমি কি জানো?

-না দাদু ভাই, তুমি আজ আমাকে ঘুরে ঘুরে সব দেখাবে আর এখানকার নানা প্রেক্ষাপটের বৈচিত্র্যময় কাহিনি শোনাবে?

চল নাতি ভাই, এখানে বসেই আজ কাজী নজরুল সম্মন্ধে তোমাকে শোনাব?

-দাদু ভাই, যার লেখা আমাদের বইতে আছে?

-হ্যাঁ নাতি ভাই, নজরুল এইখানে এসে লিচু চোর লেখাটি লিখেছিল। তার ইতিকথাও তোমাকে শোনাব। দাদু ভাই, কবি নজরুল এই জায়গায় বসেছিল, হেঁটেছিল, কী ভাগ্য আমার? আজ আমিও তোমার সঙ্গে এখানে হাঁটছি, বসছি, বলনা... দাদু ভাই, মন যে আমার থামে না?

-তাহলে শোন নাতি ভাই...।

কলকাতার আর্মহাস্ট স্ট্রিট মিশনারি এরিয়ার খ্রিস্টানপল্লীতে আনুমানিক ১৯২৬-২৮ সালে প্রাণের কবি আমাদের জাতীয় কবি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অবস্থান করেছিলেন। সেখানে কবির সঙ্গে এখানকার বাবু মহিম সরকারের পরিচয় ঘটে এবং কবিকে আমন্ত্রণ জানান এই চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গায় আসার জন্য। কবি আমন্ত্রণ গ্রহন করে কৃষ্ণনগর চাঁদসড়ক পল্লীতে কিছুদিন কাটিয়ে সপরিবারে কার্পাসডাঙ্গায় পদার্পণ করেন। নিভৃত পল্লী এলাকা ছিল আজকের এই কার্পাসডাঙ্গা।

নাতি দাদুকে বলল, আজকের এই কার্পাসডাঙ্গা মানে কী দাদু ভাই? তখন কি এই কার্পাসডাঙ্গার নাম অন্য ছিল?

দাদু বলল, হ্যাঁ রে নাতি ভাই, তখন এই কার্পাসডাঙ্গাকে সবাই নিশ্চিন্তপুর নামে বলত এবং চিনত। শোনা যায়, সেই থেকে কবি মাঝেমধ্যেই এখানে আসতেন।

হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের আটচালা এই খড়ের ঘরে দীর্ঘ দুই মাস অবস্থান করে এই ঘরকে আলোকিত করে গেছেন আমাদের প্রাণের কবি জাতীয় কবি কালজয়ী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। হঠাৎ আবার নাতি তার দাদুকে প্রশ্ন করল, দাদু ভাই, তুমি যে বললে এই বাড়িটি বকুল বিশ্বাসের আবার এখন বলছো বাবু হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের আটচালা খড়ের কুঁড়ে ঘর? দাদু তার নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, নাতি ভাই বংশানুক্রমে পাওয়া। যেমন-তখন ছিল হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস তার ছেলে প্রদ্যুৎ বিশ্বাস এবং এখন প্রদ্যুৎ বিশ্বাসের ছেলে বকুল বিশ্বাস মালিকানা লাভ করে বসবাস করছে? নাতি বলল, ও বুঝলাম দাদু ভাই? এক কথায় তার মানে বকুল বিশ্বাসের দাদু ভাই ছিলেন হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস। ঠিক যেন তোমার আমার মতো তাই না দাদু ভাই?

