সবার কণ্ঠেই মোদির নিন্দা

প্রকাশ | ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের পুলিশ গেল মঙ্গলবার বিভিন্ন রাজ্যে নামকরা বামপন্থি লেখক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের বাড়ি বাড়ি হানা দিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ বলেছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার এক বামপন্থি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে এদের যোগসাজশ পাওয়া গেছে। দিল্লি, মুম্বাই, হায়দরাবাদ, রাঁচি থেকে শুরু করে আরো অনেক জায়গায় এই পুলিশি অভিযান চলে। এরই প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার দিল্লির প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ছুড়ে দেওয়া হয় একটা প্রশ্ন।

প্রশ্ন করা হয়, ‘হাত তুলে বলুন, এখানে কে কে শহুরে মাওবাদী?’ জবাবে হাত তোলেন সাহিত্যিক অরুন্ধতী রায়, গুজরাটের দলিত বিধায়ক জিগ্নেশ মেবাণি। হাত তোলেন ছাত্র-ছাত্রী, আইনজীবী, সমাজকর্মী, সাংবাদিকও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও মাওবাদীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে মূলত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, ভোটের মুখে নিজেদের যাবতীয় ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে ‘ডাইভার্ট অ্যান্ড রুল’ নীতি নিয়ে চলছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। এক ধাপ এগিয়ে জিগ্নেশের দাবি, মোদি জমানার গুজরাটের মতোই হত্যার ষড়যন্ত্রের গল্প ফেঁদে সহানুভূতি উস্কে দেয়ার ছক কষছে বিজেপি। গ্রেফতার সমাজকর্মীদের এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের ‘শহুরে মাওবাদী’ বা ‘আরবান নকশাল’ তকমা দিচ্ছেন কেউ কেউ।

রাফাল দুর্নীতি, নোট বাতিল, জিএসটি, বেকারত্ব, দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, কৃষকদের অসন্তোষ, গৌরী লঙ্কেশের খুনের ঘটনায় হিন্দু সংগঠন সনাতন সংস্থার দিকে আঙুল ওঠা- মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কারণ যথেষ্টই। অরুন্ধতীর কথায়, ‘বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা যে বিপজ্জনক গতিতে নামছে, বিভিন্ন সমীক্ষাতেই তা স্পষ্ট। পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেফতার করলে যে প্রতিক্রিয়া হবে, সরকার তা জানতো। তারা চেয়েছিল, এটা হোক।’

গেল জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁওতে দলিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান-পরবর্তী হিংসার তদন্তের সূত্রেই শুরু হয়েছিল ধড়পাকড়। দলিতদের সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন জিগ্নেশ।

তিনি বলেন, ‘এই গ্রেফতারের পেছনে তিনটি বিষয়ের মিশ্রণ দেখছি। ফ্যাসিবাদ, জরুরি অবস্থা এবং গুজরাট মডেল।’

কেন গুজরাট মডেল? রাজস্থানে ভোটের প্রচারের ফাঁকে দিল্লিতে আসা জিগ্নেশের ব্যাখ্যা, ‘গুজরাটের মতো এখানেও আন্দোলনকারীদের ওপরে হামলা করেছে রাষ্ট্র। আসল উদ্দেশ্য, মোদির জন্য সহানুভূতি জাগিয়ে তোলা। প্রতি বছরই কোনো না কোনো জিহাদি মোদিকে খুনের জন্য গুজরাটে আসত। ভুয়া সংঘর্ষে সে মারা যেত। মোদি এবং অমিত শাহের নির্দেশেই এবারের গল্পটা সাজিয়েছে মহারাষ্ট্র পুলিশ।’

অরুন্ধতীর যুক্তি, নোট বাতিলে আর্থিক বৃদ্ধির হার ১.৫ শতাংশ কমেছে। ফলে ১৫ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছেন। আর বিজেপি সব থেকে ধনী দল হয়েছে। নীরব মোদি-বিজয় মাল্যেরা টাকা লুঠ করে পালিয়েছেন। সরকার কিছুই দেখেনি। আসল ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ হল নতুন রাফাল চুক্তি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বদলে অনিল অম্বানীকে বরাত দেওয়া হয়েছে। যৌথ সংসদীয় কমিটির তদন্তের দাবি উঠেছে। আবার শিক্ষার বেসরকারিকরণ করে সংরক্ষণে আঘাত করা হচ্ছে।

জিগ্নেশের অভিযোগ, দলিতদের ‘অম্বেডকর-বাদ’কে মাওবাদের তকমা দেওয়া হচ্ছে। যারা সংঘ-পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছেন, তাদেরই ভয় দেখানো হচ্ছে।

অরুণা রায়, প্রশান্ত ভূষণরা যুক্তি দেন, যে সমাজকর্মীরা গরিবদের জন্য কাজ করছেন, তাদেরই জেলে ভরা হচ্ছে। ভূষণ বলেন, ‘যা হচ্ছে, তা জরুরি অবস্থার থেকেও খারাপ।’

এই গ্রেফতার প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ভারতে এসব গ্রেফতারের ঘটনা উদ্বেগজনক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সরকার এই কাজ করছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে। অ্যামনেস্টি বলেছে, ভারতে আইনজীবী, সাংবাদিক, অধিকার কর্মী এবং মানবাধিকারের রক্ষকদের বিরুদ্ধে এক বিরাট দমন অভিযান শুরু হয়েছে। ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টির পরিবর্তে সরকারের উচিত মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশের অধিকার রক্ষা করা।

 

"