তালেবানের হাতে কি গজনির পতন হতে চলেছে?

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রোববার আফগানিস্তানের শহর গজনিতে তালেবান যোদ্ধারা প্রবল হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনী যাতে নতুন করে লোকবল পাঠাতে না পারে, সে জন্য তারা শহরটির মূল সড়কে মাইন পুঁতেছে। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে শহরবাসী। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে সরকারি ভবনে। প্রাণ হারিয়েছেন আফগান সেনাবাহিনীর অন্তত ৯০ সদস্য। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন আফগান সেনাপ্রধান। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া তালেবান যোদ্ধাদের হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে শহরটির টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ এখনো সরকারের হাতে থাকার দাবি করা হলেও গজনি থেকে পালিয়ে আসা সাধারণ নাগরিক ও অসমর্থিত সূত্রে প্রকাশিত ভিডিওচিত্র থেকে পাওয়া তথ্যে ফুটে উঠেছে পরিস্থিতির ভিন্ন বাস্তবতা। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আফগান সরকারি বাহিনীর সহায়তায় দেশটিতে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনী তালেবান যোদ্ধাদের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তালেবান যোদ্ধারা সাধারণ জনগণের মধ্যে মিশে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।

গজনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ শহর, কারণ আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী কাবুলের যোগাযোগ স্থাপনকারী মহাসড়কটি গজনির মধ্য দিয়েই গিয়েছে। গত মে মাসে পশ্চিমের শহর ফারাহতে হওয়া হামলার পর গজনির এই হামলাই আফগান সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাত। আফগান সেনাপ্রধান মোহাম্মদ সারিফ ইয়াফতালি দাবি করেছেন, গজনির পতন হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে তালেবান যোদ্ধাদের হঠাতে প্রবল পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কাবুলে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘শহরটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো আফগান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আফগান যোদ্ধারা মানুষের ঘরবাড়িতে লুকিয়ে রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে হামলা চালাচ্ছে।’

কিন্তু চমন শাহ এহতেমাদি নামের গজনির একজন সংসদ সদস্য স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য থেকে জানতে পেরেছেন, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া হামলার মধ্য দিয়ে তালেবান যোদ্ধারাই কার্যত এখন শহরটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শুধুমাত্র গভর্নরের অফিস, পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং গোয়েন্দা সংস্থার অফিস রয়েছে সরকারি নিয়ন্ত্রণে। তালেবান যোদ্ধারা সেসবেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ রহিম হাসানিয়ারও একই রকম তথ্য দিয়েছেন; শহরটির বিভিন্ন এলাকায় খন্ডযুদ্ধ চলছে। আফগান সেনাবাহিনী আত্মরক্ষামূলক অবস্থায় রয়েছে।

গজনির টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে হতাহতের সংখ্যার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। আফগানিস্তানের ওয়ান টিভি স্থানীয় হাসপাতালের সূত্রে জানিয়েছে, আফগান সেনাবাহিনীর ৯০ জন সদস্য ও ১৩ জন সাধারণ নাগরিক তালেবান যোদ্ধাদের হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন। হামলায় আহত হয়েছে অন্তত ১০০ জন। টিভি চ্যানেলের ভাষ্য, সরকারি বাহিনীর হামলায় তালেবান যোদ্ধাদেরও বহু সংখ্যক সদস্য নিহত হয়েছে।

সরকার যাতে নতুন করে সেনাসদস্য পাঠাতে না পারে, সে জন্য তালেবান যোদ্ধারা মহাসড়কে মাইন পুঁতে রেখেছে। এতে শহরবাসী কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মহাসড়ক এড়িয়ে ক্ষেত-মাঠ পেরিয়ে যারা গজনি থেকে পালাতে পেরেছেন তারা জানিয়েছেন, সেখানে বহু সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পালিয়ে আসতে পারা একজন গজনিবাসী আব্দুল ওয়াকিল কাবুলের একটি নিরাপত্তা চৌকি পার হওয়ার সময় রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ‘চারপাশে আগুন জ্বলছে। রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে অজ¯্র লাশ।’

কিছু ভিডিওচিত্র রয়টার্সের হাতে পৌঁছেছে, যেগুলো গজনিতে ধারণ করা বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু ভিডিওগুলো আসলেই গজনির কি না তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। ভিডিওচিত্রগুলোতে দেখা গেছে, তালেবান যোদ্ধারা শহরের বিভিন্ন অংশে অবস্থান নিয়েছে। তাদের পাশে উপস্থিত একজন সাধারণ নাগরিককে মন্তব্য করতে শোনা গেছে, ‘সব শেষ। শহর দখল হয়ে গেছে।’

তালেবান যোদ্ধাদের ঠেকাতে মার্কিন যুদ্ধবিমান রোববার অন্তত চারটি বিমান হামলা চালিয়েছে। কিন্তু টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তালেবান যোদ্ধাদের ঠিক কি মাত্রার ক্ষতি হয়েছে নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি রয়টার্স। কাবুলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শনিবার পাঁচটি বিমান হামলা করা হয়েছে তালেবান যোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে; রোববারে চালানো হয়েছে আরও চারটি। ইমেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল মার্টিন ও’ডনেল লিখেছেন, ‘আফগান প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং সরকারি স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, শনিবারেই তালেবান যোদ্ধাদের গজনির প্রতি মোড়ে অবস্থান নিয়ে থাকতে দেখা গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক শনিবারের আগেও যে বিদ্যালয়ে পুলিশ চৌকি দেখেছেন শনিবার সেখানে তালেবান যোদ্ধাদের একে-৪৭ ও রকেটচালিত গ্রেনেড লঞ্চারের মতো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাহারা দিতে দেখা গেছে।

"