সোনালির ময়না পাখি

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০

এম এ ওহাব মণ্ডল

প্রতিদিনের মতো আজও বান্ধবীর ডাকে সোনালির ঘুম ভাঙে। সকাল হলেই সুন্দর করেÑ ‘বান্ধবী, সকাল হয়েছে’ বলে সোনালিকে ডেকে দেয় সোনালির ময়না পাখি। সোনালি ঘুম থেকে জেগেই দেখে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। অনুমান করা যাচ্ছে ঝড় কিংবা বৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু উপায় নেই। সোনালিকে স্কুলে যেতেই হবে। কেন না, শনিবারে শ্রেণি পরীক্ষা আছে। কি আর করা(?) সোনালি বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিদিনের মতো গোসল সেরে বই গুছিয়ে নিল। সোনালি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

সোনালির একটি পোষা ময়না পাখি আছে। শখ করে সোনালি ওর নাম রেখেছে ‘বান্ধবী’। বান্ধবী নাম রাখার অবশ্য কারণ আছে। স্কুল থেকে এসে সোনালি ময়নার সঙ্গেই শুধু খেলাধুলা করে। গান করে; গল্প করে সময় কাটায়। কেন না, বিদ্যালয় থেকে ফিরে সোনালি বাইরে যাওয়ার তেমন সময় পায় না। সোনালির ময়না পাখি সোনালিকে দেখলেই বান্ধবী বলে ডাক দেয়। সোনালি খুব খুশি হয়। সকাল হলে ঘুম থেকে ডেকে দেয়। সোনালি ময়না পাখিকে অনেকগুলো বুলি শিখিয়েছে। নতুন মানুষ দেখলে সোনালির ময়না সালাম দেয়। বসতে বলে। আগত মেহমানরা ময়না পাখির এমন অভ্যর্থনায় অনেক আনন্দিত হয়। কোনো কারণে সোনালির মন ভালো না থাকলে বান্ধবীরও মন খারাপ থাকে। একদিন সোনালির গায়ে জ্বর আসে। সেদিন সোনালির ময়না পাখি সারা দিন কিছু খায় না। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। সেদিন থেকে সোনালি ওকে আরো বেশি ভালোবাসতে থাকে। পাখিদের ভেতরও অনুভূতি আছে সোনালি সেদিনই তা অনুভব করে। সোনালি ওকে কোলে তুলে অনেকগুলো আদর করে। সেদিন থেকে সোনালি শুধু বিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোথাও ময়না পাখিকে ছাড়া যায় না। প্রতিদিন সোনালি স্কুলে যাওয়ার আগে নাশতার সময় বান্ধবীকে নিয়ে নাশতা করে। সোনালির একটা ফুল বাগান আছে। বিদ্যালয় থেকে ফিরে সোনালি বান্ধবীকে নিয়ে ফুল বাগানে খেলা করে। সোনালির ফুল বাগান সোনালিদের বাড়ির ছাদের ওপর। গোলাপ, পাথরকুচিসহ অনেকগুলো ফুলের গাছ আছে সোনালির। সোনালি আর ময়না পাখি প্রতিদিন বিকেলে সেখানে মজা করে খেলা করে।

সোনালি প্রতিদিনের মতো ময়না পাখিকে কিছু খাইয়ে দিয়ে বিদ্যালয়ে চলে যায়। সোনালির বান্ধবী স্কুলে যাওয়ার সময় সোনালিকে বলেÑ‘খোদা হাফেজ বান্ধবী।’ সোনালির বান্ধবীর কোনো খাঁচা নেই। সারা দিন পুরো বাড়ি জুড়ে নেচে বেড়ায়। যেন বাড়িরই একজন সদস্য। তাই খাঁচায় বন্দি করার প্রয়োজন হয় না। রাতে সোনালির সঙ্গেই ঘুমায়।

সোনালি ওর বাবার সঙ্গে বিদ্যালয়ে চলে যায়। সকাল ১০টা থেকে ক্লাস শুরু। বিকেল ৪টায় বিদ্যালয় ছুটি হয়। সকাল প্রায় সাড়ে ১১টার সময় পুরো আকাশ খুব অন্ধকার হয়ে আসে। একটু পর শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি আর বাতাস। ঝড়-বৃষ্টির সঙ্গে পড়তে থাকে শিলা পাথর। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এমন অবস্থা চলতে থাকে। ঝড়-বৃষ্টি থামার পর স্কুল ছুটি হয়ে যায়। ঝড়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয় মানুষের। গাছপালার ডাল ভেঙে যায়। ফসলের ক্ষতি হয়। গরিব মানুষের ঘরের চালা উড়ে যায়।

সোনালি বাড়িতে এসে শুনতে পায় ময়না পাখিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ কথা শুনে সোনালি কাঁদতে শুরু করে। বান্ধবীকে ‘এনে দাও, এনে দাও’ বলে চিৎকার করে। পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সোনালির বান্ধবীকে পাওয়া যায়নি। হঠাৎ পাশের বাড়ির একজন এসে সোনালির ময়না পাখির কথা বলেন। উনি বলেন, আপনাদের ময়না পাখি বাইরে মরে আছে। সোনালি এ কথা শুনে অস্থির হয়ে পড়ে। কোনোভাবেই আর কান্না থামানো যায় না।

ঝড়ের সময় সোনালির ময়না পাখি বাতাসে কখন উড়ে যায় বাড়ির কেউ তা বুঝতে পারেননি। সোনালির ময়না পাখি শিলাবৃষ্টির আঘাতে মারা যায়। বান্ধবীকে হারিয়ে সোনালি অনেক দিন ধরে ঠিকমতো কিছু খায় না। একা একা থাকে আর কাঁদে। সোনালি স্বপ্নে দেখে ওর ময়না পাখি ওকে বলছেÑ‘বান্ধবী, তুমি আমার জন্য আর কেঁদো না। নিয়মিত খাওয়া দাওয়া করো। ঠিকমতো পড়ালেখা করো। তোমাকে যে অনেক বড় হতে হবে। তোমার কষ্ট যে আমি সহ্য করতে পারি না। আমি রোজ স্বপ্নে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসব। আর নিজের প্রতি খেয়াল না নিলে আমি কিন্তু আর আসব না। কেমন...? খোদা হাফেজ বান্ধবী।’ সোনালি ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে ওঠে। আর ‘বান্ধবী, বান্ধবী’ বলে ডাকতে থাকে। সোনালির মা-বাবা সোনালির চিৎকারে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তারা বুঝতে পারেন সোনালি কেন এমন করছে। সোনালির মুখ থেকে ওর স্বপ্নের কথা শুনে সোনালিকে আবার একটি ময়না পাখি এনে দেবে বলে ঘুমিয়ে দেয়। আর এ কথা শুনে সোনালি ঘুমিয়ে যায় ওর মায়ের কোলে।

 

"