সন্ন্যাসী জীবনে ভারতের জৈন তরুণ-তরুণীরা

প্রকাশ | ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

‘আমি আর কখনোই তাকে আলিঙ্গন করতে পারব না’, বিবিসির কাছে নিজের একমাত্র মেয়ে সম্পর্কে বলতে গিয়ে গলা বুজে আসছিল ইন্দ্রবদন সিংহির। আবেগ চেপে রাখার চেষ্টায় অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেয়ের চোখের দিকে আর তাকাতে পারব না।’ ইন্দ্রবদন সিংহির মেয়ে স্বাভাবিক সাংসারিক জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাসিনী হওয়ার দীক্ষা নিয়েছে। সেই উপলক্ষে বাড়িতে সেদিন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। ঘর-সংসার ছেড়ে মেয়ে এখন চলে যাবে আশ্রমে। সন্ন্যাসিনী হয়ে সেখানেই থাকবে। সংসার জীবনের শেষ কদিনে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা বাড়িতে এসে দেখা করে যাচ্ছেন তার সঙ্গে।

ভারতে জৈন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ৪৫ লাখের মতো। ২০ বছরের ধ্রুবি আর ১০ মেয়ের মতো জীবন যাপন করত। গান শুনত। কাছের পার্কে ক্রিকেট খেলত। বন্ধুদের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে যেত। কিন্তু সন্ন্যাস বরণের পর সে আর তার মা-বাবাকে মা-বাবা বলে ডাকতে পারবে না। চুল কেটে ন্যাড়া হতে হবে। খালি পায়ে হাঁটতে হবে। খেতে হবে শুধু ভিক্ষা করে। তাও আবার সব খাবার খাওয়া যাবে না। আরো কিছু কঠোর বিধিনিষেধ তাকে আজীবন মেনে চলতে হবে গাড়ি চড়া যাবে না, গোসল করা যাবে না। ফ্যানের নিচে শোয়া যাবে না, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না।

ধ্রুবি সিংহির পরিবার প্রাচীন জৈন ধর্মের অনুসারী। এখনো ভারতে এই ধর্মের ৪৫ লাখ অনুসারী রয়েছে। যারা এই ধর্মের আচার পালন করেন, তাদেরকে ধর্মগুরুর জারি করা কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়।

ইন্দ্রবদন সিংহি জানালেন, তাদের একমাত্র সন্তান ধ্রুবি ছোট থেকেই উচ্ছল, বহির্মুখী ছিল। জিন্স পরত। টিভি রিয়েলিটি শোতে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রচ- আগ্রহ ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে সে ধীরে ধীরে ধর্মের দিকে ঝুঁকছিল। সম্প্রতি স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে মুক্ত হয়ে সন্ন্যাসী হওয়ার দীক্ষা নিয়েছে সে। শুধু ধ্রুবি নয়, তার মতো শত শত জৈন তরুণ-তরুণী পার্থিব জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস বরণ করছে। বছরে বছরে তাদের সংখ্যা বাড়ছে এবং ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এই পথে বেশি যাচ্ছে।

মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈন দর্শনের শিক্ষক ড. বিপিন দোশী। তিনি বলেন, ‘আগে বছরে বড়জোর ১০ থেকে ১৫টি দীক্ষা নেওয়ার ঘটনা ঘটতো।’ কিন্তু গত বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫০-এ। এ বছর সংখ্যা ৪০০ হতে পারে।

কেন এই আকর্ষণ?

জৈন সমাজের নেতারা বলছেন, প্রধানত তিনটি কারণে এটি হচ্ছে। প্রথমত তরুণ বয়সীরা আধুনিক জীবনের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত আধুনিক প্রযুক্তির কারণে ধর্মের শিক্ষা, দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে সহজে পৌঁছাচ্ছে। তৃতীয়ত ধর্মীয় স্থানে সফরের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক তরুণ-তরুণী সন্ন্যাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে আকৃষ্ট হচ্ছে।

পিছিয়ে পড়ার ভয় : ড. বিপিন দোশী বলেন, অতিমাত্রায় যোগাযোগনির্ভর যে সমাজ এখন তৈরি হয়েছে, তা অনেক মানুষকে প্রচ- মানসিক চাপে ফেলছে। ইউরোপে কী হচ্ছে, নিউইয়র্কে কী হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গেই আপনি তা দেখতে পারছেন। আগে প্রতিযোগিতা ছিল আপনি যে মহল্লায় বসবাস করেন তার মধ্যেই সীমিত। এখন প্রতিযোগিতা পুরো দুনিয়ার সঙ্গে। ফলে ‘পিছিয়ে পড়ার ভয়’ সব সময় মানুষকে তাড়া করছে।

তিনি বলেন, আপনি যখন সন্ন্যাস জীবনের জন্য দীক্ষা নিলেন, পার্থিব জীবন বর্জন করলেন, আপনার সামাজিক এবং ধর্মীয় মর্যাদা সঙ্গে সঙ্গে এমন পর্যায়ে উঠে গেল যে ধনী লোকজনও আপনার সামনে এসে মাথা নোয়াচ্ছে।

