বুলগেরিয়ায় ধর্ষণের পর সাংবাদিক হত্যায় ইউরোপজুড়ে প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বুলগেরিয়ায় ৩০ বছর বয়সী এক নারী সাংবাদিককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা নিয়ে ইউরোপজুড়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ভিক্টোরিয়া মারিনোভা নামের ওই সাংবাদিক সম্প্রতি টেলিভিশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিষয়ক একটি টকশোর উপস্থাপনায় ছিলেন।

শনিবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর রুসের একটি পার্কে মারিনোভাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে বুলগেরিয়ার পুলিশ। এ নিয়ে গত এক বছরে ইউরোপে তিন প্রতিবেদক খুন হলেন, যা মহাদেশজুড়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে এনডিটিভি।

সাংবাদিক মারিনোভাকে হত্যার কারণ জানা যায়নি; ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মারিনোভার পেশাগত কাজের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, তাও স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে বুলগেরিয়ান কর্তৃপক্ষ। ফের একজন সাহসী সাংবাদিক সত্যের জন্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যেই চলে গেলেনঅ সোমবার ব্রাসেলসে এমনটাই বলেছেন ইউরোপিয়ান কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্স টিমারমানস। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বুলগেরীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তে সাহায্য করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বুলগেরিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মারিনোভার খুনের সঙ্গে তার পেশার কোনো যোগসূত্র এখনো পাননি তারা। এটা ধর্ষণ ও খুন, বলেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম্লাদেন মারিনভ।

যে পার্কে মারিনোভাকে হত্যা করা হয়, সেটি একটি পাগলাগারদের লাগোয়া বলে সোমবার জানিয়েছে বুলগেরিয়ার গণমাধ্যমগুলো। সাংবাদিকের ওপর হামলার পেছনে ওই পাগলাগারদের কোনো রোগী জড়িত কিনা, কর্তৃপক্ষ তাও খতিয়ে দেখছে। ‘অপরাধ বিজ্ঞানবিষয়ক সেরা বিশেষজ্ঞদের রুসে পাঠানো হয়েছে, তাদের তাড়াহুড়া না করতে বলেছি। অসংখ্য ডিএনএ পাওয়া গেছে,’ বলেছেন বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী বইকো বরিসোভ।

একসময়ের লাইফস্টাইল সাংবাদিক মারিনোভা উত্তর-পূর্ব বুলগেরিয়ার জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল টিভিএনের উপস্থাপক ছিলেন। গত মাস থেকে তিনি ‘ডিটেক্টর’ নামের রাজনৈতিক অনুসন্ধান বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা শুরু করেছিলেন।

মৃত্যুর আগে অনুষ্ঠানটির মাত্র একটি পর্বে এ মারিনোভাকে দেখা গেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর একটি নেটওয়ার্ক ইইউর তহবিলের অপব্যবহার করছে, এমন অভিযোগ নিয়ে দুই সাংবাদিকের করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিষয়ে ওই পর্বে আলোচনা হয়েছিল।

বুলগেরিয়ার বিভোল ওয়েবসাইটের দিমিতার স্তয়ানোভ ও রাইজ প্রজেক্টের রোমানিয়ান সাংবাদিক আতিলা বিরো ওই অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এ দুই সাংবাদিককে আটকও করেছিল। ইউরোপের অন্য সদস্য দেশগুলোর তুলনায় বুলগেরিয়ায় দুর্নীতির বিস্তৃতি বেশি বলে জানিয়েছে বৈশ্বিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। সাংবাদিকের স্বাধীনতা বিষয়ক রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের বার্ষিক তালিকায় ১৮০টি দেশের মধ্যে দেশটির অবস্থান ১১১তে, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে।

মারিনোভার খুনের ঘটনায় বুলগেরিয়ার সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে টেলিফোনে সন্দেহের কথা জানিয়েছেন বিভোলের প্রধান সম্পাদক আতানাস তচোবানভ। ‘আমরা কোনো সম্ভাবনা বা ধারণাকে উড়িয়ে দিতে পারি না। কিন্তু যখন হত্যার তদন্ত করছেন, তখনতো আপনি অবশ্যই উদ্দেশ্য খুঁজবেন,’ বলেন তিনি।

তচোবানভ জানান, মারিনোভা ‘কার্যত’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ছিলেন না, ছিলেন টেলিভিশন উপস্থাপক। “তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে চাইতেন। কে জানে? হয়তো একদিন তিনি চমৎকার একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদকও হয়ে উঠতেন। কিন্তু তিনি এখন নেই,” বলেন এ সম্পাদক।

মারিনোভার আগে গত এক বছরে ইউরোপে আরও দু’জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। এদের একজন মাল্টার প্রতিবেদক ডাফনে করুনা গালিজিয়া। সরকারি দুর্নীতি ও মুদ্রা পাচার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এ সাংবাদিক গত বছর অক্টোবরে বাড়ির কাছেই একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন। সরকারি দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করা স্লোভাক সাংবাদিক জান কুচিক ও তার বাগদত্তা মার্টিনা কুসনিরোভাকেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের সৌদি কনসুলেটে প্রবেশের পর এক সাংবাদিকের ‘নিখোঁজ কান্ডে’ও তোলপাড় চলছে। সৌদি রাজপরিবারের নীতির সমালোচক জামাল খাসোগি ছিলেন ওয়াশিংটন পোস্টের কন্ট্রিবিউটর। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনসুলেটে ঢোকার পর থেকেই তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। খাসোগিকে কনসুলেটের ভেতরেই হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা তুর্কি কর্তৃপক্ষের। সৌদি দূতাবাস অবশ্য এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।

"