এই ঋতুতে শিশুর যত্ন

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

ডা. মহসীন কবির

এই ঋতুতে প্রকৃতিতে জলীয়বাষ্প বেশি থাকে। গরম-ঠান্ডা মেলানো আবহাওয়া আমাদের শরীরের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। বড়দের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকার কারণে তারা ছোট ছোট সমস্যা থেকে মুক্তি পেলেও শিশুরা কিন্তু জলীয়বাষ্পমিশ্রিত বৈরী আবহাওয়ায় নানা রোগের ঝুঁকিতে থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি শরীরে লাগালে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ কারণে এই ঋতুতে পরিবারের শিশুদের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া বর্ষাকালে তীব্র বৃষ্টির কারণে প্রায়ই রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে রাস্তার নোংরা ময়লামিশ্রিত পানিতে থাকে নানা জীবাণু। রাস্তার ময়লা পানি শিশুর ত্বকে লাগলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় মারাত্মক ইনফেকশন হতে পারে। এই ঋতুতে আবহাওয়া মাঝে মাঝেই তীব্র গরম থাকে। গরমে শিশুর ত্বকে ঘামাচি হয়। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না পেলে এ ঘামাচি পেকে গিয়ে শিশুর ত্বকে ইনফেকশন হতে পারে। এছাড়াও বৃষ্টির কাদামাটি ও ময়লা মিশ্রিত পানি ত্বকে ক্যান্ডিরা ছত্রাক সংক্রমিত হতে পারে। এ ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশনের কারণে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ছত্রাক, খোসপাঁচড়া, ঘামাচি, ফোঁড়া, দাদ, অ্যাকজিমা হতে পারে। বর্ষাকালে এসব ত্বকের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আসুন কিছু তথ্য জেনে নিই-

১. বর্ষাকালে ত্বক ভেজা থাকলে ত্বকে সহজেই ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করতে পারে। তাই এই ঋতুতে শিশুর ত্বক সবসময় শুকনো রাখতে হবে।

২. শিশুর শরীরে বৃষ্টির পানি লাগলে সঙ্গে সঙ্গে তা পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে ও শরীর ভালোভাবে মুছে দিতে হবে।

৩. শিশুকে এই ঋতুতে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কারণ জলীয়বাষ্প মিশ্রিত আবহাওয়ায় ত্বকে ময়লা জমে খোসপাঁচড়াসহ সহজেই নানা ধরনের ইনফেকশন হতে পারে।

৪. শিশুকে কাদামাটি ও ময়লা মিশ্রিত রাস্তায় একদম নামতে দেওয়া যাবে না। বর্ষার কাদামাটি শিশুর ত্বকে হঠাৎ লেগে গেলে তা সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।

৫. বর্ষাকালে স্কুলে যাওয়ার সময় শিশুকে অবশ্যই রেইনকোট, ছাতা, গামবুট ব্যবহার করতে বলতে হবে। শরীরে কাদা ও ময়লা পানি লাগলে তা পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

৬. খোলামেলা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে শিশুকে খেলতে দিতে হবে।

৭. গরমে শিশু ঘেমে গেলে ত্বকে বেবি পাউডার ব্যবহার করতে হবে।

৮. খাওয়া, গোসল, খেলাধুলা, হাত, মুখ ধোয়া, ঘামযুক্ত শরীর মুছে দেওয়া শিশুর সুন্দর ত্বকের জন্য খুবই প্রয়োজন। তাই মায়েদের অবশ্যই এসব বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

৯. বর্ষাকালে শিশুকে ভিটামিন সি-জাতীয় ফলমূল ও পানি জাতীয় খাবার বেশি করে খাওয়াতে হবে। সেসঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে দিতে হবে।

১০. বর্ষাকালে বারবার পানি লাগালে ত্বক ভেজা থাকার কারণে শিশুর ত্বকের ন্যাচারাল তেল ভাবটা নষ্ট হতে পারে, এ কারণে ত্বকে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে।

১১. শিশুরা যদি হঠাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে বৃষ্টিতে ভিজে যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে মাথা ও শরীর হালকা গরম পানিতে ধুয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলুন।

এই ঋতুতে সুস্থতার জন্য সবাই সতর্ক থাকলেও পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যটির দিকে আলাদা নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের চেয়ে অনেক কম। এ কারণে শিশুদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। শুধু ত্বকের যতœই নয়, শিশুদের খাবার ও কাপড়চোপড়ের দিকেও একটু বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন এই বর্ষাকালে। কারণ বর্ষাকালে চোখ ওঠা রোগ, পেটের অসুখ, ঠান্ডা, কাশি ও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শিশুদেরই বেশি। গোসলের পর ত্বক ভালোভাবে মুছে ফেলতে হবে। নরম জামা পরাতে হবে। ছয় ঘণ্টা পর পর জামা পাল্টে দেওয়া ভালো। শিশুর বসবাসের ও খেলার জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতি সপ্তাহে শিশুর হাত, পায়ের নখ কেটে দিতে হবে ও খেয়াল রাখতে হবে আঙুলের ফাঁকে পানি জমে গিয়ে যেন কোনো ছত্রাকের জন্ম না হয়। তাই বলা যায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এই ঋতুতে সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাই আসুন এ বর্ষায় পরিবারের শিশুদের দিকে বাড়তি নজর দিই। সেসঙ্গে কিছু সতর্কতা মেনে চলি ও তাদের সুস্থতা নিশ্চিত করি।

 

লেখক ও গবেষক

ইনচার্জ, ইনস্টিটিউট অব জেরিয়েট্রিক মেডিসিন

বাংলাদেশ প্রবীণহিতৈষী সংঘ, ঢাকা

"