জন্ডিস কী ও কেন হয়

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)

চলছে ভ্যাপসা গরম। ঋতু পরিবর্তনের এ সময়টায় জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। আসুন জেনে নিই জন্ডিজ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। জন্ডিস আসলে কোনো রোগ নয়, এটি রোগের লক্ষণমাত্র। চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়াকে আমরা জন্ডিস বলে থাকি। জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে হাত, পা এমনকি পুরো শরীরও হলুদ হয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি প্রস্রাবের রং হালকা থেকে গাঢ় হলুদ হতে পারে। রক্তে বিলিরুবিন নামে এক ধরনের পিগমেন্টের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। জন্ডিসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিভার আক্রান্ত হয়। আর তাই জন্ডিসকে কখনোই হেলাফেলা করা উচিত নয়।

জন্ডিস কেন হয়?

আগেই বলেছি, রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। আমাদের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো একসময় স্বাভাবিক নিয়মেই ভেঙে গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি করে, যা পরে লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সঙ্গে পিত্তনালির মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। অন্ত্র থেকে বিলিরুবিন পায়খানার মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। বিলিরুবিনের এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায় আর দেখা দেয় জন্ডিস।

লিভারের রোগ জন্ডিসের প্রধান কারণ। আমরা যা কিছুই খাই না কেন, তা লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়। লিভার নানা কারণে রোগাক্রান্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস-‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ এবং ‘ই’ ভাইরাসগুলো লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় ভাইরাল হেপাটাইটিস। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বেই জন্ডিসের প্রধান কারণ এ হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো। তবে উন্নত দেশগুলোয় অতিরিক্ত মধ্যপান জন্ডিসের একটি অন্যতম কারণ।

এছাড়াও অটোইমিউন লিভার ডিজিজ এবং বংশগত কারণসহ আরও কিছু অপেক্ষাকৃত বিরল ধরনের লিভার রোগেও জন্ডিস হতে পারে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও অনেক সময় জন্ডিস হয়। তাছাড়া থ্যালাসিমিয়া ও হিমোগ্লোবিন-‘ই’ ডিজিজের মতো যেসব রোগে রক্ত ভেঙে যায় কিংবা পিত্তনালির পাথর বা টিউমার এবং লিভার বা অন্য কোথাও ক্যানসার হলেও জন্ডিস হতে পারে। তাই জন্ডিস মানেই লিভারের রোগ- এমনটি ভাবা ঠিক নয়।

জন্ডিস হলে চোখ হলুদ হয়। তবে হেপাটাইটিস রোগে জন্ডিসের পাশাপাশি ক্ষুধামন্দা, অরুচি, বমি ভাব, জ্বর জ্বর অনুভূতি কিংবা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, মৃদু বা তীব্র পেটব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। চিকিৎসক শারীরিক লক্ষণ এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জন্ডিসের তীব্রতা ও কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করারও প্রয়োজন হতে পারে। ভাইরাল হেপাটাইটিস সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সেরে যায়। এ সময় ব্যথার ওষুধ যেমন, প্যারাসিটামল, এসপিরিন, ঘুমের ওষুধসহ অন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় ও কবিরাজি ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে জন্ডিস হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধই সেবন করা ঠিক নয়। এতে হিতে বিপরীত হওয়াার ঝুঁকিটাই বেশি থাকে।

হেপাটাইটিস-‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস দুইটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস সেরে যাওয়ার পরও লিভারের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে, যা লিভার-পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস, এমনকি লিভার ক্যান্সারের মতো জটিল রোগও তৈরি করতে পারে। তাই এ দুইটি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দীর্ঘ মেয়াদে লিভার বিশেষজ্ঞের ফলো-আপে থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে এন্টি ভাইরাল চিকিৎসা নিতে হবে।

হেপাটাইটিস ভাইরাস থেকে বাঁচার উপায়

হেপাটাইটিস-‘এ’ ও ‘ই’ খাদ্য এবং পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। আর ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ডি’ দূষিত রক্ত, সিরিঞ্জ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই সব সময় বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানি খেতে হবে। শরীরে রক্ত নেয়ার দরকার হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করে নিতে হবে। ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করাটাও খুবই জরুরি।

হেপাটাইটিস-‘বি’ ও ‘এ’র টিকা আমাদের দেশে পাওয়া যায়। বিশেষ করে হেপাটাইটিস-‘বি’র টিকা প্রত্যেকেরই নেওয়া উচিত। যারা সেলুনে সেভ করেন, তাদের খেয়াল রাখতে হবে, যেন আগে ব্যবহার করা ব্লেড বা ক্ষুর আবারও ব্যবহার করা না হয়।

জন্ডিস অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। তাই বাঁচতে হলে আমাদের সবাইকে জানতে হবে, হতে হবে সচেতন।

লেখক :

সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হসপিটাল

"