ফিজিওথেরাপিস্ট পূজা বিনাখিয়া গত মাসে সন্ন্যাসিনীর দীক্ষা নিয়েছেন। তিনি বললেন, তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। এর আগে ২৪ ঘণ্টা উদ্বেগের জীবন ছিল পূজার পরিবারের জন্য উদ্বেগ, বন্ধুদের জন্য উদ্বেগ, নিজের চেহারা নিয়ে উদ্বেগ, পেশা নিয়ে উদ্বেগ। এখন আর তাকে ভাবতে হয় না বন্ধুরা, স্বজনরা তাকে নিয়ে কী ভাবছে, কী চোখে দেখছে। তার ভাষায়, ‘এখানে আমরা শুধুই আত্মার পরিশুদ্ধি নিয়ে ভাবি।’

সোশ্যাল মিডিয়া গুরু : দীক্ষা নেওয়ার কয়েক দিন আগে ধ্রুবির কথা ছিল তার গুরুই তার কাছে সব। তার ভাষায়, ‘তিনি আমার জগত। তিনি যা বলেন, সেটাই আমার কাছে শেষ কথা।’ নতুন দীক্ষা নেওয়া সব জৈনরাই তাদের গুরুকে নিয়ে, গুরুর কথায় পাগল। ধর্মীয় গুরুরা তাদের শিষ্যদের কাছ শতভাগ আনুগত্য পান। ড. দোশী বলেন, এই প্রবণতা সবসময় এ রকম ছিল না। তার ভাষায়, ‘আগে ধর্মীয় গুরুরা অনেক আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন। তাদের নিজেদের আত্মার পরিশুদ্ধি নিয়েই মূলত তারা ভাবতেন। কিন্তু এখন এই ধর্মগুরুরা তরুণ যুবকদের কাছে ধর্মের বাণী পৌঁছে দিতে অনেক তৎপর। তারা (গুরুরা) ভালো কথা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে তারা সহজ সাধারণ একটি জীবনের পথ তুলে ধরেন। তরুণ-তরুণীরা তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে।’

১০ বছর আগেও জৈনরা তাদের ধর্মীয় বইপত্র পড়তেন শুধু প্রাচীন অর্ধ মগধি এবং সংস্কৃত ভাষায়। কিন্তু এখন অনেক ধর্মীয় বইপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।

জৈন ধর্মের ইতিহাস নিয়ে শর্ট-ফিল্ম হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেগুলো প্রচার করা হচ্ছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

মূলত হোয়াটসআ্যাপের মাধ্যমে ছড়ানো এসব শর্ট-ফিল্মে সন্ন্যাস জীবনকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, ধর্ম গুরুদের ‘সুপার হিরো’ হিসাবে দেখানো হচ্ছে। মুনি জিনভটশারিয়া বিজয় মহারাজাসাহেব নামে একজন জৈন ধর্মগুরু নিজে ইউটিউবে বেশকিছু ভিডিও ছেড়েছেন। ইউটিউবে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।

ধর্মীয় সফর: ধ্রুবি জানান, পাঁচ বছর আগে একটি আশ্রমে গিয়ে কিছুদিন থাকার পর থেকে তিনি সন্ন্যাস জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেন। ওই আশ্রমে গিয়ে কিছুদিন থেকে যে কোনও জৈন, সন্ন্যাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে পারে। সেখানে খালি পায়ে থাকতে হয়, বিদ্যুৎ নেই, গোসলের ব্যবস্থা নেই। আশ্রমে নির্ভার সহজ এই জীবনযাপনে আকৃষ্ট হচ্ছে অনেকে।

হিতেশ মোতা, যিনি মুম্বাইতে দীক্ষা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, তিনি বলেন আশ্রমে গিয়ে থাকাটা প্রশিক্ষণের মতো কাজ করে। একেকজনের কয়েকবার করে আশ্রমে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে সন্ন্যাস জীবন সম্পর্কে ভীতি, আধুনিক জীবনযাপন ছেড়ে যাওয়ার ভীতি দূর হয়ে যায়।

গত মাসে মুম্বাইয়ের কাছে নাসিক শহরে এক জৈন আশ্রমে ৬০০ জনের মতো তরুণ-তরুণী ধর্মীয় সফরে গিয়ে বেশ কিছুদিন ছিল। তাদের কয়েকশ পরে দীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছে। তাদের একজন ১২ বছরের কিশোর হেট দোশী।

ভালো ছাত্র, স্কেটিং চ্যাম্পিয়ন। খেলাধুলো ছেড়ে কয়েক সপ্তাহ স্কুল বাদ দিয়ে সে আশ্রমে গিয়েছিল। ক’দিনে ১৮ কেজি ওজন কমেছে। কিন্তু ওই কিশোরের কথা – তার ‘হৃদয় আলো দেখেছে।’ তার ভাষায়, ‘আমার গুরু বলেছেন, এই পার্থিব জগত ভালো নয়। আমি পাপের জীবন থেকে দূরে যেতে চাই। আমি দীক্ষা নিতে চাই। গুরু বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি করা যাবে, ততই ভালো। আমি ১৫ বছর বয়সের আগেই দীক্ষা নেবো।’ হেট দোশীর বাবা-মা তার ছেলের পরিবর্তনে গর্বিত। কিন্তু অনেক পরিবার শঙ্কিত। যেমন ধ্রুবির বাবা-মা কোনদিনই চাননি তাদের একমাত্র মেয়ে সন্ন্যাসিনী হয়ে যাক। আনুষ্ঠানিকভাবে পারিবারিক জীবন ত্যাগ করার দিনে ধ্রুবির বাবা মেয়েকে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করে বলেন, ‘দু’বছর দেখ কেমন যায়। চাইলে তারপর ফিরে এসো।’ সূত্র: বিবিসি।

 

"