-ঠিক বুঝেছো নাতি ভাই, আবার দাদু বলা শুরু করল। এখানে এসে কবি অনেক কবিতা ও গান লিখেছিলেন, নিজ কণ্ঠে সুর করে গেয়েছিলেন। জাদুকরী গানের সুরের মূর্ছনায় মাতিয়ে তুলতেন পাড়া-মহল্লার ধ্যান-জ্ঞান মনের মানুষগুলোকে। মহিম বাবুর মেয়ে আভারানী ও শিউলী রানী সরকার তার কাছে গানের তালিম নিতেন। পাশে বসে অনেকেই গান শুনতেন, এর মধ্যে নীলিমা ও তরেন ম-ল অন্যতম। নাতি দাদুকে বলল, মহিম বাবু কি খুব ধনী লোক ছিল দাদু ভাই? তুমি তো বললে তার আহ্বানে কবি এখানে এসেছে? দাদু বলল, তা তো ছিলই? তা না হলে কি আর কলকাতা আর এখানে এত যাতায়াত করতে পারত, কবি নজরুলের সঙ্গে এত খাতির, সখ্য গড়ে উঠত। নিশ্চয় সে সময় তারা পারিবারিকভাবে খুব আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং মহিম বাবুর কথামতো কবি এখানে এসেছিলেন। কলকাতার রেডিওতে নজরুলের অনেক গান আভারানী ও শিউলী রানীর কণ্ঠে রেকর্ড হয় এবং তা প্রচার হয়। যদিও শোনা যায়, আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এখানের ব্রিটিশ শাসন-শোষণের অন্যতম নীল চাষের এই কার্পাসডাঙ্গায় চুপি চুপি আবির্ভাব ঘটেছিল। ইতিহাসের স্মরণকালের উজ্জ্বল নক্ষত্রের। এখানে এই ইংরেজ কুঠিবাড়ির নীল চাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করতেই এসেছিলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে কলমের পাকা শক্ত আঁচড় কাটতেন। গণমানুষকে চুপি চুপি জাগাতেই বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শন করতেন। এ এলাকার জনগণকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় করতে, উদ্বুদ্ধ করতেই এসেছিলেন। তাদের অনাচার-অত্যাচারের প্রতিবাদী হতেই সবাইকে আহ্বান করতে, সজাগ তৈরি হতে তার লেখনী ও ধ্যান-জ্ঞান সম্বন্ধে বোঝাতেই তার এখানে আসা। এক কথায় এখানের জনগণকে নীল চাষে বাধিত করা, নীলকর সাহেবদের অতিষ্ঠ অত্যাচারের বিরুদ্ধেই জনগণের জাগরণ ঘটাতেই আসা। এখন আর ব্রিটিশ নেই, ভারত হয়েছে, বাংলাদেশ হয়েছে, আর এ কার্পাসডাঙ্গা হয়েছে মুক্ত। কারো কারো তথ্য মতে, কবি নজরুল এখানে একটু চুপিচুপি থাকতেন তার কারণ হয়তো-বা তিনি গ্রেফতার এড়াতেই অনেকটা নীরবে ছিলেন এখানে। কার্পাসডাঙ্গা মিশনারির ভেতর পাশে বর্তমান প্রাইমারি স্কুলের সঙ্গেই মিশনারি স্কুল হোস্টেলের পাশেই নদীর তীরে সান বাঁধানো ঘাটে বসে অনেক গান ও রচনা করেছেন। ‘কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী, এ কোন সোনার গাঁয়’ ভৈরব নদীর তীরের সিঁড়িতে বসে কবির লেখা। ‘কলসি ভেসে গেল লো...’ উল্লেখযোগ্য লেখা এ স্থানকে সমৃদ্ধ করেছে।

ঝাউগাছের সারি। বিশাল এলাকাজুড়ে বিরাট লিচুগাছের বাগান। এখানের এই প্রকৃতির নিদারুণ ছোঁয়া কবিকে মুগ্ধ করে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিচু চোর, পদ্মগোখরো, বহুসংখ্যক গানসহ অনেক কিছুই রচনা করেছিলেন এই কার্পাসডাঙ্গাতে অবস্থানকালে। প্রকৃতির রূপ এমনই তারারা মেলা বসায় নীল আকাশে। চাঁদ জোছনা দিয়ে মায়ায় বাঁধে। রবির হাসিতে হেসে ওঠে ধরণী। মেঘরাশির বৃষ্টি রিমঝিম ছন্দে আনন্দে গান গায়। তেমনি প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে আমাদের প্রিয় কবি কার্পাসডাঙ্গার এই মিশনারির গির্জার পাশে বসন্তের বাতাসে ঝাউগাছের ডানায় ভেসে কাল্পনিক দেশে বাস্তবতা মিশে রচনা করেছেন প্রিয় লেখায় সাজানো ‘পদ্মগোখরো’। এ গল্পের প্রেক্ষাপট মূলত এখানকার এবং এখানে বসেই রচিত। চোখের মায়াবী চাহনিতে মিশনারির প্রকৃতি সেজেছিল নয়নোভিরাম সৌন্দর্যে। হাতের পরশে জেগে উঠেছিল এখানকার মৃত পরিবেশ। কৃষ্ণনগরে রচিত কবির উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’তে কার্পাসডাঙ্গার স্মৃতিময় কাহিনি আবির্ভূত হয়েছে। বিশাল লিচুগাছের দৃশ্য বিশ্বকে জানিয়ে দিতে লিখেছেন কালজয়ী সৃষ্টি লিচু চোর’-এর মতো দুর্দান্ত প্রাণবন্ত কবিতা। অবাধ শিশুদের লিচু পেড়ে লুকানো, কাঠবিড়ালীদের লিচু খাওয়া, পাখিদের কোলাহল কবি’র মায়াবী চোখ আটকে গিয়েছিল। রাতের আঁধারে লিচু চুরি হয়ে যায় বাবুদের বাগান থেকে কবি এমন কথা শুনতে পেয়ে বাবুদের তালপুকুরের পাড়ে তালগাছের নিচে বসে লিচুগাছের সৌন্দর্যে মন হারিয়ে মজাদার লিচু চোরের মতো লেখা লিখে নিজ মুখে সে সময় পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। বেশ কয়েকজন পাশে বসে শুনেছিল কবির লেখা কবির মায়াবী মুখের মিষ্টি কণ্ঠে।

