ভারতজুড়ে এনআরসি বাস্তবায়ন কঠিন, তবে সম্ভব

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতজুড়ে জাতীয় নাগরিক তালিকা প্রস্তুত করতে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপিকে। কঠিন হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি বারবারই বলে আসছেন দেশজুড়ে এনআরসি করা হবে এবং অবৈধ বাংলাদেশিদের খুঁজে বের করা হবে। তবে এটা কঠিন হলেও অবাস্তব নয়। এতে করে এক পদক্ষেপে অনেক কাজ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অমিত শাহের মূল উদ্দেশ্য হয়তো বেশ পরিকল্পনা মাফিক। দীর্ঘদিন ধরে চলা সারাদা চিট ফান্ড কিংবা নারাদা ঘুল কেলেঙ্কারির বিপরীতে বিরোধীপক্ষকে বরাবরই এনআরসি ইস্যুতে বিভক্ত রেখেছেন তিনি। এই ইস্যুতে বাংলাদেশকে কখনোই চাপ প্রয়োগ করেনি ভারত।

ফলে এটা স্পষ্ট যে, বিজেপি এনআরসি ইস্যুকে তাদের অভ্যন্তরীণ হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করতে চায়। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এর প্রভাব পড়তে দেবে না তারা। ভারতের সাধারণ জনগণও এটা নিয়ে বিভ্রান্তি ও চাপে থাকে। ক্ষমতা যেহেতু প্রশাসনের হাতে তারা খুব ভালোও করেই জানে আসামে এনআরসি নিয়ে বিতর্ক থামানো কঠিনই হবে।

আর এখন তো প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগোইয়ের কাছ থেকেই পরোক্ষভাবে এনআরসির পক্ষে বক্তব্য আসল। তার বিদায়ী ভাষণে তেমনটিই আভাস মিলেছে যেমনটা আসামে তালিকা ঘোষণার পর মিলেছিল। এনআরসি প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও প্রধান সমন্বয় ছিলেন তিনি। বিচারপতি গোগোই এনআরসি কাজের সাফাই গেয়েছেন। তিনি এই প্রক্রিয়ায় আসামের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেননি। তিনি ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে বাদ যাওয়া ১৯ লাখের কথা উড়িয়ে দেননি। বিজেপি, কংগ্রেস, এজিপি, এআইডিইউফ-এর মতো আসামের বড় দলগুলোর কেউই চূড়ান্ত তালিকার সমর্থন দেননি।

অবসরের কয়েক দিন আগে দিল্লিতে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় এনআরসি নিয়ে গোগোইয়ের বক্তব্যে ব্যথিত হয়েছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত আসাম সাহিত্য সভা এবং অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (এএএসইউ) সদস্যরা। তাদের কাছে অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে বিতাড়িত করা অনেক দিন ধরেই অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে বিবেচিত। তাদের এই আবেগের কারণে অনেক সময় অপেক্ষাকৃত বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও টক্কর দিতে পারেন তারা। বলে রাখা প্রয়োজন যে আসামের রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকদের অনেকের ভাগ্যও এর সঙ্গে জড়িত। প্রধান বিচারপতি বলেন, আসামে অনেক ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ বাস করেন। তাদের অনেকেই বছরের পর বছর অ-অসমিয়াদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে এটা সত্য যে ১৯৮৩ সালে নিলি হত্যাকা-ে ২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তবে সেই সহিংসতায় মুসলিম অভিবাসীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল, অসমিয়াদের ওপর না। সেই সহিংসতা আসলে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমরে মধ্যে হয়েছিল। কয়েক বছর তার প্রভাব থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। তবে সংখ্যালঘুদের অভিযোগ রয়েছে যে তারা অসমিয়াদের মতো সমান অধিকার পান না। বিতর্কিত প্রধান সমন্বয়কের বদলির কিছুদিন পরই প্রধান বিচারপতিকেও বিদায় নিতে হবে বিষয়টি কট্টরপন্থি অসমিয়া অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য আসলে দুঃসংবাদ। সুপ্রিম কোর্টে আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এনআরসি ইস্যুটি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বাদ পড়াদের আপিল করার পর সেই সংখ্যা ১৯ লাখ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভুল হোক কিংবা সঠিক, বেশির ভাগ অ-অসমিয়ারাই মনে করেন বিচারপতি গোগোই কিংবা হাজেলা এনআরসি কার্যক্রমে তাদের আবেদন বিলম্বিত করেছেন। তাদের অযথা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে হয়েছে। তাদের পরিচয়পত্র দেখানো ও আবাসন প্রমাণে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে অনেককে।

আসামের বর্ষীয়ান সাংবাদিক অমল গুপ্ত বলেন, পরবর্তী প্রধান বিচারপতি অসামীয়া হচ্ছেন না এটা বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য স্বস্তির।

অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (এএএসইউ) নেতা সমুজ্জল ভট্টাচার্য বলেন, এনআরসির পরিসংখ্যান নির্দেশ করে ৩২ সংখ্যার মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেনি। তা গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে আসামে ৪০ লাখ অবৈধ বাসিন্দা রয়েছে দাবি করে ২০১২ সালে কর্তৃপক্ষকে তাদের শনাক্ত করতে বাধ্য করেছিল বেসরকারি সংস্থা আসসাম পাবলিক ওয়ার্ক (এপিডব্লিউ)। তারাও এখন এই এনআরসি নিয়ে হতাশ। (এএএসইউ) ও (এপিডব্লিউ) উভয় বলছে, এখন ১৯ লাখের এই সংখ্যা একটি স্থুল অবমূল্যায়ন।

গোগোই বা হাজেলার অন্তর্বেদনা এখানে শেষ হচ্ছে না। আসামের চূড়ান্ত এনআরসি প্রত্যাখ্যান করেছে বিজেপি, কংগ্রেস, বামপন্থি দল ও অন্য সংস্থাগুলো। এজন্য তাদের মনোবেদনা আরো বাড়ছে। আসামের বিজেপি নেতা শীলদিত্ত দেব বলেন, এর কারণে কঠোর অবস্থানে আছে সেখানকার হিন্দুরা। এএএসইউর সমুজ্জল অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যিকারের নাগরিকদের বাদ দিয়ে বিদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইঙ্গিত দিয়ে ঠিক একই রকম অভিযোগ করেছে এএএমএসইউ ও এআইইউডিএফের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংগঠনগুলো।

"