ভয়ঙ্কর পেত্নী

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

সুজনসাজু

কত্তো বড় পেট! জানি না কত মন চালের ভাত খায় পেত্নীটা। পেত্নীর যেমন চেহারা, তেমনি শরীর। পেটটা তো একটা ধানের ডোল। চোখ দুটি কমলালেবুর সমান, কান দুটি তালপাতার ন্যায় বড়। আর নাকটা তো পুরো একটা চাল কুমড়ার মতো। দাঁতগুলো অবিকল দেখতে মাটিকাটা কোদালের মতো। গায়ের রং রাতের অন্ধকারের মতো যমকালো। এই পেত্নীকে দেখলেই সাক্ষাৎ হুশ হারায় লোকে। পেত্নীও ভয় লাগাতে ওস্তাদ। তিন রাস্তার মোড়। উত্তর দিক থেকে আসলে ঠিক বরাবর অগ্নিকোণ। সবাই বলে এই অগ্নিকোণেই পেত্নীর আবাসস্থল। তিন রাস্তার মোড় হলেও পথটা খুবই সরু। চর্তুদিকে লতা-পাতায় গাছে ভরপুর জঙ্গল। জঙ্গলটা এত ঘন যে, দিনের বেলায় সূর্য্য উঠলেও ভূমিতে খুব একটা তাপ পড়ে না। জঙ্গলে পেত্নী থাকে তা নয়। কত শত জীব-জন্তুর বসবাস তার কোনো শেষ নেই। বড় বেশি প্রয়োজন না হলে কোনো লোক জঙ্গলের ধারে কাছে, রাতে তো দূরের কথা দিনের বেলায়ও যেতে চায় না। আর পেত্নীর কথা তো সবাই জানে। জঙ্গলে বিভিন্ন ঔষধি গাছের ভরপুর। বৈদ্য কবিরাজেরা ঔষধি গাছের সন্ধানে জঙ্গলে আসতে হয়। বৈদ্য কবিরাজেরা শনি-মঙ্গলবারের রাতকেই বেছে নেয় ওষুধ সংগ্রহ করতে। নামকরা বৈদ্যগুলো অমাবস্যার রাতকে ব্যবহার করে। শুধু গ্রামের বৈদ্যরা আসে তা নয়। অনেক দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন আসে এই জঙ্গলে। একদিন অমবস্যার রাত, কালিপূজার পাগলা অমাবস্যা। এই পাগলা অমবস্যার রাতে কেউ ভয় পেলে, তাকে ভালো করা খুবই কঠিন। এই গ্রামে এক পাগলা বৈদ্য আছে। পাগলা বৈদ্যের দুরন্ত সাহস। পাগলা বৈদ্য অনেক বার চেষ্টা করছে, কিন্তু পেরে ওঠেনি পেত্নীকে শায়েস্তা করতে। মনের মধ্যে একটা জিদ কাজ করছে পাগলা বৈদ্যের। পেত্নী দু-চারজন বৈদ্যকে এক হাতে চিবিয়ে মারা কোনো ব্যাপারই না। অনেক বৈদ্য জঙ্গলে এসেছে যে, পরে আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। সবার ধারণা, এই পেত্নীই মানুষকে মেরে হজম করে ফেলে। কেউ কিন্তু কখনো চোখে দেখেনি পেত্নীটা মানুষ খেতে। সবাই অনুমান নির্ভর। অনুমান না করারও উপায় নেই। কারণ, পেত্নীর যেই বিকট শরীর। কতজন দেখে হুশ হারিয়েছে তার সংখ্যা হিসেবের খাতায় নেই। কিন্তু অদ্ভুত কিম্ভূতকিমাকার পেত্নীর কথা মনে আসলেই ভয়ে কাঁপন ছোটে অনেকের। ভয়ে জঙ্গলে যাওয়ার সাহস করে না কেউ। জঙ্গলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই পেত্নীটার কাজ, এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। দিনের বেলায় সাধারণত পেত্নীটা বের হয় না। ঠিক গভীর রাতে পেত্নীর বিচরণ জঙ্গলে। সারা জঙ্গল ঘুরে বেড়াই পেত্নী। অই সময় পেত্নীর সামনে যদি কেউ পড়ে তার কী আর রক্ষে আছে? এক নিমিষেই পেত্নী চিবিয়ে চ্যাপ্টা করে ফেলে। তারপর কী করে, পেত্নীই জানে এসব। এমন ভয়ঙ্কর পেত্নীকে শায়েস্তা তো করতে ইহবে। এলাকার সবার মধ্যে এমন চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সবাই মিলে পাগলা বৈদ্যর শরণাপন্ন হলো। পাগলা বৈদ্য সবাইকে আশ্বস্ত করে। এবার কিছু একটা বিহিত করতে হবে। হয়ত পেত্নীকে তাড়াতে হবে, না হয় মারতে হবে। পাগলা বৈদ্য ভাবে, এই পেত্নীর কারণে সবার মনে একটা ভয় ভয় কাজ করছে। জঙ্গলে যাওয়ার কথা কেউ মুখে আনতে ও সাহস করে না। