বোকা মহিষ

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮, ০০:০০

আবদুস সালাম

এক গ্রামে এক দরিদ্র চাষি বাস করত। তার দুটি বলদ, দুটি মহিষ ও একটি গাভি ছিল। গাড়ি টানা, মাঠে লাঙল দেওয়া এবং দুধ বিক্রির জন্য গরু-মহিষগুলো চাষির খুব কাজে লাগত। মূলত জীবিকা নির্বাহের জন্য চাষিকে গরু-মহিষের ওপর নির্ভর করতে হতো। তাই চাষি ও চাষিবৌ পশুগুলোকে খুব আদর-যতœ করত, যাতে তাদের কোনো সমস্যা না হয়। সব সময় তারা যেন সুস্থ থাকে। পশুগুলো চাষির অবাধ্য ছিল না। চাষি যখন যা কাজ দিত পশুগুলো সময়মতো ঠিকঠাক করে দিত। তারা কোনো কাজে ফাঁকি দিত না। তাই চাষিও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিল। সে কোনো পশুর প্রতি অবিচার করত না। কোনো পশুর যেন বেশি কষ্ট বা পরিশ্রম না হয় সেদিকে চাষি খেয়াল রাখত। দিনের সব কাজ পশুদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিত। একই কাজ সব সময় এক পশুকে দিয়ে করাত না।

এক দিন চাষি তার মহিষের গাড়িবোঝাই করে মাঠ থেকে বিচালি আনছিল। পথিমধ্যে গাড়িটা হঠাৎ খাদে পড়ে যায়। এতে একটা মহিষ পায়ে ব্যথা পায়। চাষিও মহিষের ব্যথায় ব্যথিত হয়। মহিষটা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চাষি তাকে কয়েক দিন কোনো কাজ দিল না। অসুস্থ মহিষের কাজগুলো অন্য পশুদের দিয়ে করাত। দ্রুত সুস্থ করে তোলার জন্য চাষি মহিষটাকে ভালো ভালো খাবার খেতে দিল। এর ফলে মহিষটা দ্রুত সুস্থ হয়ে গেল। তারপর আবার যথারীতি চাষি মহিষটাকে দিয়ে কাজ করাতে শুরু করল। এভাবে আরো কিছুদিন চলে গেল। আগের অসুস্থ মহিষটা মনে মনে ভাবল, আমি যদি আবার অসুস্থ হই তাহলে চাষি আমাকে কোনো কাজ দেবে না বরং আমাকে সুস্থ করার জন্য ভালো ভালো খাবার খেতে দেবে। আর আমার কাজগুলো অন্য সুস্থ পশুদের দিয়ে করাবে।

এক দিন ওই মহিষটা লক্ষ করল মাঠে চাষিটার অনেক কাজ পড়ে আছে। সব গরু-মহিষকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হচ্ছে। মহিষটা ভাবল অসুস্থতার ভান করার এখনই উপযুক্ত সময়। তাই সত্যি সত্যি মহিষটা এক দিন অসুস্থতার ভান করে গোয়ালঘরে শুয়ে থাকল। সে চাষিকে জানাল, আমি ভীষণ অসুস্থ, আমার কাজ করার শক্তি নেই। পায়ের ব্যথাটা আবার বেড়ে গেছে। আমার বিশ্রাম নেওয়ার খুব প্রয়োজন। বিশ্রাম না নিলে আমি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ব। চাষি কোনোভাবেই বুঝতে পারল না যে সে ভান করেছে। সে তার স্ত্রীকে বলল, মহিষটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তুমি ওকে ভালো ভালো খাবার খেতে দাও। আর বেশি বেশি সেবা-যতœ করো যেন সে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। দু-চার দিন পর মাঠের কাজগুলো যখন শেষ হয়ে গেল, তখন দুষ্টু মহিষটা সুস্থ হওয়ার ভান করল। চাষি ও চাষির স্ত্রী মহিষটার চালাকি বুঝতে পারল না। এভাবেই মাঝেমধ্যে দুষ্টু মহিষটা অসুস্থতার অজুহাতে গোয়ালঘরে শুয়ে থাকত আবার কখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত। এর জন্য চাষি তাকে ভালো ভালো খাবার খেতে দিত। সে মনে মনে ভাবত আমি খুব চালাক। অন্য পশুগুলো খুব বোকা। গাধার মতো পরিশ্রম করে। ফাঁকি দেওয়ার কৌশল জানে না। অন্যদের পরিশ্রম করতে দেখে সে মনে মনে হাসত।

