ঘরের লুকানো ধুলো থেকে অ্যালার্জি

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

ঘরের ধুলো প্রকৃতপক্ষে অনেক জিনিসের মিশ্রণ। এর মিশ্রণগুলো কমবেশি হতে পারে এক ঘর থেকে আরেক ঘরের ফার্নিচারের প্রকার ভেদে, ঘর তৈরির উপাদানের কারণে, পোষা প্রাণীর উপস্থিতি ও আর্র্দ্রতার কারণে। ধুলোর মধ্যে থাকতে পারে সুতোর আঁশ, মানবদেহের ত্বকের মৃতকোষ, প্রাণীর লোম, আণুবীক্ষণিক জীবাণু, তেলাপোকার প্রত্যঙ্গ, ছত্রাকের জীবাণু, খাদ্যকতা এবং আরো অনেক পরিত্যক্ত ক্ষুদ্র জিনিস। এগুলোর মধ্যে প্রাণীর লোম, তেলাপোকা এবং ধুলোর জীবাণু হচ্ছে প্রধান তিন বিপজ্জনক বস্তু। কোনো ব্যক্তি এগুলোর যে কোনোটির দ্বারা ভুগতে পারেন এবং তিনি যখন ধুলোর সংস্পর্শে আসেন, তখন অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটে।

ঘরের ধুলোর অ্যালার্জি কি মৌসুমি?

দেখা গেছে, আমেরিকায় ধুলোর জীবাণুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হয় জুলাই-আগস্টে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ উচ্চসংখ্যা বজায় থাকে। বসন্তের শেষের দিকে ধুলোর জীবাণুঘটিত অ্যালার্জির সংখ্যা সবচেয়ে কম থাকে আমেরিকায়। এ ধরনের কিছু রোগী জানিয়েছেন, তাদের উপসর্গ সবচেয়ে বেশি হয় শীতকালে। এর কারণ হচ্ছে মৃত এবং জীবিত জীবাণুর বর্জ্য উভয়ই অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন মৌসুমে ছত্রাকের পরিমাণেও কমবেশি ঘটে। গ্রীষ্মের সময় তেলাপোকার পরিমাণ ও বাতাসে ধূলিকতার পরিমাণ বেশি হয়। আর এ সময় মানুষ বাড়িতে সচরাচর বেশি সময় কাটায় বলে অ্যালার্জির উপসর্গও বৃদ্ধি পায়।

কীভাবে বুঝবেন যে আপনার ধুলোজনিত অ্যালার্জি রয়েছে : এ ক্ষেত্রে আপনাকে অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে। তিনি আপনার উপসর্গগুলো লক্ষ করবেন, গৃহ ও কর্মস্থলের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইবেন। প্রশ্ন করবেন আপনার অভ্যাস, পারিবারিক রোগের ইতিহাস, উপসর্গ কমা-বাড়ার প্রবণতা, পোষা প্রাণীর ধরন সম্পর্কে। এরপর তিনি একটি পরীক্ষা করবেন, যার নাম স্কিন-প্রিক টেস্ট। সেসঙ্গে রক্ত পরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে।

এ ধরনের অ্যালার্জির উপসর্গ কমাতে কী করবেন : তিনটি মৌলিক চিকিৎসার ধাপ রয়েছে। যেমন-

ধুলোর জীবাণু থেকে দূরে থাকা।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ।

ইমিউনোথেরাপি।

কীভাবে ধুলোর জীবাণু থেকে দূরে থাকবেন : পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের আগে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, ঠিক কোন ধরনের ধুলোর উপাদান থেকে আপনি অ্যালার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ধুলোর জীবাণু পরিপূর্ণভাবে অপসারণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তবে আপনি কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন, যাতে পরিমাণটা অন্তত কম থাকে। অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ এ ব্যাপারে আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন।

শোয়ার ঘরের দিকে বিশেষ নজর দিন : গড়পড়তা হিসাবে মানুষ তার জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটায় বেডরুমে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধুলোর জীবাণুর পরিমাণ বেশি থাকে শোয়ার ঘরে। এজন্য ধুলো-অ্যালার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শোয়ার ঘরের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

বেছে নিন এমন শোয়ার জিনিসপত্র যেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা যায় এবং যাতে অ্যালার্জি পরিমাণ কম থাকে। বালিশে ফোম বা তুলা ব্যবহার না করে সিনথেটিক জিনিস ব্যবহার করুন। সপ্তাহে অনন্ত একবার বিছানাপত্র ধুয়ে রেখে শুকিয়ে নিন।

সম্ভব হলে বেডরুমে এয়ারকন্ডিশনার ও আর্র্দ্রতারোধক যন্ত্র ব্যবহার করুন। আর্র্দ্রতা কম থাকলে জীবাণু ও তেলাপোকার বংশবিস্তার রোধ হবে।

জানালায় সুক্ষ কাপড়ের ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো ঘন ঘন বদলাতে হবে। কাপড়-চোপড় ক্লোজেটে রাখুন। ক্লোজেটের ঢাকনা বন্ধ রাখুন।

ঘরে কোনো মৃত প্রাণী বা প্রাণীর অংশ থাকলে অবিলম্বে বাইরে ফেলে দিন।

শোয়ার ঘরে কখনও পোষা প্রাণীকে ঢুকতে দেবেন না।

মেঝের ধুলো কমানো : নিয়মিত বিরতিতে ঘর পরিষ্কার করুন। মেঝে মোছার সময় স্যাঁতসেঁতে ও তৈলাক্ত কাপড় ব্যবহার করবেন না। ঘর পরিষ্কারের সয়ম মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন।

শোয়ার ঘরে কার্পেট ব্যবহার না করাই উত্তম। ব্যবহার করলেও এমন ধরনের কার্পেট নেবেন, যেগুলোর আঁশ সুবিন্যস্ত।

যেসব জিনিস ও আসবাবপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা সম্ভব নয়, সেগুলো বেডরুমে না রেখে অন্যত্র সরিয়ে ফেলুন।

ঘরে বাতাসের ধুলো কমানো : এমন ধরনের এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার করুন, যার দ্বারা ঘরের আর্র্দ্রতা শতকরা ৫০ ভাগের নিচে রাখা সম্ভব।

এসির ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করুন, প্রয়োজনে ঘন ঘন ফিল্টার পরিবর্তন করতে হবে। তবে মনে রাখবেন, ধুলোর জীবাণু বেশিক্ষণ বাতাসে থাকতে পারে না। তাই মেঝে ও দেয়াল পরিষ্কারের দিকেই আপনাকে বেশি নজর দিতে হবে।

লেখক :

অধ্যাপক, অ্যালার্জি বিভাগ

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

দি অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা সেন্টার

 

"