টেনশন কমাতে ঘুমের ওষুধ নয়

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

মো. আরিফুর রহমান ফাহিম

কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণে সাময়িক ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। কয়েক মাস ধরে যদি একই অবস্থা চলতে থাকে, একেই বলা হয় অনিদ্রা রোগ বা ইনসমনিয়া। অনিদ্রা রোগের এত দিন নিরাময় ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ ঘুমের ওষুধ। আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ’-এর এক সমীক্ষা বলছে, অনিদ্রার অবসান ঘটাতে পারেন রোগী নিজেই। দুশ্চিন্তা কমিয়ে, মনকে আনন্দে রাখলেই অনিদ্রা কেটে যেতে পারে বলে দাবি করছেন গবেষকরা। ওই সমীক্ষা আরো বলছে, আমেরিকায় প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন ইনসমনিয়ার শিকার। তাদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রথমে চিন্তা আর মানসিক অবসাদ থেকেই ঘুম কমে গেছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মনের ওপর অত্যধিক চাপ পড়ছে। পরদিন কী হবে, সে চিন্তায় রাতে ঘুম আসছে না। এভাবে কদিন চলার পর রাতে শোয়ার সময় শুধুই মনে হচ্ছে, ঘুম আসবে না। ঘুম কেন আসছে না এ চিন্তায় রাতের পর রাত জেগে কাটিয়ে দিচ্ছেন তারা। শিকার হচ্ছেন ইনসমনিয়ার। শেষে একটু ঘুমানোর তীব্র আকাক্সক্ষায় ঘুমের ওষুধে আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (এনআইএইচ) গবেষকরা বহু বছর ধরে ইনসমনিয়া নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন। গবেষকরা জানান, অনিদ্রার স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিই এর জন্য দায়ী। অনেক সময় মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে ঘড়িতে কটা বাজে দেখা বা ঠান্ডা লাগছে বলে গায়ে চাদর টেনে নেওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এটাই মস্তিষ্কের স্মৃতি কেন্দ্রে অস্থায়ী ছাপ ফেলে। ওই ব্যক্তি ভাবেন, তিনি রাতে আদৌ ঘুমাননি। এ নিয়ে মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকেন। আর তখনই আসে ঘুমের ওষুধের কথা। ওই চিকিৎসকের মতে, বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি তৈরি হতে দেয় না। ফলে রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলেও রোগীর ওই কথা মনে থাকে না। বরং তিনি মনে করেন, সারা রাত একটানা ঘুমিয়েছেন তিনি। শুধু ২০১০ সালেই আমেরিকায় বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকার ঘুমের ওষুধ। গবেষকরা জানান, সাময়িক উপকার করলেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে ঘুমের ওষুধ ইনসমনিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারে না। কলকাতা মেডিকেল কলেজের মনোবিদ্যা বিভাগ এবং প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সরকারি হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, তাদের ৭১ শতাংশের ঘুম নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। ওইসব নার্স সমীক্ষকদের কাছে জানান, কাজের অত্যধিক চাপ, রোগীর চিন্তা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নার্সদের সব সময়ে দুশ্চিন্তার মধ্যে রাখে। তার ওপর শিফট ডিউটিতে তাদের ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’-এর স্বাভাবিক ছন্দও নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট নার্সরা অনিদ্রার শিকার হন। যে ওয়ার্ডে আশঙ্কাজনক রোগী যত বেশি, ওই ওয়ার্ডের নার্সদের মানসিক চাপও তত বেশি।

বিলেতের ওয়ারউইক মেডিকেল স্কুলের গবেষকরা ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, প্রতি ২০ জন ভারতীয়ের মধ্যে একজন ঘুমের অনিয়ম-সংক্রান্ত রোগের শিকার। আরো চিন্তার বিষয় হলো, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অনেক বেশি ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত। যার প্রভাব শুধু ওই মহিলাই নন, অন্তঃসত্ত্বা হলে তার সন্তানের ওপরও পড়তে বাধ্য। গর্ভবতী নারীদের ঘুমের সমস্যা প্রায়ই হয়ে থাকে। ওজন বেড়ে যাওয়ার কারণে, পা ব্যথা বা কামড়ানো, কোমর বা পেটে অস্বস্তি, বারবার শৌচাগারে যাওয়া বা গর্ভস্থ শিশুর নড়াচড়ার জন্য ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রচলিত প্রায় সব ঘুমের ওষুধই গর্ভাবস্থায় সেবন করা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ। এ সময় তাই শিথিলায়ন পদ্ধতি, মনকে চিন্তামুক্ত ও প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা, ঘুমের আগে বই পড়ার অভ্যাস ইত্যাদি কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ভালো ঘুম হওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। গুরুতর সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ দু-এক দিনের জন্য খাওয়া যেতে পারে। সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত ঘুমের ওষুধ সেবনের ফলে মানুষ দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধ সেবনের ফলে আমাদের শরীরে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। যেমন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, ফুসফুসের ক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মানুষের বুদ্ধিমত্তা লোপ পেতে থাকে, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া, পেটে ব্যথা, হজমের সমস্যাসহ খাদ্যে অরুচি দেখা দেয়। এ ছাড়া হাত-পা এবং বুক জ্বালা করে। তাই ঘুমানোর জন্য ঘুমের ওষুধ নয়, চাপমুক্ত হয়ে কাজ করুন, সুস্থ থাকুন।

 

 

"