‘বাবুদের তাল পুকুরে হাবুদের ডাল কুকুরে...’ নিজ কণ্ঠের দ্ব্যার্থহীন অমলিন মিষ্টি ভাষা হৃদয় ছুঁয়েছিল এখানকার মানুষের মনে। এখানে এসে কবির বহুলেখা আজ ও মানুষের হৃদয়স্পর্শ করে আছে। সবচেয়ে বড় সত্য হলো কবি কার্পাসডাঙ্গায় এসেছিলেন। লিচু চোর লিখেছিলেন। অসংখ্য গান, পদ্মগোখরো, মৃত্যুক্ষুধার কাহিনি, লিচু চোর কবিতা লেখাগুলোই বড় প্রমাণ কবি কাজী নজরুল ইসলাম এখানে এসেছিলেন। এসব লেখা অন্য কোথাও সৃষ্টি নয়। কার্পাসডাঙ্গায় বসেই এসব লেখা কবির সৃষ্টি। লিচু চোর, পদ্মগোখরো বড় প্রমাণ স্মৃতিবিজড়িত কার্পাসডাঙ্গাকে উজ্জ্বল করার। তাই স্মরণীয় হয়ে আছে হর্ষপ্রিয় বাবুর আটচালা খড়ের কুঁড়ে ঘর, ভৈরব নদীর সিঁড়ির ঘাট, লিচুগাছ, তাল পুকুর, মিশনারির আকাশে-বাতাসে আজ ও কবির মায়াবী কণ্ঠ ভাসে, ভাসে মুখোচ্ছবি যা ভোলার নয়। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের আটচালা খড়ের কুঁড়ে ঘরটি এলাকাবাসীর গর্ব। স্মৃতির মণিকোঠার অলংকার। এখানের কবির পদধ্বনি নয়নের সুরমা। কবির নিঃশ্বাসের বায়ু আতরের সুগন্ধে ভরপুর হয়ে ফুলে ফলে বিকশিত হয়। এখানকার ফুল ফলের গন্ধে ছন্দে আরো মাতোয়ারা করে তোলে নজরুলপ্রেমী মানুষগুলোর। হৃদয়পটে প্রিয়মুখ ভেসে ওঠে। চোখের জ্যোতির্ময় আলোকে প্রকাশিত করে। নজরুলকে নিয়ে জনতার গর্ববোধে বুক ব্যাকুল হয়ে ওঠে সারা বিশ্বকে যদি জানাতে পারতাম নজরুল আমাদের পরিবারের পরিবেশের সদস্য ছিল। কবি নজরুল আমাদের অহংকার। নজরুল আমাদের গর্ব। ভালোবাসার দীপ্তিময় স্বর্ণালি ইতিহাস। মনের মণিকোঠার মনিব। অন্তরের অন্তস্তলের সাহসী বীর সৈনিক। ব্রিটিশদের অন্যায় দাপটের বিরুদ্ধে নজরুলের বিদ্রোহী সুর, যা ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হুঙ্কার। কার্পাসডাঙ্গা মিশনারির প্রতিটি স্থানে কবির পদচারণে যা আজও মুখরিত করে আকাশে-বাতাসে, মানুষের মননে। এমন কালজয়ী মানুষের আগমন কি ভুলে থাকা যায়? গহিন অতলে কি হারিয়ে দেওয়া যায়? যায় না। কার্পাসডাঙ্গায় নজরুল স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস তুলে ধরতে, জাগিয়ে তুলতে, জানিয়ে দিতে এসব স্মৃতিবিজড়িত অনেক কিছু প্রীতি হয়ে থাকবে মানুষের মনে অনন্তকাল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের গর্ব আমাদের অহঙ্কার।

নাতি দাদুকে বলল, খুব ভালো, খুব ভালো দাদু ভাই।

দাদু বলল, সবই তো ভালো কিন্তু ফুরিয়ে যে গেল দিনের আলো নাতি ভাই। চলো আঁধার কালো নামার আগেই বাড়ি ফিরি আজ...।

"