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া দিনের বেলাও জঙ্গলের ধারে-কাছে যায় না কেউ। কে চায় হাতে ধরে বিপদে পড়তে। পাগলা বৈদ্য এবার প্রতিজ্ঞা করল যেমন করে হোক পেত্নীকে শায়েস্তা করতে হবে। এলাকার সব বৈদ্যের মধ্যে একটা সমন্বয় হল। পাগলা বৈদ্য বলে সব করণীয় আমার, তোমরা শুধু সহযোগিতা করবে। এক কথায় সকলে রাজি। গ্রামের মাতব্বর ঘোষণা দিল, পেত্নীকে যেদিন খতম করা হবে সেদিন মহা আয়োজনে পুরুস্কার দেওয়া হবে। পাগলা বৈদ্য বলে, পুরস্কারের কথা ভাবি না। এটা আমার কাজের চ্যালেঞ্জ। পেত্নীর জন্য এলাকায় একটা ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। যে ভয়ঙ্কর রূপ পেত্নীর, দেখলে কার ভয় না লাগে? তবে এবার মন্ত্রের গুণে শায়েস্তা করা ছাড়া বিকল্প নেই। পাগলা বৈদ্য আরো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। বারে শনিবার, অমাবস্যা। তিনজন বৈদ্য একত্রে চালাবে অভিযান। অনেকের মনে ভয় ভয় লাগছে, না জানি কী ঘটে আজ! পেত্নীটার যা শক্তি। পেত্নীর শক্তির কাছে পরাস্ত হবে না তো পাগলা বৈদ্য? পাগলা বৈদ্য কিন্তু সাহস হারায় না। সুনসান নীরবতা। এগিয়ে যাচ্ছে রাত, গভীরের দিকে। তিন বৈদ্য জঙ্গলের সেই পুরনো বিশালাকৃতির তেঁতুল গাছের নিচে অবস্থান নিল। ছোট ছোট জীব-জন্তুরা ঘোরাঘুরি করছে জঙ্গলে। পাগলা বৈদ্যরা অপেক্ষায় আছে। কখন সেই পেত্নীর আগমন ঘটবে। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। হ্যাঁ, হঠাৎ দেখে বড় তাল গাছের ওপর থেকে নিচের দিকে আসছে পেত্নী। বৈদ্যরা প্রস্তুত। পেত্নী কিন্তু বৈদ্যদের অবস্থানের কথা জানে না। পেত্নী তার নিজের ভঙ্গিমায় এগিয়ে আসছে তেঁতুল গাছের দিকে। পাগলা বৈদ্য সামনে, যা করার ওই করবে। পেত্নী কাছে আসতেই নজর পড়ে বৈদ্যদের। দাঁত খিলিয়ে হুঙ্কার ছাড়ে পেত্নী। আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল পেত্নী। পাগলা বৈদ্যকে অনায়াসে হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয় পেত্নী। অন্য দুই বৈদ্যের মনে ভয়ে কাঁপন ধরে গেল। পাগলা বৈদ্যকে যখন মুঠোয় নিয়ে নিল, তখন তাদেরকে ও মারা কোনো ব্যাপার নয়। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল দুই বৈদ্য। পাগলা বৈদ্যের নির্দেশ মতো পূর্বে প্রস্তুতকৃত তাদের হাতে থাকা এক ধরণের গুঁড়া ও পানি দ্রুত পেত্নীর গায়ে ছিটিয়ে দিল, সঙ্গে সঙ্গে পেত্নী পাগলা বৈদ্যকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো। এবার পাগলা বৈদ্য মন্ত্রের গুণে পেত্নীকে বন্দী করে ফেলল। তবুও পেত্নী হুঙ্কার ছাড়ে, ছেড়ে দে আমায়, পেত্নীর হুঙ্কারে যেন পুরা জঙ্গল কাঁপছে। অনেকক্ষণ লড়াই চলে পেত্নী-বৈদ্যের। সাহস হারায় না পাগলা বৈদ্য। পেত্নী এখন নিজের শক্তি হারিয়ে ফেলছে। পাগলা বৈদ্য হাসে আর দেখে। এবার পেত্নী অনুনয় করতে লাগল। বৈদ্যকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে আমাকে ছেড়ে দে। বৈদ্য বলে তোকে ছাড়া হবে না, তুই আমাদের অনেক জ্বালা দিয়েছিস। আজ তোকে মেরেই ফেলব। পেত্নী আরো ভয় পেয়ে গেল। বলে আমাকে মারিস না, আমি জঙ্গল ছেড়ে চলে যাব। আর কারো ভয় লাগাব না। পাগলা বৈদ্য এটাই চায়। কারণ, পেত্নীদের মারা অত সহজ না। একটা মারলে আরো জন্ম নেয় এর থেকে। সুতরাং তাড়িয়ে দেওয়াই উত্তম। পাগলা বৈদ্য বলে আর কখনো আসবি, এই জঙ্গলে? পেত্নী বলে, না আর কখনো আসব না। আসলে তবে আর ছাড়া ছাড়ি নেই। পেত্নী বলে ঠিক আছে, তাই মানলাম। এই বলে পেত্নীকে মন্ত্রের বলে ছেড়ে দিল। পেত্নী ছাড়া পেয়ে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। ভোরের আলো ফুটছে। তিন বৈদ্য জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে আসল। সবাই জিগ্যেস করল, কী হয়েছে? পেত্নী কোথায়? পাগলা বৈদ্য বলে, পেত্নীকে মেরে জঙ্গল ছাড়া করেছি, ভয়ে পালিয়ে গেছে পেত্নী। তোমাদের আর কোনো ভয় নেই। সবাই মিলে পুরস্কার দেয় পাগলা বৈদ্যকে। ঠিক ঠিক আর কোনো ভয় লাগছে না জঙ্গলে যেতে। পেত্নী মুক্ত জঙ্গল এখন।

 

"