দরিদ্র চাষি দুষ্টু মহিষটাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সে ভাবলÑ ওর অসুস্থতার কারণে আমার অনেক আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। ওকে আমাদের কাছে রাখা আর মোটেই ঠিক হবে না। ওকে বিক্রি করে অন্য একটা মহিষ বা গুরু ক্রয় করা সমীচীন হবে। চাষির স্ত্রী তাকে পরামর্শ দিল, গ্রামবাসীর কাছে অসুস্থ মহিষ বিক্রি করা উচিত হবে না। এতে তারা আমাদের মতো একই সমস্যায় পড়বে। এর জন্য তারা আমাদের মন্দ বলবে। তার চেয়ে এক কাজ করোÑওকে জবাই করে মাংস বিক্রি করলে আর কোনো সমস্যা হবে না। মাংস বিক্রির টাকা দিয়ে তুমি নতুন আর একটা মহিষ বা গুরু কিনতে পারবে। স্ত্রীর কথার সঙ্গে চাষি একমত প্রকাশ করল। মহিষটাকে চাষি খুব পছন্দ করত। তাই সে বলল, আর একবার সুযোগ দিয়ে দেখি মহিষটা পুনরায় অসুস্থ হয় কিনা।

ঠিক এক দিন পরই দুষ্টু মহিষটা আবার অসুস্থতার ভান করল। সে গোয়ালঘরে শুয়ে শুয়ে বললÑআমি ভীষণ অসুস্থ। উঠতে পারছি না। আজ আমি কাজে যেতে পারব না। আমাকে ভালো কিছু খাবার দাও। তাহলে খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাব। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চাষি আর দেরি না করে গ্রাম থেকে একজন কসাইকে ডেকে এনে বলল, তুমি একে জবাই করে ওর মাংসগুলো বিক্রি করে দেবে। এর জন্য আমি তোমাকে পারিশ্রমিক দেব। কসাইকে দেখে আর চাষির কথা শুনে দুষ্টু মহিষটা ভয় পেয়ে গেল। সে চাষির কাছে অনুনয় বিনয় করে বলল, আমার কিছুই হয়নি। আমি সুস্থ আছি। দয়া করে আমাকে জবাই করবে না। আমি এত দিন অসুস্থতার ভান করেছি। আমার ভুল হয়েছে। আমি আর কক্ষনো এ রকম কাজ করব না। এখন থেকে তুমি যা কাজ দেবে তাই করব। মহিষটা এত দিন মিথ্যা কথা বলেছে জেনে চাষি তার ওপর ভীষণ রেগে গেল। সে বললÑমিথ্যা কথা বলার অপরাধে তোকে শাস্তি পেতেই হবে। আমি তোকে কক্ষনো বিশ্বাস করব না। চাষি আর কসাই দুজনে গলাই দড়ি বেঁধে মহিষটাকে গোয়ালঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনল। তারপর অন্য কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে মহিষটাকে জবাই করল। মিথ্যা কথা বলার অপরাধে মহিষটার শাস্তি হওয়ায় অবশিষ্ট গুরু-মহিষগুলো এর থেকে শিক্ষা নিল। তারা কক্ষনো দুষ্টু মহিষের মতো দুষ্টুমি করার সাহস দেখায়নি। তারা মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল।

 

"