সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিসে ঘাড় ব্যথা

প্রকাশ : ২১ মে ২০১৯, ০০:০০

ডা. মহসীন কবির

ঘাড় ব্যথা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যারা সারা দিন বসে থাকার কাজ যেমন কম্পিউটার অপারেটর, ব্যাংকার ও যারা ভারী কাজ করেন তাদের ঘাড় ব্যথা বেশি হয়। এই ঘাড় ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। মেরুদ-ের কশেরুকার হাড়ের ক্ষয় রোগকে বলা হয় স্পন্ডাইলোসিস। আর মেরুদন্ডের ঘাড়ের অংশের কশেরুকার ক্ষয় হলো সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। মানুষের মেরুদ-, হাড়, মাংসপেশি, টেনডন ও ডিস্ক দ্বারা গঠিত। দুটি কশেরুকারকা বা ভার্টিবাল মাঝখানে থাকে ডিস্ক, এই ডিস্ককে ইন্টার ভার্টিবাল ডিস্ক বলে। মেরুদ-ের ডিস্ক ও হাড়ের দুই দিকে থাকে মাংসপেশি ও লিগামেন্ট। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসপেশি ও লিগামেন্টগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। তখন আমাদের শরীরের ওজনের ও কাজের চাপ মাংসপেশি-লিগামেন্ট ছাপিয়ে হাড়ে গিয়ে পড়ে আর এতে হাড়ের ক্ষয় হতে পারে। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য নয়, যে কারো যেকোনো সময় হাড়ের ক্ষয় রোগ বা স্পন্ডাইলোসিস ডেভেলপ করতে পারে। আমাদের কশেরুকার মাঝখানে একটা ক্যানেল থাকে যাকে ভার্টিবাল ক্যানেল বলে। এই ক্যানেলের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্ক থেকে নেমে আসা স্পাইনাল কর্ড ও নার্ভরুট বেরিয়ে আসে। স্পন্ডাইলোসিসের ক্ষেত্রে হাড় ক্ষয়ের কারণে মাঝে মাঝেই এই নার্ভরুটগুলোতে প্রেসার বা চাপ পড়ে আর এতে ওই নার্ভ শরীরের যে অংশে কাজ করে সেই অংশে ব্যথা ও ঝিনঝিন অনুভূতি হয়। সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিসের ক্ষেত্রে যদি ঘাড়ের কশেরুকার হাড়ের ক্ষয়ের কারণে নার্ভে প্রেসার পড়ে তা হলে হাতের বিভিন্ন মাংসপেশিতে ব্যথা বা ঝিনঝিন অনুভূত হবে কারন মানুষের ঘাড়ের কশেরুকা থেকে বের হওয়া নার্ভগুলো হাতের বিভিন্ন মাংসপেশিতে কাজ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘাড় নাড়ানোর একটি পর্যায়ে মাথাও ঘুরে উঠতে পারে। সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিসে ঘাড় ব্যথার কারণে সাধারণত রোগীরা ঘাড়ের মুভমেন্ট কম করে থাকে। আর ঘাড় মুভমেন্ট কম করার কারণে ঘাড়ের মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায় ও মাসেল স্পাজম ডেভেলপ করে। এই মাসেল স্পাজমের কারণে রোগীর ঘাড়ের ব্যথা আরো বেড়ে যায়। তাই রোগীকে কোনো অবস্থাতেই ঘাড়ের মুভমেন্ট বা ঘাড় নাড়াচাড়া করা কমিয়ে দেওয়া যাবে না। পুরুষ ও মহিলারা সাধারণত সমানভাবেই এ রোগে আক্রান্ত হয়। সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিসের শুরুর দিকে অল্প অল্প ঘাড় ব্যথা হয়। যদি কোনো ব্যক্তির মাঝে মাঝে বা প্রতিদিনই একটু একটু ঘাড় ব্যথা হয় তখন তাকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঘাড়ের এক্স-রে করতে হবে কারণ তার ঘাড়ের কশেরুকার হাড় ক্ষয় হচ্ছে কি না জানার জন্য। শুরুতেই এ রোগ নির্ণয় করা গেলে দৈনন্দিন জীবনে কিছু নিয়মকানুনের পরিবর্তন ও চিকিৎসকের পরামর্শমতো কিছু ব্যায়াম করলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। আর যারা ঘাড়ের ব্যথার কারণে দিন দিন ঘাড়ের মুভমেন্ট কমিয়ে দেন তাদের ঘাড়ে মাসেল স্পাজম ডেভেলপ করে এজন্য রোগীর সুস্থ হতে কিছুটা সময় লাগে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মাসেল রিলাক্সেন, পেইন কিলার, নার্ভের ও হাড়ের ভিটামিন খেতে হবে ও ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ ব্যতীত কিছু অলট্রাসাউন্ড ডায়াথার্মি, শর্টওয়েভ ডায়াথার্মি, নার্ভ স্টিমুলেটর ও প্রয়োজনে সার্ভিক্যাল ট্রাকশন দিতে হবে এবং নিয়মিত ঘাড়ের মাসেলের ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং করতে হবে। এ ছাড়াও মেরুদন্ডের হাড় ক্ষয় রোধে প্রতিদিন ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার খেতে হবে।

লেখক :

ইনচার্জ, ইনস্টিটিউট অব জেরিয়েট্রিক মেডিসিন

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ

"